জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষদের দায় নিবে কে?

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২০, ০৮:৪৪

ফজলে রাব্বী খান

সম্প্রতি আইএমও-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদন বাংলাদেশের জলবায়ু সংকটের নতুন একটি দিক উন্মোচিত করেছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে ঢাকার বস্তিবাসীদের ৭০%-ই হচ্ছে জলবায়ু উদ্বাস্তু। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুভিটা হারিয়ে জীবিকার সন্ধানে এসকল গৃহহীন মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত ছ'বছরে বাংলাদেশের ৫৭ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছেন, তারা সবাই জলবায়ু উদ্বাস্তু।

বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ১.১ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য অ্যান্ডিজ, মধ্য ইউরোপ এবং উত্তর এশিয়ায় যেসব হিমবাহ রয়েছে, সেগুলোর বরফ ৮০ শতাংশ গলে যাবে। ফলশ্রুতিতে নিচু এলাকায় বসবাসরত প্রায় ৭০ কোটি মানুষ তাদের বাস্তুভিটা হারাবে, শুধু তাই নয় এর ফলে বড় ধরনের ঝড় ও বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাসের পরিমাণও বিপদজনক হারে বাড়বে।

ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এগুলোর মত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে এদেশের মানুষের পরিচয় জন্মলগ্ন থেকেই। তবে সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তন প্রতি বছরেই নতুন রূপ নিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের যে ১৫টি দেশ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তার ভেতরে বাংলাদেশ অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিপদজনক ধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে দেশের প্রায় ১৯টি জেলার প্রায় ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, আর এই কারণে নতুন করে জলবায়ু উদ্বাস্তু হবে প্রায় দুই কোটি মানুষ৷ এই বিপর্যয়ের খেসারত দিতে হবে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলের দরিদ্র মানুষদের। ধারণা করা হয় বর্তমানে বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ এবং ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুর খাতায় যুক্ত হবে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বহুমাত্রিক। এই পরিবর্তনের কারণে মানুষ-জন যে শুধু উদ্বাস্তুই হচ্ছে তাই নয়, বরং অর্থনীতি এবং জাতীয় জীবনেও এর রয়েছে বিরূপ প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সব থেকে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিশুরা। পিতা-মাতাদের পেশা হারানো বা কর্মহীন হয়ে পরার ফলে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের হার আশংকাজনক ভাবে বাড়ছে, একই সাথে বাড়ছে মেয়ে শিশুদের বাল্য বিবাহের পরিমাণ। ইউনিসেফ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিধ্বংসী বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশে ১ কোটি ৯০ লাখের বেশি শিশুর জীবন ও ভবিষ্যতকে হুমকির মুখে ফেলছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৮০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রায় ৪০ ভাগ এলাকায় প্রবল লবণাক্ততা দেখা দিবে, এর ফলে কৃষি উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে পড়বে বিরূপ প্রভাব। এই ৪০ ভাগ এলাকায় প্রায় ৫ কোটি মানুষের বসবাস৷ এর ফলে ফসলি জমি নষ্ট হবে, কৃষক-জেলে তাদের পেশা এবং আবাস হারাবেন৷ বিশ্ব ব্যাংক মনে করে জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিধ্বংসী ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রায় ১৩ কোটি ৩৪ লাখ মানুষের মাথাপিছু জিডিপি ১৪.৪ শতাংশ হ্রাস পাবে, এতে আথির্ক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৭১ বিলিয়ন ডলার। 

বিগত ২০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০৫০ সালের ভেতরে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ গুণ পরিমাণ হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে লেখা যত দীর্ঘতর হবে এধরনের আশংকাজনক তথ্যের পরিমাণও তত বেশি আলোচনায় চলে আসবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের দায়ভার মূলত ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ধনী দেশগুলোর হলেও এর খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশ এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী অনুন্নত দেশগুলোর। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নানা গালভরা কথা শোনা গেলেও কার্যকরী পদক্ষেপ কেউই নিচ্ছে না। আজকের দিনের বাংলাদেশের ৬০ লাখ জলবায়ু উদ্বাস্তুর দায়িত্ব কে নিবে? কারাই বা ক্ষতিপূরণ দাবি আগামীর বাংলাদেশের ১ কোটি ২০ লাখ জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের? যাদের বেশিরভাগেরই স্থান হবে বড় বড় শহরগুলোর কোন অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে।

প্রকৌশলী

[email protected]

পিডিএসও/ জিজাক