অলিউজ্জামান রুবেল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

  ৮ ঘণ্টা আগে

ইতিহাস

শিবগঞ্জের তাহাখানা হচ্ছে ‘ইসলামিক জাদুঘর’

* প্রাচীন গৌড়ের প্রত্নবস্তু ও নিদর্শন প্রদর্শিত হবে * টিকিটের বিনিময়ে ঢুকতে পারবেন দর্শনার্থীরা

প্রাচীন গৌড়রাজ্যের আবহ আর মোগল আমলের রাজকীয় স্মারক বুকে নিয়ে নতুন রূপে সাজতে যাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক ‘তাহাখানা কমপ্লেক্স’। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা এই অনন্য স্থাপত্য নিদর্শনটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ইসলামিক জাদুঘর’-এ রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন- খুব শিগগির শুরু হবে জাদুঘর নির্মাণের মূল কাজ। এ জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগসহ এরই মধ্যে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সংস্কার ও প্রস্তুতির জন্য দীর্ঘদিন ধরে তাহাখানার মূল ভবনের দরজা বন্ধ থাকায় ভেতরের স্থাপত্যশৈলী দেখতে না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা। অবশ্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর আশ্বস্ত করেছে- ভেতরের প্রদর্শনী গ্যালারি প্রস্তুত হলেই টিকিটের বিনিময়ে এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

জানা গেছে, ফার্সি শব্দ ‘তাহাখানা’র আভিধানিক অর্থ ‘ঠাণ্ডা ভবন’ বা শীতল প্রাসাদ। ১৬৩৯ থেকে ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মোগল সুবেদার শাহ সুজা তার প্রিয় আধ্যাত্মিক সুফি সাধক হজরত শাহ নেয়ামতউল্লাহ ওয়ালীর (রা.) প্রতি গভীর শ্রদ্ধাস্বরূপ এবং শীতকালে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও অবস্থানের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের পিরোজপুর এলাকার একটি বিশাল পুকুরের পশ্চিম পাড়ে এই অনন্য ও বিলাসবহুল তাপ নিয়ন্ত্রিত ইমারতটি নির্মাণ করেছিলেন। স্থাপত্যশৈলীটি উত্তর-দক্ষিণে ১৬৬ ফুট লম্বা এবং প্রায় ৩৮ ফুট চওড়া এই ভবনটি মূলত দোতলা, যার একটি তলা সম্পূর্ণ ভূগর্ভে এবং অপর তলাটি মাটির ওপরে অবস্থিত। ১৭ কক্ষের এই রাজকীয় প্রাসাদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে একটি সুদৃশ্য গোসলখানা, যেখানে পুকুর থেকে একটি ওহি বা অষ্টভুজাকৃতির চৌবাচ্চার মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হতো। উত্তর পাশে রয়েছে একটি ছোট পারিবারিক মসজিদ এবং ধ্যানের জন্য ব্যবহৃত একটি অষ্টভুজাকার টাওয়ার কক্ষ। দরজার চৌকাঠে কালো পাথর এবং ছাদে কাঠের ভিম দিয়ে তৈরি এই প্রাসাদটি বাংলায় মোগল রীতির প্রথম স্থাপত্য নিদর্শন, যা পরে ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের সামগ্রিক স্থাপত্যরীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

সরেজমিনে তাহাখানা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তাহাখানা মসজিদ ও শাহ নেয়ামতউল্লাহর মাজার দেখতে পাওয়া গেলেও তাহাখানা কমপ্লেক্সের মূল দরজায় এখন তালা ঝুলছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও জানান, প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ এই রহস্যময় ও কৌতূহল উদ্দীপক ভবনটি দেখতে আসেন, কিন্তু ভেতরে ঢুকতে না পেরে অনেকেই হতাশ হয়ে ফিরে যান।

তাহাখানা ঘুরতে আসা পর্যটক মোমিনুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শখের বশে দেশের বিভিন্ন জেলার ঐতিহাসিক নিদর্শন ঘুরে দেখলেও তাহাখানার মূল ভবনের ভেতরে তিনি ঢুকতে পারেননি। ৫ বছর ধরে কেন একটা ঐতিহাসিক স্থান বন্ধ থাকবে- এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাইরে থেকে ছবি তুলেই আফসোস নিয়ে ফিরে যান এই পর্যটক।

দীর্ঘদিন ধরে তাহাখানা দেখভালের দায়িত্বে থাকা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের স্থানীয় কর্মচারী এনামুল হক জানান, ভেতরে জাদুঘর বানানোর জন্য ঘরগুলোতে তালা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাহাখানা কমপ্লেক্সের ঘরগুলোয় তালা ঝুলছে। মাঝে মাঝে সরকারি কর্মকর্তারা আসলে তালা খোলা হয়। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য ঘর খোলা হয় না।

তাহাখানা কমপ্লেক্সটিকে আধুনিক জাদুঘর হিসেবে চালুর প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান। তিনি জানান, তাহাখানাটি জাদুঘর হিসেবে উন্মুক্ত করার জন্য এরই মধ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। খুব শিগগির এটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। প্রায় এক থেকে দেড় মাস আগে এই জাদুঘর রূপান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে।

জাদুঘরের ভেতরের কাজ সম্পর্কে তিনি জানান, ভেতরের ডিসপ্লে বা প্রদর্শনী গ্যালারিটি সুনিপুণভাবে তৈরি করার জন্য তাদের একটু সময় লাগবে। কারণ প্রত্নবস্তু দিয়ে প্রদর্শনীটা যদি আকর্ষণীয় না করা হয়, তবে দর্শকরা এসে সন্তুষ্ট হবেন না। দর্শনার্থীদের মনের মতো করে প্রদর্শনী গ্যালারি তৈরি করতেই এই সময়টুকু লাগবে। বর্তমানে তাহাখানা ভবনটি সংস্কার ও ডিসপ্লে প্রস্তুতকরণ- এই দুটো মিলিয়ে একটি দ্রুত প্রক্রিয়ায় কাজ চলছে। খুব দ্রুতই দর্শকরা টিকিট কাটার মাধ্যমে ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন।

ঐতিহাসিক এই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব এবং জাদুঘরের প্রদর্শনী পরিকল্পনা তুলে ধরে আঞ্চলিক পরিচালক আরো বলেন, ঐতিহাসিক গৌড় রাজধানীর মূল অংশটি বর্তমানে ভারতে অবস্থিত হলেও এর একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ পড়েছে বাংলাদেশে, যার শেষ সীমানা হচ্ছে কোতোয়ালি গেট। এই পুরো অঞ্চলটি থেকে বিভিন্ন সময়ে খননকার্য ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রাপ্ত যেসব ঐতিহাসিক প্রত্নবস্তু অধিদপ্তরের সংগ্রহে আছে- সেগুলোই এই জাদুঘরে সুন্দরভাবে প্রদর্শন করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দর্শনার্থীরা এসে প্রাচীন গৌড়ের আবহ, তথা চারপাশের মসজিদ, মাদরাসা, তাহাখানা ভবন, মাজার, পুকুর ও অন্য স্থান দেখার পাশাপাশি এই জাদুঘরে এসে তৎকালীন সময়ের মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন দুর্লভ তৈজসপত্র ও প্রাচীন সামগ্রী দেখার সুযোগ পাবেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়