এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে...

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২০, ১৬:৫৫

মোহাম্মদ আবু নোমান

“...আপনারা কেন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জোট করতে গেলেন? কেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে গেলেন? আবার গেছেন, আগে কেন এজেন্ডা ঠিক করলেন না? আপনারা ড. কামাল হোসেনকে জাতীয় নেতা বানালেন। তিনি কবে জাতীয় নেতা ছিলেন? তিনি গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার জন্য কী করেছেন? তিনি তো জাতীয়তাবাদী শক্তির কেউ নন। তার সঙ্গে তো আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, আদর্শিক নয়। তিনি তো সব সময় তার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কথাই বলেন। ড. কামাল যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতেন তা হলে তো এই সরকার থাকত না...।” কোরবানির ঈদের দিন রাতে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের ভাড়াবাসা ফিরোজায় দলের স্থায়ী কমিটির নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে দেশের রাজনৈতিক নানা প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনাকালে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। কিন্তু বেগম জিয়া কী ভুলে গেছেন, আওয়ামী মনোনয়ন চাওয়া গোলাম মাওলা রনি কোন আদর্শের জন্যে বিএনপিতে এসেছিলেন? দেশে বরাবরই নির্বাচনের আগে দলবদলের জোয়াড় বয়ে থাকে। তারপরও অন্যসব রাজনৈতিক থেকে গোলাম মাওলা রনি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, অন্যান্য নেতাদের কেউই এত নীতি আর আদর্শের খই ফোটাননি, বিভিন্ন মিডিয়ায় তিনি যতটা ফুটিয়েছেন। এত নীতিবান মানুষ আগে আওয়ামী লীগ করতেন আর মনোনয়নের অন্তিম মুহূর্তে কোনো সবুজ সংকেত না পেয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কী নীতি রক্ষা করবেন?

এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে...
এটি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিরচিত মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্যের ষষ্ঠ সর্গ থেকে নেয়া। রাবণের জ্যেষ্ঠ সন্তান এবং রক্ষবংশের শ্রেষ্ঠ বীর ইন্দ্রজিতের মুখ নিঃসৃত বাক্যের পূর্বের অংশ। ন্যায়যুদ্ধে মেঘনাদকে পরাজিত করতে না পেরে দেবরাজ ইন্দ্রের সহায়তায় রাতের আঁধারে তস্করের ন্যায় লক্ষণ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করে। মেঘনাদ তখন পূজার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। লক্ষণ সেই অবস্থাতেই তাকে আক্রমণ করতে উদ্ধত হয়। আত্মরক্ষার্থে পূজার ঘর থেকে অস্ত্রাগারে যাবার সময় মেঘনাদ দেখে, বাইরে থেকে তার চাচা বিভীষণ পথরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। চাচাকে এ বেঈমানি করতে দেখে মেঘনাদ বলে ওঠে, ‘এতক্ষণে, জানিনু কেমনে আসি লক্ষণ পশিল রক্ষঃপুরে...’। এই যে উপলব্ধি, রাবণ পুত্রের এই যে হাহাকার-এটা প্রবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলা ভাষায়। অর্থাৎ, বিভীষণের বিশ্বাসঘাতকতায় বিষণ্ন হয়ে মেঘনাদ বলছে, এতক্ষণে বোধগম্য হলো, লক্ষ্মণ কী করে রাক্ষসপুরীতে ঢুকল। এটা যে বিশ্বাসঘাতক বিভীষণের সহযোগিতাতেই সম্ভব হয়েছে তা পরিষ্কার। যে ড. কামাল খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আইনগত লড়াই করতে অনিহা জানিয়ে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলামকে। সেই কামাল হোসেনই আবার খালেদার মুক্তির জন্য ভোট চেয়েছেন জনগণের কাছে। শুধু নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা মুনিদের জোট করা ও ভাঙা-গড়া একটি দেশের রাজনীতি ব্যবস্থার জন্য কোন সুভলক্ষণ নয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগে বিএনপির জোট বা ঐক্য গঠন নিয়ে দেশের বোদ্ধামহল নানা অভিমত ব্যক্ত করলেও বিএনপি তখন আমলে নেয়নি। বেগম খালেদা জিয়া গত কুরবানির ঈদের দিন রাতে যে কথা বলেছেন, বিএনপির সে ভুলটি সম্পর্কে তখন দেশের রাজনৈতিক বোদ্ধামহল বুজেছে, জেনেছে, আওয়াজও দিয়েছেন। কিন্তু বিএনপি তা আমলে নেয়নি। এ বিলম্বিত বোধোদয়ের মাসুলই আজ দিতে হচ্ছে, খোদ বেগম খালেদা জিয়াসহ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের।

শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, আদর্শিক নয়
২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত ছাড়ার আগে আরও আলোচনার পক্ষে মত দিয়েছেন খালেদা জিয়া। জামায়াত ছাড়ার বিষয়টি স্বল্প সময়ের চিন্তা না করে, দীর্ঘ মেয়াদে চিন্তা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। কিন্তু জোটের শরিক দল দুর্বল হয়ে যাওয়াকে জোটেরই দুর্বল হওয়া মনে না করা কি বিএনপির ভুল ছিল না? ক্ষমতাসীনরা বিরোধী জোটের নেতাদের এক এক করে যখন টার্গেট করেছে, তখন সম্মিলিত আন্দোলন না করা কি ভুল ছিল না? রাজনীতি হলো ‘নীতির’ ব্যাপার, আদর্শের ব্যাপার, চিন্তা চেতনার ব্যাপার। মানুষ ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু নীতি-আদর্শ বা সুবিধার জন্য নুয়ে যেতে পারে না। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জোটের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ‘পিঠা ভাগ করতে গেলেও টানাটানি করতে হয়’। অর্থাৎ ড. কামাল সংসদীয় আসনকে ‘পিঠা’র সাথে তুলনা করেছিলেন! পিঠা মানেই যে হালুয়া রুটি! রাজনীতি দেশে খুব লাভজনক বিজনেস। আপামর জনগণ তথা গণতন্ত্র হলো পণ্য। একে যেভাবে যে পারে, সবাই ব্যবহার ও প্রয়োজনমত টানাটানি, বেচাকেনা করে থাকে। এদলে ব্যবসা হয় নি, তাই অন্য কোথাও হবে! বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘ড. কামালের সঙ্গে তো আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, আদর্শিক নয়...।’ দেশের নির্বাচনের পূর্বমুহূ
র্তে জোটের নামে ‘নীতিহীনতার ঐক্য’ যারা করে থাকেন, তারাও ভালো করেই বুঝেন, তাদের হিসেবের ফল ও ওজন কতটুকু! নীতি ও আদর্শহীন নব্য নেতারা ‘গরিবের ভাবী’ হিসেবে ইউজ হয়ে একবার বিএনপি আরেকবার আওয়ামী লীগের নৌকায় চড়ে বসেন। বর্তমানে সে চান্স জাপা নিয়ে নিলেও সবাই যে তাদের পরকিয়া প্রেমিকের মতো ‘ভোগ’ করবে; না মান দিবে, না মন দিবে, না বিশ্বাস করবে; সে বিষয়টি জাপা আজ হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে।

রাজনীতি কেন আজ সবার ভাউজ?
‘আমাদের গ্রামে একটা প্রবাদ আছে, গরিবের বউ নাকি সবারই ভাউজ। অহনে যারা শহরে থাকেন, তারা তো ভাউজ চিনবেন না। ভাউজ হইলো ভাবি। ভাইয়ের বউকে ভাবি ডাকি আমরা, গ্রামে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাবিদের ভাউজ ডাকা হয়। আর গরিবের বউ হলে মোটামুটি পাড়া বা গ্রামের সবাই আইস্যা ভাউজ ডাকে। এহন রাজনীতি হয়ে গেছে গরিবের বউয়ের মতো। এখানে যে কেউ, যেকোনো সময় ঢুকে পড়তে পারে। কোনো বাধা বিঘ্ন নাই।’ স্বভাবসুলভ রসবোধ আর কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত ৫১তম সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার বক্তব্যে কতিপয়ের নব্য রাজনীতিবিদ বনে যাওয়ার প্রবণতাকে কটাক্ষ করেছেন এসব কথা বলেছিলেন। কথা সত্য। ম্গ্ধু করার মতো সরলতা, অপকটতা ও রসবোধে অতুলনীয় রাষ্ট্রপতি কৃত্রিমতা ছাড়া ঠিক কথাই বলেছিলেন। কিন্তু এদেশে কে শুনবে কার কথা! বাংলাদেশের রাজনীতিতো ‘জগাখিচুড়ি’ অবস্থা। সবাই এখন রাজনীতি করতে চায়। তার কারণ কী? কারণ হলো- বর্তমানে রাজনীতি একটা লাভজনক ব্যবসা! এখন দেশপ্রেমের রাজনীতি কেউই করে না। আগে সমাজের মহৎ, শিক্ষাবিদ, শিক্ষানুরাগীরা স্ব-উদ্যোগে, বাপের সম্পত্তির উপর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সেবামূলক হাসপাতাল গড়ে পৈতৃক সম্পত্তি নিঃশেষ করতেন। আর এখন নিঃস্বরা রাজনীতি করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়! রাষ্ট্রপতি মহোদয় মাঝে মধ্যেই কিছু অপ্রিয় সত্য উপহার দেন। যা কতিপয় ছোট মনের মানুষের কাছে খারাপ লাগতে পারে। সত্য কথা সমালোচনার ভয়ে অনেকেই বলতে চায় না। মহামান্য রাষ্ট্রপতি একজন সাদা মনের, ভাল ও ভদ্র মানুষ, স্পষ্ট ভাষী, যার সরলতা ও রসবোধ অতুলনীয়। 

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই
বিএনপি সব খুইয়ে এখন ভুল বুঝতে পেরেছে। অনেক ভুলের সমষ্টিগত ফলই আজ খালেদা জিয়ার কারাবাসের কারণ। রাজনীতির বোঝাপারায় আওয়ামী লীগের সামনে বিএনপি আজ শিশুমাত্র! রাজনীতিবিদরা তো নিজেদের নীতিহীনতাকে আড়াল করতে মোক্ষম একটা স্লোগান আগে থেকেই বাঙালিদের সামনে ঝুলিয়ে রেখেছে, তা হলো- ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’। সারা জীবন ধরে যাদের বিপরীতে বসে, যাদের বিরুদ্ধে বড়বড় বুলি আউড়িয়েছেন, আজ তাদের পাশে বসে নিজের বলা কথাগুলো নিজের গায়ে মাখিয়ে নেবার নীতিহীন আদর্শের নামই কি রাজনীতি? ‘নীতি’ নামক শব্দটা এখন শুধুই বইয়ের পাতায় রেখে, আর বাংলাদেশের ভাষা থেকে ‘লজ্জা’ শব্দটা মুছে দেয়া উচিত! বরাবরই যিনি ‘পাণ্ডিত্যপূর্ণ’ কথায়, ভাষণে, কলামে কোনো এক দলকে অথর্ব দল হিসেবে প্রমাণ করার অব্যর্থ সব যুক্তি দেখিয়েছেন, পরবর্তীতে তিনি নিজে সেই দলে যোগ দিয়ে, ক্ষমতায় আসার বাসনায় আপোষ করলেন? ইতিপূর্বে যে দলের দোষ খুঁজে বেরিয়েছেন আজ সেই দলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবেন, নতুন খোলসে পুরোনো স্বাদ পেতে! বাহ! কি চমৎকার আমাদের রাজনৈতিক চেতনা। মুহুর্তে জয় বাংলা, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ হয়ে যাবে! যিনি আজ এক কথা বলেন, কাল আবার আরেক কথা বলেন, একবার বলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী, আবার বলেন জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী; সে দেশের জন্য বা মানুষের জন্য যে কি করতে পারবে সে ব্যাপারে যথেষ্ঠ সন্দেহের কারণ থাকে কী? 

জনপ্রতিনিধি হওয়ার লাভবান ব্যবসা
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনগণের জন্য কাজ করে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে হয়। গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় সব কিছুই জনগণের জন্য এমনটাই বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে মুখে গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা নেই। ক্ষমতা পাওয়াই যেন মুখ্য বিবেচনা। ক্ষমতার জন্য চলে সব নীতি বিসর্জন। পাঁচ-দশ কোটি টাকা ইনভেস্ট করে জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রতিযোগিতার ধুম পরে যায়। কারণ, জনপ্রতিনিধি হওয়ার মতো লাভবান ব্যবসা আর দ্বিতীয়টি নেই! শুধু টাকার জোরে সস্ত্রীক সাংসদ হয়েছেন কুয়েতে মানব পাচারে অভিযুক্ত মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম (পাপুল)। ঘাটে ঘাটে টাকা দিয়ে প্রথমে নিজে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ হন। পরে স্ত্রী সেলিনা ইসলামকেও একইভাবে সংরক্ষিত আসনে সাংসদ বানান। 

বেগম খালেদা জিয়া কখনো ভেবেছেন কী, এতো জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও এ বয়সে তাকে জেলে থাকতে হবে? এখন যেমনটা ক্ষমতাসিনরা ভাবছেন না, আগামীতে তাদের কী হতে পারে! জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ায় আওয়ামী লীগ সন্তোষ ও উল্লাস প্রকাশ করেছে। তাদের ভাবখানা এমন যে, আমরা একেবারেই শুদ্ধ, পূণ্য ও পূতপবিত্র! শাসন কর্তৃত্বের প্রতিটি ক্ষেত্রে যখন চোর, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজদের রাজত্ব ও দোর্দন্ত প্রতাপ, সেখানে খালেদা জিয়ার রায়ে হৈ-হুল্লা করা হাস্যকর নয়কী? কারণ এখনও প্রতিদিনের সংবাদপত্রে বড় বড় চুরি, দুর্নীতি, লুটতরাজের খবর পাওয়া যায়। খালেদা জিয়া দোষী কী নির্দোষ, এ প্রশ্ন বাদ দিয়ে প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, এ দেশের রাজনীতিবিদদের বড় একটা অংশ যে দুর্নীতিতে ডুবে আছে, তা অস্বীকার করার জো আছে কী? খালেদা জিয়াও যে তার ব্যতিক্রম এমন কথা জোর গলায় বলা যাবে কি? ট্রাস্টের টাকা নিজে আত্মসাৎ যদি নাও করে থাকেন, ক্ষমতার অপব্যবহার কি করেননি?