নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডে আরো হতাশ বিএনপির তৃণমূল

কমিটি গঠনকে নিয়ন্ত্রণ করছে দলের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:৪৮

বদরুল আলম মজুমদার

কমিটি গঠন, দলীয় মনোনয়নে স্বজনপ্রীতি, অন্তর্দ্বন্দ্ব, অনৈতিক লেনদেন, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দলের নেতাদের গোপন আঁতাতের অভিযোগ ও সার্বিক প্রভাব বিস্তারের রাজনীতির কবলে পড়ে আরো হতাশ বিএনপির সব স্তরের নেতাকর্মী। কয়েকটি উপনির্বাচন ও দেশব্যাপী শুরু হতে যাওয়া স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় মনোনয়ন ইস্যুতে বিএনপির তৃণমূলের রাজনীতিতে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া কমিটি গঠনকে নিয়ন্ত্রণ করছে দলের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এর কবলে পড়ে ত্যাগীদের রাজনীতিতে টিকে থাকা সঙ্কট বলে মনে করছেন সদ্য সাবেক হওয়া ছাত্রদলের হাজার হাজার নেতাকর্মী। সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শতাধিক নেতাকর্মী। এছাড়া মহিলা দলেও চলছে টানাপড়েন। এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদগার করে চলেছেন।

গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির পর থেকে দলটির তৃণমূলে চরম হতাশা বিরাজ করছে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি। নির্বাচিত কয়েকজনের শপথ না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরও শপথ নিয়ে সংসদে যাওয়া, পরবর্তীতে কয়েকটি আসনে উপনির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকাবস্থায় তার মুক্তির দাবিতে কোনো জোরদার আন্দোলন করতে না পারা এবং সরকারের কৃপায় খালেদা জিয়ার মুক্তির পরও নীরবতা—এসব নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আরো হতাশ করেছে।

ক্ষুব্ধ কর্মীরা বলেন, বিএনপি টানা ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে। এমনিতে হতাশার শেষ নেই। এর ওপর আবার হাইকমান্ড কোনো জুতসই সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। কোনো সিদ্ধান্তেই অটল থাকতে পারছেন না। বরং তারা দলের তৃণমূলের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে যাচ্ছেন। তৃণমূল পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের পরপরই উপজেলা নির্বাচন বর্জন করলেও পরবর্তী সব উপনির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। মূল নির্বাচনে মাঠ ছেড়ে দিয়ে উপনির্বাচনে অংশগ্রহণের এই দ্বিমুখী সিদ্ধান্ত তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রচন্ডভাবে হতাশায় ফেলেছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ সরকারের সঙ্গে আঁতাত করেছে। সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করার জন্যই তারা এ ধরনের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ।

বিএনপির কয়েকজন নেতা জানায়, একাদশ নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করলেও পরবর্তী যে কটি আসনে উপনির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে কেবল মির্জা ফখরুলের ছেড়ে দেওয়া আসন (বগুড়া-৬) ছাড়া আর কোনোটিতে কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি বিএনপি। হতাশ নেতাকর্মী ও ভোটারদের তারা ভোটকেন্দ্রমুখীও করতে পারেনি দলের নেতৃত্ব। মূল নির্বাচনে ভরাডুবির হতাশা আরো চেপে ধরছে এসব উপনির্বাচনের নেতিবাচক ফল।

এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকলেও তার মুক্তির দাবিতে সারা দেশে কোনো কর্মসূচি পালন করতে না পারা, করোনা সঙ্কটকালে সরকারের অনুকম্পায় খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং পরবর্তীকালে তার নীরবতা দেখে তৃণমূলের কর্মীরা বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

এদিকে উপনির্বাচন এবং স্থানীয় পর্যায়ের মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন এসব উপনির্বাচনে অংশগ্রহণের আড়ালে মনোনয়ন বাণিজ্য চলছে, যা দলের জন্য আত্মঘাতী। এর ফলে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর আশা আরো ক্ষীণ হচ্ছে। তাছাড়া স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপি এরই মধ্যে প্রায় ৪৮ জনকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। ঘোষণা হওয়া স্থানীয় মনোনয়নপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে সারা দেশে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বেশি প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার অভিযোগ জোরালোভাবে উঠে আসছে। সামনে এ অবস্থা আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করছেন নেতারা। তারা মনে করছেন দলের একটি সিন্ডিকেট কমিটি ও মনোনয়ন নিয়ে বাণিজ্য করছে এবং নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়াতে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার বিষয়টি দীর্ঘদিন থেকে দলের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপনির্বাচনে মনোনয়ন সংক্রান্ত সর্বশেষ বৈঠক চলাকালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে মনোনয়নপ্রত্যাশী সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনা নিয়েও তৃণমূলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মনোনয়ন গ্রহণকালে শোডাউনের সময় কর্মী-সমর্থকদের দেখা গেলেও আন্দোলনের মাঠে কেন তাদের পাওয়া যায় না সে প্রশ্ন যেমন উঠেছে; তেমনি অনেকের প্রশ্ন, এই শোডাউনবাজদের মনোনয়ন দিয়ে দলের কী লাভ হবে?

এ প্রসঙ্গে বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপির মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণেই নির্বাচন এলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেড়ে যায়। কখনো কখনো তা রূপ নেয় সংঘর্ষে। সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখতে অনৈতিক পথ থেকে বের হয়ে আসতে হবে বিএনপিকে।’

অর্থের বিনিময়ে প্রার্থিতা দেওয়ার সংস্কৃতি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, ‘যা রটে তার কিছু তো বটে। কিছু না হলে এটা রটবে কেন? গণতন্ত্রের চর্চা না থাকার কারণে এটা হচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল