রায়হান আহমেদ তপাদার

  ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

মতামত

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও ভূমিকা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তদানীন্তন পরাশক্তিদ্বয় মধ্যপ্রাচ্যে ¯œায়ুযুদ্ধের উন্মুক্ত প্রান্তর গড়ে তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যে গঠিত ন্যাটো, মার্শাল পলান ও ট্রুম্যান ডকট্রিনের বিপরীতে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে গঠিত ওয়ারশো প্যাক্ট ও কমিকনের মাধ্যমে পরাশক্তিদ্বয় মধ্যপ্রাচ্যে তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ বাস্তবায়নে নিরন্তর প্রয়াস চালায়। মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির অভাব, নেতৃত্বের শূন্যতা, বহির্বিশ্বে বিশ্বস্ত মিত্রের অপ্রতুলতা, নবগঠিত ইউএন কেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার অসম নীতি প্রভৃতি কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র ও নাগরিকবৃন্দ স্নায়ুযুদ্ধের খপ্পরে পড়ে দিশেহারা হয়ে যায়। কিন্তু গত শতাব্দীর আশির দশকে অপ্রত্যাশিতভাবে কম্যুনিজমের পতন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের ফলে মধ্যপ্রাচ্য পুঁজিবাদী পাশ্চাত্যের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েমের প্রতিবন্ধকতাহীন জনপদে পরিণত হয়। উল্লেখ্য, অটোম্যান সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার পর আফ্রো-এশীয় আরব মুসলিমদের শিয়া-সুন্নি বিরোধ কাজে লাগিয়ে বিশ্ব শক্তিবর্গ নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধার করতে থাকে। বিশ্ব রাজনীতিতে সৌদি আরব সব সময়ই পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের আড়ালে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের যত রকমের চেষ্টা, সবকটিতে সৌদিদের ভূমিকা টের পাওয়া যায়। তাদের নতুন বাদশাহি নিয়ে কিছুদিন নানা রকম উচ্ছ্বাস থাকলেও সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার ঘটনা বুঝিয়ে দিয়েছে, সৌদি আরব তাদের কৌশলগত অবস্থান থেকে এতটুকুও নড়েনি।

সৌদি আরবের সঙ্গে বিরোধে থাকা ইরানি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, সামরিক খাতে সৌদি আরবের ব্যাপক অর্থ বরাদ্দের প্রধান লক্ষ্যই হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা। সৌদি আরব ২০১১ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে যুদ্ধ বাঁধিয়ে এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে এবং বে-আইনি প্রক্রিয়ায় সেসব দেশের সরকার বদলেরও চেষ্টা চালাচ্ছে। সৌদি আরব মূলত গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে সামরিকীকরণের মাধ্যমে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। দেশটি আগের বছরের তুলনায় সামরিক খাতে ৯ দশমিক ২ শতাংশ বেশি ব্যয় করেছে। অথচ তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির সূচক নিম্নগামী। কদিন আগেই কাতারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম বিন জাবোর আলে সানি বলেছেন, তার দেশের ওপর সৌদি অবরোধ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে মারাত্মক অনাস্থা তৈরি করেছে। জিসিসি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে বহু বছর লাগবে। তার কথায়, আরো বড় যুদ্ধে জড়ানোই সৌদি আরবের বর্তমান শাসকদের লক্ষ্য। এমনকি সৌদি হামলায় ইয়েমেনের বহু জনপদ এ রকম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশ ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিরক্ষা সমঝোতা চুক্তি সই করতে চলেছে। এর আওতায় ইয়েমেন সীমান্তে ১ হাজার ৮০০ বাংলাদেশি সেনা নিয়োগ দেওয়ার কথা। সৌদি আরবের ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশনে বাংলাদেশ থেকে একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলসহ চারজন কর্মকর্তাকে নিয়োগের জন্য নামও দেওয়া হয়েছে বলে খবরে এসেছে।

দেশের ভেতরে বাইরে খবরটি সংগত কারণেই গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে। কেননা, মধ্যপ্রাচ্যের বিরোধপূর্ণ ভূ-রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সরাসরি অংশগ্রহণ প্রকাশ্যে এলো এই প্রথম। এ ছাড়া ২০১৫ সালে যখন সৌদি নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগে বাংলাদেশ নাম লিখিয়েছিল। বিষয়টি আমাদের জন্য কতটা ইতিবাচক হবে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা জরুরি। খটকা ছিল তখনই। কারণ সৌদি যেটাকে ৩৪ দেশের সামরিক জোট বলছিল, আমরা তখন সেটিকে সন্ত্রাসবিরোধী সমন্বিত উদ্যোগ বলেছি। ভাষার দিক দিয়ে ব্যাপারটা যাই হোক, এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিরোধপূর্ণ রাজনীতিতে যে বাংলাদেশ একটি পক্ষ নিয়ে নিয়েছে, তা নিশ্চিত। প্রস্তাবিত চুক্তি বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে তুলবে নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশের সংবিধান শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতি বজায় রাখতে বলেছে। দুই দিক দিয়ে বিদেশনীতি পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রথমত. দেশের বাইরে সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না; দ্বিতীয়ত. আমাদের সামরিক বাহিনীর বিদেশে উপস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি কী দাঁড়াবে। কিন্তু যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বা অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের নীতি আমাদের নেই। সংবিধানে সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধেও সুস্পষ্ট অবস্থান আছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বিবদমান পরিস্থিতিতে একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়া আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক বৈদেশিক নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ আরব বিশ্বের দেশ নয়। আরবের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিল না।

বাংলাদেশ এর আগে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়াদি নিয়ে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। সরাসরি সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। ফলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিদেশনীতি সব সময়ই বাংলাদেশের জন্য বজায় রাখা সহজ ছিল। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়ে অস্থিতিশীল ও দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বয়ে এনেছেন দেশের জন্য সুনাম। সেই ভূমিকার সঙ্গে এই উদ্যোগকে এক করা যাবে কি না, তা আলোচনার দাবি রাখে। ইরাকি শাসক সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখলের পর ১৯৯১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সৌদি আরব থেকে ইরাকে অভিযান চালিয়েছিল। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তখন কুয়েতকে মাইনমুক্ত করতে সহায়তা করে। সেই সময় আন্তর্জাতিকভাবে এ অভিযান ভিন্নভাবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু বিরোধপূর্ণ ইয়েমেন সীমান্তে এবার বাংলাদেশের সেনা মোতায়েনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। যদিও বলা হচ্ছে, সীমান্তে আমাদের সেনারা মাইন অপসারণের কাজ করবে। এরপরও ইয়েমেনে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক তৎপরতাকে বিবেচনায় নিলে এ সংযুক্তিকে কোনোভাবেই যুদ্ধ অবস্থায় অংশগ্রহণের বাইরে অন্য কিছু হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতির যে মেরূকরণ, সেখানে বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট পক্ষাবলম্বন ভবিষ্যতে আমাদের অনেক বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভালোভাবে নাও নিতে পারে। ইয়েমেনে আল কায়দার শক্তিশালী অবস্থানকে যেভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে, সেই বাস্তবতা মাথায় রাখা জরুরি।

এমনকি রাশিয়া ও চীনের মতো দেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে খেয়াল করলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। মজার ব্যাপার হলো, বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়া ও চীন দুই দেশের পরিচিতিই সৌদি স্বার্থের বিরোধী পক্ষ হিসেবে। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণের কারণে সেই তারাও দৃশ্যত কোনো পক্ষের সঙ্গে পুরোমাত্রায় তিক্ততা রাখতে চায় না। অথচ সেখানে আমাদের আচরণ ঠিক উল্টো। বিশ্বে এমনিতেই সৌদির সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক আছে বলে ধরা হয়। এখন আমরা তাদের সঙ্গেই সামরিক সমঝোতা করছি এবং একটি যুক্তফ্রন্টের অংশ হচ্ছি। স্বভাবতই সৌদিবিরোধী শক্তিগুলো আমাদের ব্যাপারে আরো নেতিবাচক হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে এ সমঝোতা চুক্তি হয়তো চটজলদি আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হবে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা কি খুব বেশি লাভ বয়ে আনবে? বিশেষ করে যেখানে সৌদি মধ্যপ্রাচ্যে আরো আগ্রাসী হওয়ার জন্য তাদের সামরিক বাজেট ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে, সেখানে বলাই যায়, ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক তৎপরতার ভাবনা তাদের মাথায় থাকবে। অপরদিকে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলেছে, বিশ্বে সামরিক বাজেটে সৌদি এখন তৃতীয়। ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়েছে তারা। পাশাপাশি সিরিয়ায় তৎপর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রের অন্যতম জোগানদাতা হিসেবে সৌদি আরবের নাম এসেছে। এর আগে রিয়াদ ইরাকের সন্ত্রাসীদেরও অস্ত্র জোগাত। উপরন্তু আরব দেশসমূহের বর্তমান সংকটের জন্য আমাদের মিত্রদের অনেকে দায়ী করে সৌদিকেই।

সৌদি আরবের বিরোধীপক্ষ প্রকাশ্যেই অঙ্গুলি নির্দেশ করছে, সৌদি সামরিক জোটে যেসব দেশ রয়েছে, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে আইএস লালনের অভিযোগ আছে। তারা শিয়া-সুন্নি বিভাজনে ভূমিকা রেখেছে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে তাদের ভূমিকা স্পষ্ট ছিল না। মার্কিনদের ফিলিস্তিনবিরোধী ভূমিকায় সৌদি আরবকে নীরব থাকতে দেখা গেছে। সৌদি-ইসরায়েল যোগাযোগ এখন স্বাভাবিক কূটনীতিতে পরিণত হয়েছে। এ রকম একটি জটিল আবহে সৌদি আরবের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে আমরা সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়তে চলেছি। কে জানে, এই সিদ্ধান্ত আরব বিশ্বের ভুল রাজনীতির সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যৎকে যুক্ত করে ফেলছে কি না। বিভিন্ন গবেষণা মতে, আইএসে সবচেয়ে বেশি যারা যোগ দিয়েছে, তারা তিউনিসীয় যুবক-যুবতী, যারা আরব বিশ্বে সবচেয়ে আধুনিক, প্রগতিবাদী; শিক্ষিত। ওই গবেষণাসমূহে বলা হয়েছে, তারা ইসলামের আদর্শ তাদের রাজনীতিতে বাস্তবায়ন দেখতে চায় এবং তাদের বিশ্বাস, এ পথেই বেকারত্ব, অশান্তি এবং বহির্বিশ্বের দাসত্ব থেকে আরব বিশ্বের মুক্তি অর্জন সম্ভব। অসংখ্য উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীর এ বিশ্বাসকে পরিশীলিতভাবে মধ্যপন্থায় রাজনৈতিক গণতন্ত্রায়ণের অনুষঙ্গ করার বিকল্প নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করা প্রয়োজন। যাতে তারা আইএসের ভ্রান্ত, বিকৃত ও ভয়ংকর আহ্বানে সাড়া না দেয়। তিউনিসিয়ার মধ্যপন্থি ইসলামী দল ইন্নাদা পার্টি এ শান্তিপূর্ণ উপায়ে আরব-বসন্ত কালের প্রথম সরকার গঠন করে দেশটিতে। দেশটির বর্তমান সেক্যুলার সরকার গঠিত হয়েছে সেক্যুলার পার্টি নেদা তিউনিস দ্বারা। তবে সেক্যুলার ও ইসলামী পার্টির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে তিউনিসিয়ার যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার মডেল অন্যান্য আরব দেশে প্রয়োগ করা যায় কি না, তা যাচাই করা দরকার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়