আরমান ভূঁইয়া

  ২৪ আগস্ট, ২০২২

ছিঁচকে চুরি আমলে নেয় না পুলিশ

জিডিতেই আটকে থাকে চুরির ঘটনা * চুরির ক্ষেত্রে থানা নেয় হারানো জিডি * তদন্ত হয় না, লাপাত্তা অপরাধীরা * চুরির মালামাল উদ্ধার যৎসামান্য

রাজধানীতে ক্রমেই বাড়ছে চুরির ঘটনা। বাসাবাড়ি, মার্কেট কিংবা রাস্তাঘাটে চোরের খপ্পরে পড়ে মানুষের মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন, টাকাণ্ডপয়সা, স্বর্ণালঙ্কার এমনকি মূল্যবান কাগজপত্র চুরির ঘটনা বেশি ঘটছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এসব ছোটোখাটো চুরির ঘটনা আমলে নেয় না পুলিশ। ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ জানালে, পুলিশ হারানো মর্মে সাধারণ ডায়রি (জিডি) নেয়। ফলে ছিঁচকে চুরির ঘটনায় কোনো তদন্ত হয় না। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় অপরাধারীরা। উদ্ধার হয় না চুরি যাওয়া জিনিসপত্র।

রাজধানীর হাতিরঝিল থানাধীন পশ্চিম রামপুরা এলাকায় বাস করেন সংগীতশিল্পী মার্শিয়া লিলি। চাকরি করেন বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপিতে। চাকরির সুবাদে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পেয়েছেন সম্মাননা সূচক ক্রেস্ট। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তার বাসা থেকে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ক্রেস্ট, টাকা, মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালঙ্কারসহ মূলবান অনেক জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়। তার ঠিক এক সপ্তাহ পর আবারও তার বাসায় চুরির ঘটনা ঘটে। একইভাবে ২০২১ সালে মার্চ মাসে তার বাসা থেকে একটি মোবাইল ও টাকাণ্ডপয়সা চুরি হয়। সর্বশেষ এ বছরের ১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে মার্শিয়ার বাসার জানালা দিয়ে লিলির ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন চুরি হয়। এ ঘটনা লিলি হাতিরঝিল থানায় জানালে ২ আগস্ট মোবাইল হারানো মর্মে একটি সাধারণ ডায়রি (জিডি নং ১০০) নেয় পুলিশ। তবে ঘটনার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনো তদন্ত করেনি থানা পুলিশ। ভুক্তভোগী সংগীতশিল্পী মার্শিয়া লিলি বলেন, ‘গত ১২ বছরে একই বাসায় ৭ বার চুরির ঘটনা ঘটেছে। থানার এসব ঘটনার কথা জানালে পুলিশ মোবাইল হারানো জিডি নিয়েছে। একটি ঘটনারও তদন্ত করেনি। চোরদের ধরতে পুলিশ কোনো অভিযান চালায়নি। চুরি যাওয়া মালামালও উদ্ধার হয়নি। পুলিশের এমন উদাসীনতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।’

একই অভিযোগ করেন তেজগাঁও থানাধীন মণিপুরীপাড়া এলাকার বাসিন্দা হৃদয় ইবান শহীদ। তিনি বলেন, ২ আগস্ট তার বাসা থেকে একটি মোবাইল ফোন (রেডমি নোট-৯ প্রো) চুরি হয়ে যায়। এ ঘটনা তেজগাঁও থানা গেলে পুলিশ মোবাইল হারানো গেছে উল্লেখ্য করে একটি জিডি (১০২) নেয়। পরে এ ব্যাপারে পুলিশ তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। ওইদিন একই থানাধীন তেজগাঁও স্টেশন রোডের একটি বাসা থেকে আল-আমিন নামে এক ব্যক্তির ভিভো ওয়াই-২০ মডেলের একটি মোবাইল ফোন চুরি যায়। তিনি এ ব্যাপারে থানা অভিযোগ জানালে, পুলিশ হারানো উল্লেখ করে একটি জিডি (জিডি-১০১) নেয়।

মোবাইল হারানো জিডির ব্যাপারে পুলিশ বলছে, মোবাইল ফোন হারানো জিডি ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া তেমন কোনো সুযোগ নেই পুলিশের। মামলা হলে পুলিশ তদন্ত করে। তবে জিডি হলে তদন্ত করা হয় না।

জিডি করে মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও পুলিশি সহায়তা পায় না ভুক্তভোগীরা। এ বছর ১৭ এপ্রিল তেজকুনী পাড়ার কমিশনার গলির একটি বাসার দোতলা থেকে অপপো-এস ৭ ও পোক্কো-এম ৩ মডেলের দুটি মোবাইল সেট চুরি হয়। রিজভী নামে এক ভুক্তভোগী তেজগাঁও থানায় গেলে তাকেও হারানোর জিডি করার পরামর্শ দেয় পুলিশ। পরে তিনি হারানো মর্মে একটি জিডি (১০১৬) করেন।

রিজভী বলেন, ‘আমার বাসা থেকে দুটি মোবাইল ফোন চুরি হয়। থানায় এ ঘটনা জানালে, পুলিশ বলে এ ধরনের ঘটনা কোনো অভিযোগ বা মামলা নেওয়া হয় না। তখন পুলিশ নিজেরাই হারানো উল্লেখ্য করে একটি জিডি লিখে দেয়। জিডির ওপরে ঘটনার তদন্ত করার জন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তা (এএসআই নজরুল ইসলাম) ছিলেন। তিনি আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। আমি তাকে একাধিকবার ফোন করেছি। কোনো সাড়া পাইনি। পুলিশ কোনো গুরুত্ব দেয় না।’

চুরির ঘটনার চার মাস পেরিয়ে গেলেও জিডি ব্যাপারে পুলিশ কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না? এমন প্রশ্নে তেজগাঁও থানার এএসআই নজরুল ইসলাম বলেন, ‘চুরির ঘটনা হলেও জিডিতে হারানো উল্লেখ্য করা হয়েছে। সাধারণত হারানো জিডির অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় না। তাই বাদীর সঙ্গে যোগাযোগও করা হয় না।’ হারানো ফোন সহজে উদ্ধার করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তবে যদি কখনো ফোন উদ্ধার হয়। তাহলে আমরা তাদের ডেকে ফিরিয়ে দেই।’

চুরির ঘটনায় তথ্য প্রমাণ থাকলেও গুরুত্ব দেয় না পুলিশ। চোরের ছবি, সিসিটিভির ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও থানা পুলিশ ঘটনা আমলে নেয় না বলে অভিযোগ করেন শরীফ মোহাম্মদ শওকত নামে এক ব্যাংক কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, গত বছরের (২০২১) ৩১ ডিসেম্বর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ইনফিটির একটি আউটলেটে আমার পকেট থেকে ১৩প্রো ম্যাক্স মডেলের একটি আইফোন চুরি হয়। পরে ওই দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে তিনজন চোরকে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার পর দিন (১ আগস্ট ২০২২) তেজগাঁও থানা গেলে পুলিশ হারানো মর্মে একটি সাধারণ ডায়রি (জিডি-৪৫) নেয়। পুলিশকে চোরের ছবি-ভিডিও ফুটেজ দেখানোর পরও আমলে নেয়নি।

ভুক্তভোগী শওকত আরো বলেন, জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসআই মেরাজুল ইসলামকে চোরের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ পেন-ড্রাইভের মাধ্যমে দিয়েছি। তবু বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি তারা।

জানতে চাইলে এএসআই মেরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কম্পিউটার বা পেনড্রাইভ ব্যবহার করি না। আমাকে কেউ এমন কোনো ফুটেজ দেয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘চুরি অথবা ছিনতাইয়ের ঘটনা হলে মামলা হয়। মামলার তদন্তও করা হয়। তবে হারানো জিডি হলে সাধারণত তদন্ত করা হয় না। হারানো জিডির কিছু প্রসেডিউর আছে। সেগুলো মেনে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। তবে সাধারণত খুব একটা উদ্ধার করা যায় না।’

জানা যায়, চুরি কিংবা ছিনতাইয়ের কোনো ঘটনা ঘটলে আইনের পরিভাষায় তা মামলার অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে বাস্তবতা হলো ছোটোখাটো চুরির ঘটনা আমলে নেয় না থানা পুলিশ। চুরির ঘটনাকে হারানো উল্লেখ্য করে সাধারণ ডায়রি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। থামা চাপা পড়ে যায় চুরির ঘটনা। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় অপরাধীরা।

প্রতিদিন রাজধানীতে কী পরিমাণে চুরির ঘটনা ঘটে! তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই পুলিশ কিংবা অন্য কোনো সংস্থার কাছে। তবে প্রতিদিন থানাগুলোতে জমা পড়ছে অনেক হারানো জিডি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এইচ এম আজিমুল হক বলেন, চুরির কোনো অভিযোগ থানা পুলিশ আমলে নেয় না এটা সত্য নয়। আমরা সব অভিযোগেরই গুরুত্ব দেই। কেউ জিডি করতে চাইলে জিডি করে। চুরির ঘটনা হলে মামলা নেওয়া হয়।

মোবাইল ফোন হারানোর জিডিগুলো পুলিশ আমলে নেয় না- এ প্রশ্নে ডিসি বলেন, এটাও সত্য নয়। মোবাইল হারানো জিডিরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফোন বন্ধ থাকলে তো আর টেস্ট করা যায় না।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়