প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ২৭ নভেম্বর, ২০২০

পেঁয়াজ বীজে কোটিপতি

আঠারো বছর ধরে পেঁয়াজের বীজ চাষ করছেন সাহিদা বেগম। পেঁয়াজের বীজ চাষ করে আত্মনির্ভরশীল তো বটেই বরং অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার সাহিদা বেগম। এখন এই উদ্যোগী নারী কোটি টাকার মালিক।

বিবিসি বাংলার সঙ্গে আলাপকালে সাহিদা বেগম বলেন, প্রায় ১৮ থেকে ১৯ বছর ধরে পেঁয়াজের বীজের আবাদ করে চলেছেন তিনি। আর চলতি বছর ২০০ মণ পেঁয়াজের বীজ বিক্রি করেছেন তিনি। মৌসুমে এই বীজ মণপ্রতি দুই লাখ টাকা করে বিক্রি করেছেন। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে পেঁয়াজের বীজ বিক্রি হয়েছে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা কেজি দরে।

------
গত বুধবার বিবিসিকে তিনি বলেন, এ বছর এরই মধ্যে বীজ উৎপাদনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। বাছাই করার পর পেঁয়াজের বাল্ব জমিতে লাগাতে মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কাজ করেন ১২ জন শ্রমিক। তাদের দুপুরের খাবার প্রস্তুতিতেই ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। আর সেইসঙ্গে পেঁয়াজ লাগানো এবং তা থেকে বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়ার তদারকি তো আছেই। এখন আমাদের সিজন। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আমরা পেঁয়াজ লাগাই। অনেক লেবার থাকে। ৩০ থেকে ৪০, এমনকি ৫০ জনও থাকে।’

সাহিদা বেগম বলেন, কৃষক পরিবারের বউ হওয়ার কারণে আগে থেকেই নানা কৃষিকাজের সঙ্গে পরিচয় ছিল তার। তিনি জানান, তার শ্বশুর মূলত পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কখনোই আসলে বেশি পরিসরে চাষ করা হয়নি।

‘তিনি নিজেও অনেকটা শখের বশেই এই চাষ শুরু করেন।আশপাশের কেউ কেউ খুব কম করে পেঁয়াজের বীজ চাষ করত। আমার মনে হলো আমিও করে দেখি। তাই করলাম’ তিনি বলেন। সাহিদা বেগম জানান, ২০০৪ সালে দ্বিতীয় সন্তান জন্মের আগে ২০ শতক জমিতে পেঁয়াজের বীজ চাষ করেন তিনি। সে বছর মাত্র দুই মণ বীজ উৎপাদিত হয়েছিল। সেগুলো বিক্রি করে পেয়েছিলেন ৮০ হাজার টাকা। পরের বছর আরো বেশি পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের চাষ করতে শুরু করেন তিনি। সে বছর পান ১৩ মণ বীজ। বীজ বিক্রি করে দেখলাম যে আমি ভালোই লাভবান। পরের বছর আরো জমি বাড়ালাম। ৩২ মণ বীজ উঠল। এভাবেই আমার ওঠা।

এরপর আর থেমে থাকেননি। সাহিদা বেগম জানান, গত বছর ১৫ একর আর চলতি বছর ৩০ একর জমিতে পেঁয়াজের বীজের চাষ করেছিলেন। ঘরে তুলেছিলেন ২০০ মণ বীজ। অনেক শ্রম দিতে হয়, কষ্ট করতে হয়। পেঁয়াজের বীজের অনেক যত্ন করতে হয়। এতে বাড়তি শ্রমিক লাগে সারা বছর।

সাহিদা বেগম বলেন, আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি জমিতে পেঁয়াজের বীজের চাষ করলেও অনেক সময় চাহিদা পূরণ করতে পারেন না তিনি। ফরিদপুর জেলার স্থানীয় কৃষক তো বটেই, পুরো বাংলাদেশে বীজ সরবরাহ করে থাকেন তারা। ‘আমাদের বীজ ভালো বলে চাহিদা থাকে। কৃষকরা অনেক খুশি। কারণ এর মধ্যে কোন ঝামেলা নেই। এ বছর আরো ৫০০ মণ বীজ থাকলেও বিক্রি করতে পারতাম। এত চাহিদা’ বলেন তিনি। তবে পেঁয়াজ চাষে খরচও কম নয় বলে জানান তিনি। পেঁয়াজের বাল্বের দাম অনেক বেশি থাকে। এছাড়া কীটনাশক, সার, সেচ দেওয়ার ক্ষেত্রে খরচ বেশ ভালো পরিমাণে হয়। এছাড়া অতিরিক্ত কুয়াশা, শীলাবৃষ্টি, ঝড়-বৃষ্টি বেশি হলেও বীজ নষ্ট হয়ে যায় বলে জানান তিনি।

সাহিদা বেগমের পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের কাজে সহায়তা করেন তার স্বামী বক্তার উদ্দিন খানও। যিনি পেশায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। স্বামী ছাড়াও পরিবারে দুই মেয়ে নিয়ে চারজনের সংসার সাহিদা বেগমের। সাহিদা বেগম নিজেই গড়ে তুলেছেন পেয়াজের বীজের কারখানা। সেখান থেকেই বীজ প্যাকেটজাত করা এবং ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করা হয়। তার তৈরি করা বীজ ক্রেতাদের কাছে পরিচিত খান সিডস নামে।

সাহিদা বেগম বলেন, তার এই কারখানায় কাজ করে স্থানীয় অনেকে। আর তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পেয়াজের বীজ চাষ করতে শুরু করেছেন স্থানীয় আরো অনেক নারীও।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর পেঁয়াজের বীজের চাহিদা বেশি থাকার কারণে দাম ছিল বেশ চড়া। প্রতি কেজি বীজ বিক্রি হয়েছে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা দরে। সে হিসাবে সাহিদা বেগম প্রায় চার কোটি টাকার বেশি বীজ বিক্রি করেছেন। ফরিদপুরের নগরকান্দা এলাকার পুরাপাড়া বাজারের কৃষিঘর বীজ ভা-ারের মালিক মিজানুর রহমান জানান, বীজের মান ভালো হওয়ার কারণে খান সিডস থেকে ৫০০ কেজির মতো বীজ কিনেছিলেন তিনি। রহমান বলেন, এই বীজ থেকে চারা গজানোর হার বেশি থাকে বলে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে চাহিদা রয়েছে প্রচুর। সবসময়ের মতো এবারো বেছন (চারা গজানো) অনেক ভালো হয়েছে। পেঁয়াজও ভালো হবে। ফরিদপুর জেলায় পেয়াজের বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সেরা চাষি হিসেবে পুরস্কারও পেয়েছেন সাহিদা বেগম। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক কার্তিক চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ফরিদপুরের অবস্থান দ্বিতীয়। আর পুরো দেশে পেঁয়াজের বীজের যে চাহিদা থাকে তার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ এককভাবে আসে ফরিদপুর জেলা থেকে।

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়