রাজিবুল ইসলাম

  ১২ জানুয়ারি ২০২১, ১৯:৫৭

পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ পাচ্ছে না শহুরে শিশুরা

শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য নিয়মিত খেলাধুলার বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশের শহুরে শিশু-কিশোরদের জন্য ঘটছে এর উল্টো। পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুযোগটাই পাচ্ছে না তারা। ইট, কাঠ, পাথরের জঞ্জালে চাপা পড়ে যাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেটের মতো বৃহৎ নগরীতে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। বিকল্প খেলার স্থানও অপ্রতুল। মাঠ তৈরির উদ্যোগও খুব একটা চোখে পড়ে না। বরং শিশুদের অনেক খেলার স্থানে গড়ে উঠছে বড় বড় স্থাপনা। অথচ আগের প্রজন্ম মাঠেই পড়ে থাকতে পছন্দ করত। সন্ধ্যা লাগলেও বাড়ি ফেরার নামগন্ধ থাকত না। পরে অভিভাবক গিয়ে কানমলা দিয়ে নিয়ে আসতেন তাদের। আর এখানকার প্রজন্মকে টেনে-হিঁচড়েও যেন মাঠে পাঠাতে পারেন না ক্রীড়াপ্রেমী বাবা-মায়েরা। পর্যাপ্ত মাঠ থাকলে তবেই না খেলতে যাবে শিশু-কিশোররা! বাধ্য হয়েই শহরের শিশুরা তাই মোবাইল-কম্পিউটার-ট্যাবের সহিংস গেমসের কাছে শৈশবকে সপে দিচ্ছে। এতে তাদের মধ্যে যুদ্ধাংদেহী মনোভাব ফুটে উঠছে। শহুরে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় এমন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে এবারের আয়োজন-

একটা সময় ছিল যখন গ্রাম-শহর সব জায়গাতেই শিশুর খেলাধুলা, ছোটাছুটিসহ বিনোদনের সব ধরনের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছিল। কিন্তু বর্তমানে শহরাঞ্চলে নানা কারণে শিশুদের এই সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে। একটা খাঁচার মতো ভ্যানে চেপে স্কুল, স্কুলের গণ্ডি থেকে আবার সেই খাঁচায় চেপে বাসা নামের আরেকটি খাঁচায় ফেরা। আর বাসার অবসরের সঙ্গী টেলিভিশন। এই জড় বস্তুটির সঙ্গে গড়ে উঠছে অধিকাংশ শিশুর সখ্যতা। শহরের কোনো পরিকল্পনায় শিশুদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সব বাড়িতে গাড়ির জন্য পার্কিং প্লেস বা গ্যারেজ বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু শিশুর খেলার জায়গা তৈরিতে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। মাঠের কথা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে সেই মাঠ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আবার কিছু মাঠ খুঁজে পাওয়া গেলেও সেগুলোর বেশির ভাগই করুণ দশা। ঢাকা নগরী যেন শুধু গাড়ি রাখার জন্য; শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য নয়। অন্যদের সঙ্গে খেলাধুলা, মেলামেশা বা সামাজিক সম্পর্কে জড়ানোর মাধ্যমে শিশুদের যথাযথ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের যে সুযোগ রয়েছে, সেগুলো অদ্ভুত সব পরিকল্পনার মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছেন নগর ব্যবস্থাপকরা। নীতিনির্ধারকসহ শহরবাসীর অনেকেই নিজের দুরন্ত শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে পুলকিত হতে হয়। পাশাপাশি শহরের শিশুদের বিনোদনের সুযোগের অপর্যাপ্ততার জন্য হতাশা প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু শহরকে শিশুদের সুস্থতা ও বিকাশের উপযোগী করার দাবিতে এখনো সোচ্চার নয় সুশীল সমাজ। বরং তাদের নীরবতা ক্রমেই বর্তমান প্রজন্মকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি করে ফেলছে। এই নগরায়নের ফলে শিশুরা ঘরে বসে মোবাইলে গেম খেলে, টেলিভিশন দেখে সময় কাটাচ্ছে। এতে অধিকাংশ অভিভাবক আবার স্বস্তিবোধ করেন। নিরাপত্তাসহ নানা অজুহাতে তারা সন্তানকে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। মোবাইলের কাছে শিশুকে সপে দিয়ে নিরাপদ বোধ করেন। অথচ মোবাইল নির্ভর বিনোদন শিশুর বিকাশের পথকে সংকুচিত করছে। শিশুরা ঘুমের থেকে বেশি সময় ব্যয় করছে মোবাইল হাতে নিয়ে। আর এখান থেকেই শিশুরা মাদকাসক্তি, ধর্ষণ, অশ্লীল বাক্য ব্যবহার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ধারণা পেয়ে যাচ্ছে । 

প্রয়োজনের তুলনায় কতটুকু খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে শহরের শিশু-কিশোররা- এমন প্রশ্নকে সামনে রেখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকা কথা বলেছে সাবেক দুই জাতীয় ক্রিকেটার, দুজন অভিভাবক ও দুজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তাদের বেশির ভাগেরই কথায় ফুটে উঠেছে শহরে খেলার মাঠের অপ্রতুলতার চিত্র।

হাবিবুল বাশার সুমন
সাবেক অধিনায়ক, বাংলাদেশ জাতীয় দল

‘বাচ্চারা খেলতে না পারলে মোটা হয়ে যায়। তারপর তাদের শরীরে দেখা দেয় নানা সমস্যা। এখন অবশ্য সিটি করপোরেশন দখল হওয়া মাঠ উদ্ধারের চেষ্টা করছে। সেগুলো উদ্ধার করে খেলাবান্ধব করা জরুরি। মাঠে যেতে না পারলে শিশুদের জ্ঞান-বুদ্ধির বিকাশ ঘটে না। সবার সঙ্গে মিশতে পারলে তবেই শিশুরা সঠিকভাবে বেড়ে উঠবে।’ 

হান্নান সরকার
সাবেক ওপেনার, বাংলাদেশ জাতীয় দল

‘আমাদের সময় খেলাধুলার অনেক সুযোগ ছিল। কিন্তু বর্তমানে শহরের ছেলে-মেয়েদের তেমন সুযোগ নেই। এখন অবশ্য অনেক অ্যাকাডেমি গড়ে উঠেছে। তারা চাইলে সেখানে গিয়ে খেলতে পারে। এর বাইরে যেসব মাঠ রয়েছে, সেগুলোকে খেলার উপযোগী করে তৈরি করতে হবে। ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে হলে শিশুদের বেশি করে খেলার সুযোগ দিতে হবে।’

কান্তা ইসলাম
অভিভাবক

‘সন্তানরা খেলাধুলা না করে বাসায় পড়ে থাকলে মনে হয় তারা বাবা-মায়ের কাছে বোঝা। বাসায় থেকে থেকে ওরাও একঘেয়ে হয়ে ওঠে। কারোর সঙ্গে মিশতে চায় না। সারাক্ষণ ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনেই সব কিছু খুঁজে নেয়। এটা তো জীবন হতে পারে না। এখান থেকে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।  সেই হতাশা থেকে অনেক সন্তান আত্মহত্যার মতো অনেক কঠিন পথ বেছে নেয়।’

মোজাম্মেল হক
অভিভাবক

‘সন্তানদের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে। সেটা না হলে সন্তানরা বন্ধুহীনতায় ভুগবে। এ থেকেই তৈরি হবে নানা সমস্যা। খেলতে না পারলে শেষমেষ বেছে নেবে একাকী জীবন। সেটিই হয়ে উঠবে বড় প্রতিবন্ধক। তাই সুস্থ জীবন তৈরিতে খেলাধুলার বিকল্প নেই।’

আরিয়ান আজগর শান
শিক্ষার্থী, ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল

‘আমাদের বাসার পাশে যে মাঠ রয়েছে, সেটা যথেষ্ট বড় নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় মাঠের আয়তনের তুলনায় খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশি। তাই খেলার তেমন সুযোগ হয় না। বাসায় বসে থাকলে অলস হয়ে যাই। কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারি না। আমাদের যদি পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ থাকত তাহলে এই সমস্যা হতো না। আমরা খেলার সুযোগ চাই। খেলার উপযোগী মাঠ চাই।’

ফেরদাউস ইসলাম শুভ
শিক্ষার্থী, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স স্কুল 

‘বাবার সঙ্গে মাঝে মাঝে বাইরে বের হই। তা ছাড়া একদম বাইরে যাওয়া হয় না। বাসায় বসে মোবাইলে গেম খেলি আর টিভি দেখি। কিন্তু আমার মাঠে গিয়ে খেলতে ইচ্ছা করে। সারাক্ষণ বাসায় থাকলে মন খারাপ থাকে। মাঠে গেলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, মনটাও ভালো হয়ে যায়। তাই মাঠে গিয়ে বেশি বেশি খেলতে চাই।’

শিশু,খেলা,শহুরে শিশু,হাবিবুল বাশার সুমন,ক্রিকেট
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়