প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
ভারতের শিলিগুড়ি চিকেন নেকে হচ্ছে পাতাল রেল

দশকের পর দশক ধরে ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেন নেক’ করিডর সবসময়ই দুর্বল জায়গা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল যোগাযোগের পথ হওয়ায় এই করিডরকে বারবার চাপ সৃষ্টি বা ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে চীন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশও। এবার ভারত সরাসরি এই দুর্বল জায়গাটিকে শক্ত করার পথে হাঁটছে এবং তা আক্ষরিক অর্থেই মাটির নিচে দিয়ে। গ্রহণ করেছে পাতাল রেলের বহুমুখী প্রকল্প।
ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘চিকেন নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরজুড়ে ভূগর্ভস্থ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বৈষ্ণব বলেন, ‘উত্তর-পূর্বকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করা এই কৌশলগত করিডরের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এখানে ভূগর্ভস্থ রেললাইন বসানো হবে এবং বিদ্যমান লাইনের সংখ্যা চারটিতে উন্নীত করা হবে। এর সঙ্গে থাকবে আরো বহুমুখী কাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা।
এই ভূগর্ভস্থ রেলপথটি পশ্চিমবঙ্গের তিন মাইল হাট থেকে রাঙাপানি পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। রেললাইনগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে ২০ থেকে ২৪ মিটার গভীরে বসানো হবে।
এই দুটি স্টেশন বেছে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ ভূগোল। তিন মাইল হাট পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার রাঙাপানি ব্লকে অবস্থিত, যা শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। এলাকাটি বাংলাদেশের সীমান্তের খুব কাছাকাছি। বাংলাদেশের পঞ্চগড় এখান থেকে মাত্র ৬৮ কিলোমিটার দূরে। এখন ভূগর্ভস্থ রেলপথ কেন তৈরি করা হচ্ছে, তা বোঝার আগে ‘চিকেন নেকের’ গুরুত্ব বোঝা জরুরি। ‘চিকেন নেক’ হলো প্রায় ২২ কিলোমিটার চওড়া এক সরু ভূখণ্ড, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোকে সঙ্গে যুক্ত করে। বাস্তবে এটিই উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে ভারতের একমাত্র স্থল সেতু। এই করিডরের মধ্য দিয়েই গেছে জাতীয় সড়ক, রেলপথ, জ্বালানি সরবরাহ লাইন এবং সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ রসদ পরিবহনের পথ।
কৌশলগতভাবে এই করিডরের অবস্থান অত্যন্ত স্পর্শকাতর। দক্ষিণে বাংলাদেশ, পশ্চিমে নেপাল, উত্তরে চীনের চুম্বি ভ্যালি। চুম্বি ভ্যালিতে চীনা সেনাবাহিনী বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা ভোগ করে। ফলে কোনো সংকটের সময় এই করিডর একাধিক দিক থেকে চাপে পড়তে পারে।
এই পথ যদি কোনোভাবে বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে শুধু উত্তর-পূর্ব ভারতই মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয়ে যাবে না, একই সঙ্গে সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশে চীনের সঙ্গে ভারতের সামরিক অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়বে, বিশেষ করে যখন বেইজিং অরুণাচল প্রদেশকে নিজের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।
এখানেই আসে বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, একটি স্নায়ুযুদ্ধ যুগের কৌশল। এই ঘোষণাটি একাধিক কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রেলপথ হলো সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকর পণ্য পরিবহনের মাধ্যম। একটি মাত্র মালবাহী ট্রেন প্রায় ৩০০টি ট্রাকের সমপরিমাণ মাল বহন করতে পারে।
বর্তমানে ‘চিকেন নেক’ করিডরের বেশিরভাগ অবকাঠামোই ভূপৃষ্ঠে অবস্থিত। ফলে সেগুলো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ বা এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইন্ডিয়া-ভারত টুডেকে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সন্দীপ উন্নিথান বলেন, ভূগর্ভস্থ রেলপথ হলে তা আকাশপথ, গোলন্দাজ হামলা কিংবা ড্রোন আক্রমণ থেকে অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকবে।
সংঘাতের সময় এই ধরনের ভূগর্ভস্থ করিডর দিয়ে সেনা, জ্বালানি ও সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নির্বিঘ্নে পরিবহন করা সম্ভব হবে। উন্নিথান বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো শনাক্ত করা কঠিন এবং প্রথম আঘাতের পরিস্থিতিতেও এগুলো অনেক বেশি টেকসই।’ তিনি আরো বলেন, ‘এটি ভারতের টানেল নির্মাণ সক্ষমতার পরিপক্বতা এবং অল্প সময়ের মধ্যে বড় কৌশলগত প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষমতার পরিচয় বহন করচ্ছে।’
দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলের নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সন্দীপ উন্নিথানের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত হলো সবচেয়ে দ্রুত কৌশলগত অবকাঠামো প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরই এই ‘দীর্ঘদিনের কৌশলগত দুর্বলতা’ দূর করা উচিত ছিল। এক্সে তিনি লেখেন, ‘প্রস্তাবিত ভূগর্ভস্থ রেল সংযোগ উত্তর-পূর্ব ও দেশের বাকি অংশের মধ্যে একটি নিরাপদ ও নির্ভুল পরিবহন করিডর তৈরি করবে। এটি একটি বড় কৌশলগত অগ্রগতি।’
গত এক দশকে চীন ডোকলাম ও অরুণাচল প্রদেশ-সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক সব আবহাওয়ায় টিকে থাকবে এমন অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। এদিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে।
গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের কিছু মহল থেকে ‘চিকেন নেক’ কেটে দেওয়ার হুমকিমূলক বক্তব্যও শোনা গেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েও নয়াদিল্লির প্রতিরক্ষা মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই বিমানঘাঁটিটি শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছেই অবস্থিত।
তবে ভারত বসে নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার একাধিক পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি নতুন করে সক্রিয় করার কাজ শুরু হয়েছে, যাতে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সামরিক প্রস্তুতি আরো শক্তিশালী হয়। একইসঙ্গে এই অঞ্চলে ভারতের সামরিক উপস্থিতিও বাড়ানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের চোপড়া, বিহারের কিষানগঞ্জ এবং অসমের লাচিত বরফুকন- এই তিন জায়গায় নতুন সেনাঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। চীনের বাড়তে থাকা নৌ-শক্তি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়ায় একটি নতুন নৌঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। গত বছর ভারত প্রথমবারের মতো রেলভিত্তিক মোবাইল লঞ্চার থেকে মাঝারি পাল্লার অগ্নি প্রাইম ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে পরীক্ষা করে। এর ফলে দেশের বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহন, লুকিয়ে রাখা এবং যেকোনো জায়গা থেকে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হবে।
এই সব কিছুর প্রেক্ষাপটে শিলিগুড়ি করিডরে ভূগর্ভস্থ রেলপথ প্রকল্পটি আর শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়। চীন ও বাংলাদেশের দিক থেকে আসা দ্বিমুখী হুমকির মধ্যে, এটি বহুদিন ধরে দুর্বল হিসেবে বিবেচিত ‘চিকেন নেক’কে একটি শক্ত, সুরক্ষিত মেরুদণ্ডে রূপান্তর করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত পদক্ষেপ।
"







































