এস এম মুকুল

  ০৪ এপ্রিল, ২০১৭

হাওরের কান্না

যে জলে আগুন জ্বলে

কবিতার ভাষা-‘যে জলে আগুন জ্বলে, নেভে না চোখের জলে।’ সত্যিই হাওরের কৃষকের নয়নের জলে যেন নিয়তির নির্মমতার আগুন জ্বলে। জল মানে পানি, যার অপর নাম জীবন। কিন্তু হাওরের পানি, জীবন-মরণের পানি। এই পানি হাওরের কৃষকদের স্বপ্ন ও স্বপ্ন ভঙ্গের সাথী। হাওরের কৃষকরা নিয়তির নিষ্ঠুরতা মেনে বুকে পাথর চেপে ধৈর্য ধরে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যায়। কখনো ফসলের জন্য পানি অথবা বৃষ্টির জন্য হাহাকার, কখনোবা অকাল বন্যায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফসলের জন্য করুণ আর্তনাদ। কিন্তু কে শুনবে হাওরবাসীর কষ্টের আর্তনাদ? একমাত্র সোনার ফসলটি যখন পানিতে ডুবে যায় তখন কৃষকের কষ্ট সহ্যের সীমা থাকে না। কিন্তু সেই কষ্ট লাঘব করার জন্য কে এগিয়ে আসবে, কে দেবে তাদের সান্ত্বনা। সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নাকি প্রকৃতি? পত্রিকার পাতায়, অনলাইনে, ফেসবুকে, টিভিতে হামেশাই প্রচারিত হচ্ছে হাওরের অকাল বন্যার খবর। এসব খবর দেখে, পড়ে বুক ভারি হয়ে যায়। কী নিদারুণ অসহায়ত্ব! কৃষকের কষ্ট ভাগ করতে হয়তো পারব না, তবে বিধাতার কাছে ফরিয়াদ জানাতে পারব। ‘হে বিধাতা তুমি রক্ষা কর।’ সরকার কি শুনতে পাচ্ছে হাওরবাসীর কান্না? হাওর ও জলাভূমি অধিদফতর, পানি উন্নয়ন বোর্ড কি গভীর তন্দ্রাচ্ছন্ন? জনপ্রতিনিধিরা উন্নয়নের ঢাকঢোল পিটিয়ে কী করেন সারাবছর। আজ কোথায় তাদের স্বপ্ন দেখানো বুলি।

এক সকালে শিক্ষক বন্ধুর ফোন এসেছে ধর্মপাশা জয়শ্রী থেকে। হাওরডুবির করুণ দৃশ্যাবলি বর্ণনা করলেন তিনি। ভারি হয়ে এলো তার কণ্ঠস্বর। বললাম, ছবি দেন ফেসবুকে। তিনি বললেন- না, এই দৃশ্য সহ্য করতে পারবেন না! হাওরবাসীরা যুগে যুগে এই অবস্থাকে যেন নিয়তির লিখন হিসেবেই মেনে নিয়েছেন। একটা সময় উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা এলাকার মানুষের বিশ্বাস এমনই ছিল। কাজ নেই কাজ নেই, মঙ্গায় ললাট লিখনের খেসারত দিচ্ছে সবাই। মঙ্গা এখন ঘুচে গেছে। তবে বিশ্বাস করি, হাওরের এই অকাল বন্যার হাহাকারও অচিরেই ঘুচবে। হাওরের অবস্থা নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া একটি স্টেটাস ছিল এমন-‘গ্রাম থাইক্কা স্বজনরা ফোন করতাছে, চৈত মাসে অভাইগ্যা আষাঢ়ের ঢল মানুষের এই বচ্ছরের আশাডারে ল-ভ- কইরা দিতাছে। বেকতা মিইল্ল্যা একটাই কতা একটাই দাবি-আমাগো সরহার (সরকার), লেম্বার (মেম্বার), চিয়ারম্যান আর এমপি আওহাইন খারোওহাইন আমরার সাথে। মোডেতো একটাই বান-চরহাজদিয়ার বেরি বান। মোহনগঞ্জ থাইক্কা গাগলাজুর-আইজ ক্যালা আমিলীগ, ক্যালা বিম্পি-এইতা নাই। বেহেই আইজ ঐ বান্দের কানিত সংসার ফাতছে, হেরার চউখ্খো ঘুম নাই। হেরা আমার বাফ হেরাই আমার মা, আমার বাই বইন। বান্দের ফানি একটু চুয়ায় আর দৌওইরা যায়। কেউ মাডি লইয়া কেউ উঁরা লইয়া। পুরা হাওরডাই হেরার সামনে বাড়া ভাত। হে মাবুদ আইজ বাড়া ভাতে পানি ডাল্লা! বউ পোলা এসির তল গুমাইতাছে আমরার তো গুম নাই। কি খবর? কি খবর? সারা রাইত ধইরা ফোন আর ফোন। এই শ্যাষ! সব শ্যাষ!!’ আহা, এই করুণ আর্তনাদ-তুমি অন্তত শুনো প্রভু-দোহায় তোমার!’

হাওরের কান্নায় সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। হাওরে কাঁচা-পাকা ধানের শীষগুলো কৃষকের সুখে থাকার একমুঠো আশা। যখন অসময়ে পাহাড়ি ঢলে পানির নিচে তা তলিয়ে যায়, তখন তারা চোখে অন্ধকার দেখে। প্রকৃতির কাছে এই অসহায়ত্ব কী যে নিদারুণ কষ্টের তা হয়তো শহুরে বাঙালিরা অনুভব করতে পারবে না! হাওরের মাছের কী স্বাদ, হাওরের ধানের চালের কী মৌ-সুবাস, হাওরের পাখির কলতান অথবা মাংসের স্বাদ, টাঙুয়ার হাওরের সুন্দরের লীলাকেতন আমাদের স্মৃতিতে অম্লান। কিন্তু হাওরের মানুষের কষ্ট আমরা কতটা বুঝি, কতটা খুঁজি।

বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনারথাল হাওরের ৫০০ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। দিরাই উপজেলার বরাম হাওরের তুফানখালী, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সোনাতলা কাইক্কার ধাইর হাওরের ২০০ একর জমির ধান তলিয়ে গেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়া ও মইয়ার হাওরসহ জেলার আরো একাধিক হাওরের কাঁচা ধান। তাহিরপুর উপজেলার বোরো ভাণ্ডারখ্যাত শনি ও মাটিয়ান হাওরেও পানি ঢুকছে। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের একটি ও খালিয়াজুরির ১০টি ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে খালিয়াজুরির আরো ১২টি বাঁধ। এ ছাড়া জেলার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে বৃষ্টির কারণে ক্ষেতের ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জেলা কৃষি কার্যালয় সূত্র বলছে, চারটি উপজেলা মিলে অন্তত সাড়ে চার হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে। বাঁধে মাটি দিতে গ্রামের মসজিদের মাইকে কৃষকদের জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। সাংবাদিক সম্মেলন, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করে কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, এ বছর প্রায় ৫৫ কোটি টাকা হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধে সরকার বরাদ্দ দিলেও যথাসময়ে কাজ শুরু হয়নি। বাঁধের বরাদ্দ পাউবো ও সংশ্লিষ্টরা মিলে লোপাট করেছে। হাওরের কৃষকদের বুকভরা আশা ধুয়ে-মুছে যাচ্ছে হাওরের বাঁধভাঙা পানিতে। বোরো ফসল রক্ষায় পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছে না হাওরের মানুষ। একের পর এক বাঁধ ভাঙছে আর ডুবছে ঘাম ঝরানো, স্বপ্নবোনা সোনার ফসল। হাওর এলাকার উন্নয়নে ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি দেড় শতাধিক প্রকল্প সংবলিত ‘হাওর মহাপরিকল্পনা’র এই কি প্রতিফলন? আমাদের পানি উন্নয়ন বোর্ড আছে, তারা কী করছে কেউ জানে না। হাওরের উন্নয়নে একটি অধিদফতর আছে তাদের যে জনবল রয়েছে তা হাওরের উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখবে এ নিয়ে অনেকে সন্দিহান। তাছাড়া তাদের সঙ্গে হাওরের সংযোগ আছে কি না তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

চোখের সামনে কষ্টের ফসল পানির নিচে ডুবে যায়। ঋণ, কর্জ, লগ্নি আর খেয়ে-না খেয়ে কষ্টার্জিত ফসল তলিয়ে গেলেও কৃষক কিছুই করতে পারে না। প্রায় প্রতিবছরই তাদের এ রকম দুঃসহ দুর্ভোগ-দুর্ভাবনার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু কেন? মাছ আর ধান দিয়ে দেশকে খাদ্য ও পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেন এই হাওরবাসীরা। তাদের এত দুর্ভোগ কেন? বাঁধ তৈরি আর সংস্কারের নামে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে নয়-ছয় করা হলেও হাওররক্ষা বাঁধগুলোকে পরিকল্পিত ও স্থায়ীভাবে কেন গড়ে তোলা হয় না, তা নিয়ে রয়েছে জনমনে নানা প্রশ্ন।

হাওরাঞ্চলের মূল ফসল হলো বোরো ধান। আমাদের মনে রাখা দরকার, বছরে প্রায় তিন লাখ টন ধান উৎপাদন করে দেশের খাদ্য চাহিদা মেটায় হাওরবাসী। শুধু ধান নয়, হাওরাঞ্চলে রয়েছে প্রাকৃতিক মৎস্য ভা-ার। দেশের আহৃত মাছের শতকরা ২৫-৩৫ ভাগ এবং দেশীয় জাতের বিলুপ্তপ্রায় অনেক জাতের মাছ এখনো হাওরাঞ্চলে পাওয়া যায়। হাওরের জলাবদ্ধ ভূমিতে জন্মে নলখাগড়া, হিজল, করচ, ইকরা, জিংলা, বাঁশ এবং প্রচুর বনজসম্পদ। জাতীয় অর্থনীতিতে এত অবদান থাকার পরও হাওরবাসীর ফসলরক্ষা বাঁধ প্রায় প্রতিবছর ভেঙে যায়। এই ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে দীর্ঘদিনের নানা অনিয়ম আর নির্দয় অবহেলার খেসারত দিতে দিতে হাওরবাসীর জীবন এখন প্রায় নিঃশেষ হতে যাচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এখনই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কৃষি বিজ্ঞানীদের কাছেও নিবেদন, আপনারা হাওরের উপযোগী কম সময়ে অধিক ফলন সম্ভব এমন ধানের নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন করুন। আর কৃষি মন্ত্রণালয়, হাওর উন্নয়ন বোর্ডের উচিত হাওরাঞ্চলে বোরো ফসল কম সময়ে উৎপাদনশীল ধানের জাত কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করা। তাদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়া দরকার। শুকনো মৌসুমে হাওরের পতিত জমিতে সরিষা, মাসকলাই, মশুরকলাই, ভুট্টা, গম, শীতকালীন সবজি উৎপাদনে উৎসাহিত করা দরকার। বর্ষায় আখ চাষ করা যায় কি না সে বিষয়েও ভাবা উচিত। ভাসমান সবজি চাষ, কুটির শিল্প, গরু-ছাগল (ব্ল্যাকবেঙ্গল), মহিষ পালন, হাঁস ও মুরগির খামার প্রভৃতি প্রকল্পভিত্তিক বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে হাওরের প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist