রবিউল আলম ইভান, কুষ্টিয়া
নিম্নমানের পাটবীজে চাষি ক্ষতিগ্রস্ত

দেশের সব প্রকার ফসলি বীজের উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত ও বিপণনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএডিসি। সরকারিভাবে কৃষি উপকরণ সরবরাহের সিংহভাগ কার্যক্রম করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। সে কারণে কৃষি খাতের উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বিপুল পরিমাণ অর্থও বরাদ্দ হয়ে থাকে বিএডিসির নানাবিধ খাতের অনুকূলে। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে সার বীজ ও সেচ সরবরাহ খাতে বিএডিসি এসব অর্থ ব্যয় করে থাকে। মোটকথা কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবাহকে গতিশীল করতে দেওয়া কৃষি প্রণোদনার সিংহভাগ টাকা ব্যয় হয় বিএডিসির মাধ্যমে। কিন্তু সরকারের এসব কৃষি প্রণোদনা কার্যক্রমে সীমাহীন অনিয়ম অব্যবস্থাপনার কারণে মাঠ পর্যায়ের চাষিদের কোনো আস্থা নেই। বিশেষ করে নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল বীজ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে কোনো প্রতিকার না পেয়ে পাঠবীজ আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন চাষিরা। তবে চাষিদের এমন অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করছেন বিএডিসির সংশ্লিষ্ট পাটবীজ কর্তৃপক্ষ।
বিএডিসি পাটবীজ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থ বছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতের আওতায় পাট উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রণোদনা কর্মসূচির অনুকূলে ১৮০ টন পাটবীজ ক্রয়/সংগ্রহে কৃষি মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দেয় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। যদিও কুষ্টিয়া জোনের সংশ্লিষ্ট পাটবীজ বিভাগের দাবি তারা এ বছর ২৮৩ মে. টন পাটবীজ সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলো প্যাকেটজাত করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেছেন। কিন্তু সরবরাহকৃত বীজের প্রায় সাড়ে ২৪ মে. টন বীজ ফরিদপুর পাটবীজ বিভাগ কর্তৃক রিজেক্ট বা বাতিল ঘোষণা করে সেগুলো কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ গুদামে ফেরত দেওয়া হয়। সেখানকার বিপণন বিভাগের উপপরিচালক সৈয়দ কামরুল হক স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে- এসব বীজের কাঙ্ক্ষিত জার্মিনেশন বা চারা না গজানোই এগুলো ফেরত দেওয়া হলো। যদিও ওই চিঠিতে উল্লেখিত অভিযোগ মানতে নারাজ কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ বিভাগের উপপরিচালক মনিরা খাতুন। তিনি দাবি করেন বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ডিল করছেন।
ওই চিঠির তথ্যসূত্র ধরে বিএডিসির পাটবীজ বিভাগের এসব বীজের মান নিয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধানে এসব বীজ ক্রয়, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনে নানা অনিয়মসহ ভেজালের তথ্য উঠে আসে। চাষিরা এ বছর সরকারি প্রণোদনায় পাটবীজ নিয়ে তা প্রস্তুতকৃত মাঠে রোপণের পর চারা না গজানোই যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ তার প্রকৃত চিত্র উঠে আসে কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ গুদামে সংরক্ষিত বীজের হাল অবস্থায়। সেখানে দেখা যায় একই লটে স্তূপকৃত অভিন্ন তথ্য সংবলিত প্রতি ১ কেজি প্যাকেটজাত বীজের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। খুব তীক্ষè দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় প্যাকেট ও প্যাকেটজাত বীজের ভিন্নতা। যা দেখেই বোঝা যায় এখানে আসল নকলের মিশ্রণ বিদ্যমান। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ মাধ্যম অনুসন্ধান করছে এমন তথ্য জানতে পেরে বিপুল পরিমাণ বীজ গুদামের পেছনে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নিয়মানুযায়ী পূর্ব হতেই তালিকাভুক্ত উদ্যোক্তা চাষিদের নানাবিধ প্রণোদনা পরামর্শ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে উৎপাদিত বীজ সরকারি প্রত্যয়ন এজেন্সির মাধ্যমে নমুনা পরীক্ষা করে গুণগতমান নিশ্চিত হলে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন করার কথা; যার কোনো কিছুই মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চিৎলায় অবস্থিত কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ গুদামে মানা হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গাংনী উপজেলার একজন উদ্যোক্তা পাটবীজ চাষি বলেন, ‘উনারা বলছেন এ বছর ২৮৩ টন পাটবীজ ক্রয় করেছেন। এই বিপুল পরিমাণ বীজ কোথাকার কোন উদ্যোক্তা চাষিদের কাছে থেকে নিয়েছেন দেখাতে বলেন। আমার জানামতে, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনেদা মাগুরাসহ আশপাশের ১০ জেলা কুড়িয়েও ৫০ টন পাটবীজ উদ্যোক্তা চাষিরা উৎপাদন করতে পারেনি। তাহলে এত পরিমাণ বীজ কোথা থেকে কোন মানদণ্ডে তারা ক্রয় করেছেন? আসলে এর সিংহভাগ বীজ পাশর্^বর্তী ভারত থেকে হ্যাচারি ফিড হিসেবে অল্পমূল্যে আমদানি করা বীজ অসাধু ব্যবসায়ী এবং বিএডিসির ঊর্ধ্বতন অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই পাটবীজ গুদামে সরবরাহ করে সেগুলো প্যাকেটজাত করে বিভিন্নভাবে চাষিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ের সত্যতা নিশ্চিত করে মেহেরপুর জেলা বীজপ্রত্যায়ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, ‘কুষ্টিয়া পাটবীজ জোনের আওতায় বিএডিসির তালিকাভুক্ত উদ্যোক্তা চাষিদেরসহ নিজস্ব খামারের প্রায় ৭৫ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদিত ৫৬ টন পাটবীজের প্রত্যায়ন ট্যাগ দেওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল গ্রামের পাটচাষি আলাউদ্দিন মণ্ডলের অভিযোগ, ‘নিম্নমানের বাতিলকৃত বীজ নতুন করে প্যাকেটে ভরে চাষিদের দিয়েছে কৃষি অফিস। এই বীজে চারা না গজানোই আমি এক বিঘি পাটচাষের ভুঁই (জমি) প্রস্তুতে খরচ করেছি ১২ হাজার টাকা। একদিকে আমার একটা বতর (মৌসুম) জমি পাকাল পড়ে থাকল আবার আমার গাট্যের ট্যেকাও খরচ হইলু। ইর দায় নিবি কিডা? এই বটতৈল ইউনিয়নে যত চাষি সরকারের এই পাটের বেচন (বীজ) বোনেছে তারা কেউ দেখাতে পারবে না যে, চারা গজায়ছে।
সদর উপজেলার বটতৈল ইউনিয়নের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম জানান, ‘চলতি মৌসুমে চাষিদের মধ্যে বিএডিসির পাটবীজ বিভাগের মাধ্যমে যে পাটবীজ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে সেসব সুবিধাভোগী চাষিরা সবাই অভিযোগ করেছেন কাঙ্ক্ষিত জার্মিনেশন না পাওয়ার বিষয়ে।’
মিরপুর উপজেলার আমলা বাজারের এক বীজ ব্যবসায়ী জানায়, ‘বিএডিসি’র বীজ ভেজালের সঙ্গে বিশাল চক্র জড়িত। কয়জনকে নিয়ন্ত্রণ করবেন? এরা বাজারের ব্রান্ডিং কোম্পানির বীজের নমুনা প্রত্যয়ন এজেন্সির মাধ্যমে পরীক্ষা করিয়ে অনুমোদন পাওয়ার পরই তাদের আমদানিকৃত নিম্নমানের বস্তাজাত বীজ প্যাকেটজাত করে প্রত্যয়ন এজেন্সির নকল ট্যাগ লাগিয়ে সব কিছু ঠিকঠাক করে বিএডিসির গুদামের সরবরাহ করে। সেখান থেকে সারা দেশে এসব বীজ সাপ্লাই হচ্ছে। এটা সবাই জানে।’
সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য কারশেদ আলম বলেন, ‘শুধুমাত্র এই বছরই বিএডিসির পাটবীজ নিয়ে এত কথা উঠেছে তা নয়। গত বছর বিএডিসির পেঁয়াজ বীজ নিয়ে সারা দেশের চাষিরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সরকার এককভাবে এই বিএডিসির উপর বীজের দায়িত্ব দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। এ কারণে সুযোগ বুঝে একদল অসাধু বীজ ব্যবসায়ী বিএডিসির শীর্ষস্থানীয় অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিম্নমানের পচা, মেয়াদ উত্তীর্ণ, বাতিলকৃত ভেজাল বীজ নামমাত্র মূল্যে ক্রয় করে সেগুলো প্যাকেটজাত করে বিপণন ও সরবরাহ করে সারা দেশের চাষিদের ক্ষতিগ্রস্ত করার মাধ্যমে কার্যত কৃষি খাতে সরকারি প্রণোদনা কর্মসূচিকে ফলাফল শূন্য করে তুলছে। এতে প্রতি বছর কৃষি খাতে সরকারের বিনিয়োগকৃত বিপুল পরিমাণ টাকা গচ্ছা ও তসরুপ হচ্ছে। একইসঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বীজের প্রতি চাষিদের আস্থাহীন করে বাজারের বিভিন্ন ব্রান্ডের বীজ প্রতিষ্ঠানের বীজের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলছে। এ বছর পাটবীজের ঘটনার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্ত করে এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
চাষিদের এমন অভিযোগের বিষয়ে আলাপকালে কুষ্টিয়া জেলা বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির কর্মকর্তা একেএম কামরুজ্জামান বলেন, ‘চাষিরা যাতে গুণগত মানসম্পন্ন বীজ পায় এবং বীজ নিয়ে যাতে প্রতারিত না হয় সেজন্য বীজ প্রত্যায়ন এজেন্সি কাজ করে। বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণে নানা বিচ্যুতির ঘটনা আমরা পায়। সেক্ষেত্রে এজেন্সির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের সঠিক পরামর্শ দেওয়া ছাড়াও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চলতি বছরেও প্রায় ১৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বীজ বিক্রয় ও সরবরাহ সংশ্লিষ্টদের বিধিবহির্ভূত কার্যক্রমে যুক্ত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা কৃষিবিদ রূপালী খাতুন বলেন, ‘মূলত বিএডিসির পাটবীজ বিভাগ এই বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, বাজারজাত ও সরবরাহ করে থাকে। তারাই বলতে পারবেন কি পরিমান বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ করতে পেরেছেন। এর সবকিছুই বিএডিসি করে থাকেন। মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য আমরা শুধু চাষীদের তালিকা করে দিয়েছি মাত্র। এছাড়া এই বীজ ভালো না মন্দ সেটা আমাদের বলার বা কিছু করার সুযোগ নেই’।
বিএডিসি কুষ্টিয়ার পাটবীজ বিভাগের উপপরিচালক মনিরা খাতুন পাটবীজ বিষয়ের সকল অভিযোগকে নাকচ দিয়ে বলেন, ‘বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগের বড় স্যারেরা দেখছেন। আমাদের বীজের গুনগত মান নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে সেই অভিযোগ দেয়ার কোন এখতিয়ার কারো নেই’। চলতি অর্থ বছরে বিএডিসি পাটবীজ বিভাগের সংগৃহীত ২শ ৮২ মে:টন পাটবীজের গুনগত মান পরীক্ষা করেই সরবরাহ করা হয়েছে’। তবে সুবিধাভোগী, ক্রেতা বা ভোক্তা হিসেবে কারো কাছে পছন্দ না হলে তিনি ফেরত দিতেই পারেন’।
এবিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার উপপরিচালক ড. মো. শওকত হোসেন ভুঁইয়া বলেন,‘চাষীরা আসলে না জেনে না বুঝে পাটবীজের ভালোমন্দের দায় কৃষি অফিসের উপর দিচ্ছেন। প্রকৃত অর্থে বিএডিসির পাটবীজ বিভাগের কোন তথ্যই আমাদের কাছে থাকে না। এর ভালোমন্দের দায়ও আমাদের নয়। রাষ্ট্রীয় ভাবে সকল প্রকার বীজ ব্যবস্থাপনার কাজই করে থাকেন বিএডিসি। উনারাই এবিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারবেন’।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো: তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘এবছর চাষীদের দেওয়া পাটবীজের সমস্যা কি তা তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও তদন্ত কাজে সহায়তা করবেন। অভিযোগের সত্যতা পেলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে’।
"







































