ব্রেকিং নিউজ

৯ বছরেও শেষ হয়নি পাঁচ বছরের কাজ

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৯:১৮ | আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৫২

গাজী শাহনেওয়াজ

দেশের ৯ কোটি নাগরিককে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) স্মার্টকার্ড দেওয়ার লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ২০১১ সালে নেওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়ে সবশেষ নির্ধারিত আছে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত। চার বছর মেয়াদ বাড়ানোর পরও এখনো সবার হাতে পৌঁছেনি আধুনিক প্রযুক্তির এই কার্ড।

প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্মার্ট এনআইডি কার্ড মুদ্রণ হয়েছে সাড়ে ৬ কোটি। ইসির মাঠ পর্যায়ের অফিসে বিতরণের জন্য পাঠানো হয়েছে সেগুলো। চুক্তি অনুযায়ী বাকি আড়াই কোটি স্মার্টকার্ড মুদ্রণ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রধারী সব নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া কঠিন। তবুও তারা চেষ্টা করবেন।

বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পটির নাম আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর ইনহ্যান্স একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ)। প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশি সংস্থার ব্যর্থতায় স্মার্টকার্ড মুদ্রণ ও বিতরণ চলছে ইসির তত্ত্বাবধানে। তিন দফা মেয়াদ বাড়ানো হলেও এ প্রকল্পে নতুন করে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তাই এ প্রকল্পের মেয়াদ নতুন করে বাড়ানোর প্রস্তাব দিচ্ছেন না তারা। আগামী ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

ইসির একটি সূত্রে জানা যায়, স্মার্টকার্ড প্রকল্পের মেয়াদ আর না বাড়িয়ে আইডিইএ কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে দ্বিতীয় প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করে দিয়েছে সরকারের কাছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। এটি পরিকল্পনা কমিশনে পর্যালোচনাধীন। আগের প্রকল্পের চেয়ে কয়েকশ কোটি টাকা বেশি প্রস্তাব করায় কিছু আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

আইডিইএ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা আপত্তির কথা স্বীকার করে বলেন, ‘পরিকল্পনা কমিশন বিদ্যুৎ বিলের ব্যয় প্রকল্পের সঙ্গে না রেখে আলাদা করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু আমরা বলেছি বিদ্যুৎ বিল প্রকল্পের ব্যয় থেকে আলাদা করে কোনো কোডে দেওয়ার কোনো রুলস্ নেই।’

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুল ইসলাম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, দেশে প্রথম ৯ কোটি ভোটারকে স্মার্টকার্ড দিতে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। ফ্রান্সের ওবার্থু টেকনোলজিস (ওটি) কোম্পানির সহায়তায় আধুনিক স্মার্টকার্ডটি সংগ্রহ ও মুদ্রণ করে ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। কিন্তু শর্তানুযায়ী কার্ড সরবরাহ করতে না পারায় তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়।

সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে সরকারের কাছ থেকে ৪০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ নিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্মার্টকার্ড দেওয়া শুরু করি। এরই মধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ৬ কোটি নাগরিকের কার্ড মুদ্রণ করে বিতরণের জন্য মাঠ পর্যায়ে পাঠিয়েছি। এখনো আড়াই কোটি নাগরিকের কার্ড মুদ্রণ বাকি আছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আমরা যেহেতু পুরোনো প্রকল্পের অধীন সবাইকে স্মার্টকার্ড দিতে পারিনি তাই নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প তৈরি করে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হয়ে এলে এর অধীন ভোটার হওয়া নাগরিকদের স্মার্টকার্ড দিতে পারব।’

আইডিইএ প্রকল্পের অফিসার ইনচার্জ (অপারেশন, প্লানিং ও কমিউনিকেশন) স্কোয়াডন লিডার কাজী আশীকুজ্জামান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, স্মার্টকার্ড দ্বিতীয় প্রকল্পের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছর ইসির যত ভোটার হবেন তাদের এ প্রকল্পের অধীনে স্মার্টকার্ড দেওয়া হবে।

ইসির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে নতুন কিছু উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ১০ বছরের বেশি বয়সি যেসব নাগরিক আছে, তাদের তথ্য সংগ্রহ করে এ প্রকল্পের অধীন স্মার্টকার্ড দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালিদের ভোটার করে তাদেরও স্মার্টকার্ড দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিদ্যমান প্রকল্পের বাকি আড়াই কোটি ভোটার এ প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে স্মার্টকার্ড পাবেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। বর্তমানে ইসির তথ্যভান্ডারে ১০ কোটি ৯৬ লাখ নাগরিকের তথ্য আছে। তারাও এ প্রকল্প থেকে স্মার্টকার্ড পাবেন। ২০২৫ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য কত ভোটার ইসির তথ্যভান্ডারে যুক্ত হতে পারেন, সেটাকে আমলে নিয়ে নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। তবে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রস্তাবে ২০২০ সালের জুলাই থেকে স্মার্টকার্ড দ্বিতীয় প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তাব রয়েছে।

জানা গেছে, প্রথমে ৯ কোটি নাগরিককে স্মার্টকার্ড দেওয়ার জন্য ১ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১১ সালের জুলাইয়ে। ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি স্মার্টকার্ড সরবরাহকারী ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান ওবার্থু টেকনোলজিসের (ওটি) সঙ্গে ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার বা ৮১৬ কোটি টাকার চুক্তি করে ইসি। চুক্তিতে ২০১৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ৯ কোটি ভোটারের জন্য স্মার্টকার্ড উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর শুরু হয় বিতরণ। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র স্মার্টকার্ড প্রদান ও বিতরণ প্রকল্পের মেয়াদ ১৮ মাস বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু এতেও কাজ শেষ হয়নি।

পিডিএসও/হেলাল