বিশেষ প্রতিবেদক
দেশে গো-সম্পদ এখন উদ্বৃত্ত আলোচনায় মাংস রপ্তানি

ঈদুল আজহা ঘিরে দেশের খামারিরা বরাবরই বিপুলসংখ্যক গরু, ছাগল ও অন্য কোরবানির পশু মোটাতাজা করে প্রস্তুত করেন। কিন্তু প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশু বিক্রি না হয়ে খামারে ফিরে যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কোরবানি শেষে এবার সারা দেশে ২৯ লাখ ৬৬ হাজার ৪২২টি পশু উদ্বৃত্ত রয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বিপুলসংখ্যক পশু কেন অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে? এটা কি কেবল বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নাকি এর পেছনে দীর্ঘদিনের কোনো নীতিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে? এ অবস্থায় বাংলাদেশ থেকে মাংস রপ্তানি করা যায় কিনা এ নিয়ে গণমাধ্যম ও নানা মহলে আলোচনা হচ্ছে।
অবিক্রীত থাকার কারণ : পশুসম্পদ উৎপাদন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অবিক্রীত পশুর পেছনে একসঙ্গে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ পড়েছে। ফলে অনেক পরিবার আগের তুলনায় ছোট পশু কিনেছে অথবা বাধ্য হয়ে যৌথভাবে কোরবানি দিয়েছে। খামারিরা ভালো দামের আশায় বেশিসংখ্যক পশু প্রস্তুত করলেও সেই অনুপাতে ক্রেতার সংখ্যা বাড়েনি। আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার অভাবে বেশিরভাগ খামারি এখনো স্থানীয় হাটের ওপর নির্ভরশীল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পশু বিক্রি না হলে তাদের পক্ষে বিকল্প বাজার খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অবিক্রীত পশু থেকে মাংস প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ ও রপ্তানির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা এ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।
খামারিদের সংকট ও আর্থিক ক্ষতি : অবিক্রীত পশু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়- এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার খামারি ও প্রান্তিক পশু উৎপাদনকারীর জীবিকা। একটি গরু এক বছরের বেশি সময় ধরে লালনপালন করতে খাদ্য, ওষুধ, শ্রমসহ বিপুল খরচ হয়। অনেকেই ঈদ সামনে রেখে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু পশু বিক্রি না হলে তাদের আর্থিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছোট খামারিরা মারাত্মক বিপদগ্রস্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে লোকসান কমাতে ঈদের পর কম দামে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা, যা তাদের পরবর্তী বছর পশু উৎপাদনে নিরুৎসাহিত করে। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্য মাংস রপ্তানিকারক দেশে পশু জবাইয়ের পর মাংস হিমায়িত করে সংরক্ষণ, ক্যানজাত করা বা বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে অতিরিক্ত সরবরাহ সামাল দেওয়া হয়। ফলে সেখানকার খামারিরা পুরোপুরি একটি নির্দিষ্ট মৌসুম বা বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকেন না।
রপ্তানির সম্ভাবনা ও বর্তমান অবস্থা : বাংলাদেশে কিছু মাংস প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলো এখনো অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কাজ করছে। অবিক্রীত পশুর মাংস সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও রপ্তানির মতো বৃহৎ অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ‘বেঙ্গল মিট’ নামে একটিমাত্র কোম্পানি সীমিত আকারে গরুর মাংস রপ্তানি করে। প্রক্রিয়াজাত ও হালাল মাংস হিসেবে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই), মালদ্বীপ ও বাহরাইনে এসব মাংস পাঠানো হয়, যার প্রধান ভোক্তা প্রবাসী বাংলাদেশিরাই।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্য সম্ভাবনাময় বাজারে মাংস রপ্তানির বিশাল সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জবাইখানা, কোল্ডচেইন, হিমাগার, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি নীতিগত সহায়তা ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। জীবিত পশু বিক্রির বাইরে মাংসভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে খামারিরা যেমন ন্যায্যমূল্য পাবেন, তেমনই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন পথও তৈরি হবে।
সরকারি উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কোরবানির পশুর উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদার তুলনায় বেশি। সরকারের প্রণোদনা এবং খামারিদের বিনিয়োগে এ খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) মো. শরিফুল হক জানান, ভবিষ্যতে এই উৎপাদন আরো বাড়বে। এ জন্য সরকার এরই মধ্যে মাংস রপ্তানির বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
বিদেশ থেকে পশু বা মাংস আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশে কোরবানির পশু উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমদানি নয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত পশু ও মাংস বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এ ছাড়া সীমান্তপথে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে, যার ফলে খামারিরা ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘উদ্বৃত্ত উৎপাদনকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে মাংস রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরই মধ্যে দেশে ১৩টি মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও সীমিত পরিসরে রপ্তানি করছে। সরকার এ খাতে বড় খামারিদের উৎসাহিত ও সহযোগিতা করছে।’
কোরবানির পশুর পরিসংখ্যান : প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতাধীন আটটি বিভাগ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মোট ৯৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪১৮টি পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৪৮ লাখ ৬৪ হাজার ১৫৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৪৫ লাখ ২ হাজার ২৩৩টি এবং অন্য পশু রয়েছে ১ হাজার ২৭টি। অন্যদিকে, গত বছর (২০২৫ সালে) কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ছিল ১ কোটি ৩ লাখ ৭৯ হাজার ২০২টি এবং প্রাপ্যতা ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি। ওই বছর দেশে মোট ৯১ লাখ ৩৬ হাজার পশু কোরবানি হয়েছিল এবং উদ্বৃত্ত ছিল ৩৩ লাখ ১১ হাজার ৩৩৭টি পশু। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ২ লাখ ৩১ হাজার ৪১৮টি বেশি পশু কোরবানি হয়েছে।
সরকারের সময়োপযোগী নীতি সহায়তা, খামারিদের কঠোর পরিশ্রম এবং উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের ফলে প্রাণিসম্পদ খাত বর্তমানে একটি শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল অবস্থানে পৌঁছেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে এবং প্রাণিসম্পদ খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার আধুনিক প্রযুক্তি ও খামারিবান্ধব নীতি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
"








































