শহরের সুবিধা পাবে ২৫ গ্রাম

প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ০৮:১৯ | আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ১৪:২৭

গাজী শাহনেওয়াজ

ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মুজিবশতবর্ষে দুই ভাগে ২৫টি গ্রামে শহরের সুবিধা দেওয়ার কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ পরিবেশ ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। এক ভাগে ১০টি গ্রামে শহরের সুবিধা পৌঁছে দিতে কাজ করবে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ। অপর ভাগে ১৫টি গ্রামের উন্নয়ন করবে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয় ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ পরিকল্পনা। এটি ছিল মূলত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ স্মরণীয় করে রাখতে নির্বাচিত ১০টি গ্রামে শহরের সুবিধা পৌঁছে দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার পূরণ করা হবে। তাদের নির্বাচিত গ্রামগুলো হচ্ছে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী, জামালপুরের মাদারগঞ্জ, কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ, সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, যশোরের মনিরামপুর, রংপুরের মিঠামাইন, রাজশাহীর তানোর এবং বরিশালের গৌরনদী।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য সম্প্রতি তার দফতরে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকাকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ও তথা বাঙালির মহানায়ক। তার জন্মশতবার্ষিকী স্মরণীয় করে রাখতে আমার মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রথমে ১৬টি গ্রামে শহরের সুবিধা সংযোজনের চিন্তা করে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। যেহেতু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আমার গ্রাম ও আমার শহরের মূল ভূমিকায় রয়েছে, তাই আমাদের পরিকল্পনা কিছু কাটছাঁট করে ১০টি গ্রামে শহরের সুবিধা সংযোজন করার উদ্যোগ নিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এ গ্রামগুলো আগামীর প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।’

এদিকে, সারা দেশে গ্রামে শহরের সুবিধা দেওয়ার মূল কাজটির নেতৃত্বে আছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রাথমিক খসড়ায় ১৫টি গ্রাম নিয়ে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা আছে তাদের। সেই ১৫টি গ্রাম এখনো চূড়ান্ত না হলেও প্রাথমিকভাবে কিছু বৈশিষ্ট্য ঠিক করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কোনো একটি অঞ্চল কিংবা গোষ্ঠী বা শ্রেণি যাতে বঙ্গবন্ধুর ওই চিন্তা থেকে বাদ না পড়ে; সে বিবেচনায় সমতলের আটটি এবং বিশেষ অঞ্চলের (হাওর, উপকূলীয়, পার্বত্যাঞ্চল, উত্তরের চরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চলের বিলাঞ্চল এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলসংলগ্ন) সাতটি গ্রামকে শহরের সুবিধা দিয়ে উন্নত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জাতীয়ভাবে এ কাজ করার জন্য ১৮টি মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে মূল দায়িত্ব পালন করছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ৩ সেপ্টেম্বর। কীভাবে কাজটি করা হবে, তার প্রাথমিক ধারণা নিয়ে আলোচনা হয়েছে ওই সভায়।

সূত্রমতে, সভায় বলা হয়েছে, গ্রামগুলো শহরের মতো হয়ে যাবে না, শুধু শহরের সুবিধাগুলো সেখানে সন্নিবেশ করে নাগরিক সুবিধা বাড়ানো হবে। সেখানে ঠিক থাকবে সব ধরনের গ্রামীণ অবয়ব।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম এ বিষয়ে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকাকে বলেন, গত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল, তাতে প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ উদ্যোগ নেওয়ার বিশেষ অঙ্গীকার ছিল। সেটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। গ্রামকে আধুনিক শহরের সব সুবিধা দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

মন্ত্রী বলেন, গ্রাম পর্যায়ে কৃষিযন্ত্র সেবাকেন্দ্র ও ওয়ার্কশপ স্থাপন করে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ গ্রামীণ যান্ত্রিকায়ন সেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান করা হচ্ছে। অকৃষি খাতের এসব সেবার পাশাপাশি হালকা যন্ত্রপাতি তৈরি ও বাজারজাত করতে প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নত জীবনের আশায় মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে আসছে। আমরা যদি গ্রামে শহরের সব সুবিধা নিশ্চিত করি, তাহলে মানুষ আর শহরে আসবে না। গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন কল-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘এ উদ্যোগের মাধ্যমে উন্নত যোগাযোগ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, কম্পিউটার ও দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মানসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক শহরে রূপান্তরিত করা হবে।’

মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম আরো বলেন, গ্রামে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গুণগত মান এবং টেকসই নিশ্চিত করা। গ্রামে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা তৈরির জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টতা আছে। এজন্য সব মন্ত্রণালয়কে এক হয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিজ নিজ মন্ত্রণালয় তাদের করণীয়গুলো সম্পন্ন করতে তৎপর রয়েছে। নতুন কিছু সংযোজন করতে চাইলে তা তারা করতে পারবে। এরপর কাজের অগ্রগতি বিষয়ে মন্ত্রণালয়গুলো একটি সমন্বিত প্রস্তাব প্রতিবেদন আকারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দেবে। তিনি বলেন, এ পরিকল্পনা বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। মন্ত্রী বলেন, সরকার ডেল্টাপ্ল্যান হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পটি যেমন বর্তমান সরকারের এই মেয়াদে সম্পন্ন হবে না, একইভাবে আমার গ্রাম, আমার শহর প্রকল্পেরও সব কাজ শেষ করতে সময় লাগবে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, মানুষের শহরমুখী হওয়ার যে প্রবণতা, তা নিরুৎসাহিত করতে শহরের সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দিতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমদ প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকাকে বলেন, গ্রামকে শহরীকরণ করার এই চিন্তায় গ্রাম কিন্তু অচেনা হবে না। শুধু শহরের সুযোগ-সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, গ্রামে যে পুকুর ছিল তা অক্ষত থাকবে। পাখির কিচিরমিচিরও শহরের সুবিধায় বিলীন হবে না। মোরগের ডাকে গ্রামের মানুষের ঘুম ভাঙবে। এসবে কোনো পরিবর্তন হবে না।

সরকারের এই উদ্যোগ যুগোপযোগী বলে মনে করছেন সুধীজনরা। তারা বলছেন, উন্নয়নের শিখরে দেশকে পৌঁছে দিতে হলে গ্রামকে শহর থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যাবে না। গ্রাম ও শহরের তফাত কমাতে হবে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকাকে বলেন, গ্রামের অবয়ব ঠিক রেখে শহরের সুবিধা সংযোজনের চিন্তাটি নতুন নয়। বঙ্গবন্ধু বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রথম এ চিন্তা করেছিলেন। এত দিন পর তারই কন্যা নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়টি সামনে আনায় মানুষের কাছে নতুন মনে হচ্ছে।

জানা যায়, প্রতিটি গ্রামকে শহরের সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের অনেক আগের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নগর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে কৃষি বিপ্লব, গ্রামে বিদ্যুতায়ন, কুটির শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পের বিকাশ, শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন করে গ্রামাঞ্চলে আমূল পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তার দেখানো পথে হাঁটতেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত করে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ কর্মসূচি।

পিডিএসও/হেলাল