নদীভাঙন রোধে মহাপরিকল্পনা

*৩৩ জেলাকে হটস্পট ঘোষণা *৫৩ নদীতীর সংরক্ষণে প্রকল্প গ্রহণ *দেশকে বিপজ্জনক ৬ গ্রুপে বিভক্ত

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:০৬

গাজী শাহনেওয়াজ

বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ এবং নদীমাতৃক দেশ। বন্যার ঝুঁকি, নদীভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সঙ্গী করেই চলতে হয় দেশের উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের। নদীর একদিকে ভাঙন অন্যদিকে গড়া এই অবস্থা নিঃস্ব করেছে অনেক মানুষকে। কষ্টে গড়া স্বপ্নও ভেঙেছে অনেকের। এমন পরিস্থিতিতে নদীভাঙন রোধ, নদী শাসন, নাব্য রক্ষা এবং সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে শত বছরের বদ্বীপ মহাপরিকল্পনা করেছে সরকার। ঠিক করা হয়েছে কর্মকৌশল। এরই অংশ হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনপ্রবণ ৩৩ জেলাকে হটস্পট (এমন অঞ্চল বা এলাকা যেখানে বিপজ্জনক পরিস্থিতি বা মহামারির শঙ্কা আছে) ঘোষণা করা হয়েছে। হটস্পট চিহ্নিত নদী অঞ্চল এবং মোহনাকে সমন্বিত ও টেকসই করে গড়তে নেওয়া হয়েছে অভীষ্ট লক্ষ্য; প্রকৃতির ভয়াবহতা বিবেচনায় ৬ গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে দেশকে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন ও পাউবো সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এ কর্মকৌশল বাস্তবায়ন হলে নদী ও নদীর মোহনায় পানি প্রবাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন পানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপে দেশে বন্যার ঝুঁকি হ্রাস পাবে, নদীভাঙন রোধও সম্ভব হবে। উপকূল এলাকায় নতুন ভূমি জাগবে। দেশের আয়তন বাড়বে। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানসহ সার্বিক জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে।

প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রতি বছর দেশে ব্যাপক বন্যা হয়। চলতি বছর এ বন্যা জুন থেকে শুরু হয়। এখনো অতি-বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন জেলায় বন্যা অব্যাহত আছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের রংপুরে রেকর্ড বৃষ্টিতে নাকাল সেখানকার মানুষ। টানা বৃষ্টিপাত চলছে দক্ষিণাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায়। কর্মব্যস্ত মানুষের ঘর থেকে বের হওয়া দুরূহ হয়ে উঠেছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন বলছে, এবার বন্যায় ৩৩ জেলা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঁচা-ঘরবাড়ির পাশাপাশি গবাদিপশু ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সমন্বয় করে দুর্যোগ মোকাবিলায় তৎপর রয়েছে সরকার। বন্যা ও নদীভাঙনকবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছে সরকার। এ ছাড়া পাউবোর স্পিডবোটের সহায়তায় ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৩৩ জেলার নদীভাঙন কবলিত এলাকার ছয় ধরনের ক্যাটাগরিতে ক্ষতি নির্ধারণ করে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ক্ষতিগ্রস্ত ৬৩.০১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নদীতীর ভাঙনরোধ, তীর সংরক্ষণ কাজের ক্ষতি, বাঁধের ব্রিজ, বাঁধের সম্পূর্ণ ও আংশিক ভাঙন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো উন্নয়নে ১০৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। আরো ৮৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৪ দশমিক ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য তীরের মেরামত কাজ চলছে।

এ ছাড়া বন্যায় নদীভাঙন রোধ, বাঁধ ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি রোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পাউবোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রয়োজনীয় জিওব্যাগ ও সরঞ্জমাম নিয়ে মেরামত কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেবে সরকার। এজন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পাউবোর বাস্তবায়নাধীন ১০১টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৩ নদীতীর সংরক্ষণধর্মী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে কাজ শেষ হবে।

এদিকে, সারা দেশে নদীভাঙন মহামারি রূপ নিয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা বাঁধ ভেঙে নদীর পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আর শরীয়তপুরে পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি। ভাঙন ঠেকাতে বালুর বস্তা ফেলা হয়েছে। জাজিরার উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের দুর্গারহাট এলাকা ও উপজেলার কুরেরচর ইউনিয়নের সিডার চরেও একই অবস্থা। নিঃস্ব অবস্থায় আপাতত পাশের গুচ্ছ গ্রামের উঁচু জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ার এ প্রসঙ্গে বলেন, আমি যমুনা পাড়ের লোক। দুইবার আমার দাদা ও শ্বশুরবাড়ি ভাঙনের কবলে পড়েছে। আমি জানি ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের সমস্যা আর দুঃখ দুর্দশার কথা।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনরোধে উদ্যোগ নিয়েছেন। আমরা এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আশা করছি, আগামীতে এ অঞ্চলে ভাঙনজনিত সমস্যা আর থাকবে না।

এদিকে, উন্নয়ন সংস্থাগুলো নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় এ পর্যন্ত ৩৩৪ উপজেলার ৬৬ শতাংশে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টি ইউনিয়নে ২ থেকে ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এসব এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে নদীরতীর রক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

সিইজিআইএসের নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান বলেন, প্রতি তিন-চার বছর পরপর দেশে বড় বন্যা হয়, এবারও তাই ঘটছে। ফলে এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে বন্যা স্থায়ী হয়েছে। তাছাড়া পানির স্রোতও বেশি। প্রতি বছর নদীভাঙনের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয় তা আমলে নিয়ে নদীপাড়ের অবকাঠামো নির্মাণ করলে বিপুল সম্পদের বিনাশ হতো না।

পিডিএসও/হেলাল