তাসলিমা তামান্না

  ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ছবির সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব রেনেসাঁ যুগ থেকেই চলছে : রফিকুন নবী

বরেণ্য শিল্পী রফিকুন নবী বাংলাদেশের শিল্পকলার জগতে এক বহুমাত্রিক নাম। চিত্রকলার বিভিন্ন শাখায় তিনি বিচরন করেছেন । ড্রয়িং, ছাপচিত্র, জল রং, তেল রং ও অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি বইয়ের প্রচ্ছদ, অলংকরণ, পোস্টারসহ অনেক ধরনের ব্যবহারিক শিল্পকর্মের চর্চাও তিনি করেছেন এবং এখনও করছেন। তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজ 'টোকাই’য়ের মাধ্যমে তিনি অসাধারণ রসবোধ, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সঙ্গে সমাজসচেতনতার এমন সব বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন যা এদেশের চিত্রকলায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা । আর এই সিরিজের মাধ্যমে তিনি সবার কাছে পরিচিত হয়েছেন রনবী নামে। দেশে -বিদেশে অসংখ্য প্রদর্শনী, পুরষ্কার আর সম্মান অর্জন করা বরেণ্য এই শিল্পী কথা বলেছেন প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে....সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন - তাসলিমা তামান্না

কেমন আছেন?

রফিকুন নবী : নিজের কাজকর্মের মধ্যে থাকি। তাই বলতে পারি ভালো আছি।

চারুকলায় দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পর অবসর নিয়েছেন। এখন কীভাবে সময় কাটে আপনার?

রফিকুন নবী : কিছুদিন হলো চারুকলায় আবারো ক্লাস নিচ্ছি, সপ্তাহে তিন দিন। নিজের স্টুডিওতেও আমার অনেকটা সময় কেটে যায়। সেখানে হয় ছবি আঁকি, না হয় গান শুনি, কখনো বই পড়ি।

আপনার শৈশবের গল্প শুনতে চাই। কেমন ছিল দিনগুলো?

রফিকুন নবী : আমার জন্ম চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাতুলালয়ে, ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। যেহেতু বাবা সরকারি চাকরি করতেন, তাই আমার শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। ’৫২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় থেকেছি। এরপর পুরান ঢাকায় আমার বেড়ে ওঠা। আমার প্রথম স্কুল ছিল নানাবাড়ির কাছে। একদিন মা সাজিয়ে গুছিয়ে হাঁটার দূরত্বÑ এমন স্কুলে দিয়ে এলেন। বললেন, যাও ওখানে গিয়ে খেলাধুলা করে আস। আমিও খুশি মনে গেলাম। স্কুলে গিয়ে দেখি অন্য ঘটনা। ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে ক্লাসে বসানো হলো। দেখি স্যাররা অ আ...কী কী সব পড়াচ্ছে। আমার তো ভীষণ মন খারাপ হলো। তারপর কান্না শুরু করলাম। শিক্ষকরা আমাকে বাড়িতে দিয়ে গেলেন। মাকে বললেন, না ও শুধু কাঁদে। এভাবেই আমার স্কুলজীবন শুরু। এই স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করার মধ্যে বাবা একদিন বাড়িতে শ্লেট, পেনসিল, আদর্শলিপি নিয়ে আসলেন। বাবা অ, আ দেখানোর আগে শ্লেটে কিছু আম, পাখি, হাতিসহ নানা ধরনের ছবি এঁকে দেখালেন। আমিও মজা পেয়ে নকল করার চেষ্টা করলাম। এরপর বাবা অ, আ লিখে বললেনÑ এই দেখ আরেকটা ছবি। এভাবেই ছবি আঁকার পর অক্ষর চেনা শুরু হলো। এরপর বিভিন্ন জায়গায় পড়াশোনা করে পুরান ঢাকার নারিন্দায় এসে স্থায়ী হই।

তখনকার পুরান ঢাকার জীবনযাত্রা কেমন ছিল?

রফিকুন নবী : এখনকার বাবা-মায়েরা অনেক আতঙ্কের মধ্যে থাকেন সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে। আর আমরা নিজেরাই স্কুলে যেতাম। তখন নতুন ঢাকা বলে কিছু ছিল না। ওখানকার জীবনযাত্রা একদম অন্যরকম ছিল। বেশ একটা আমুদে অবস্থা ছিল তখন। লোকজনের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল। প্রত্যেক বাসার সঙ্গে প্রত্যেকের যোগাযোগ ছিল। আর প্রত্যেক পরিবারের ছেলেমেয়েরা খেলাধুলায় অংশ নিত। কোনো বাড়িতে ভালো রান্না হলে তা পাশের বাড়িতে দেওয়ার একটা প্রচলন ছিল। কারো অসুখ হলে অন্যরা এগিয়ে আসত। সবাই সবাইকে চিনত। আর পুরান ঢাকায় নানা উৎসবও হতো। তার মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানো ছিল অন্যতম। কিন্তু আমি ভালো ঘুড়ি ওড়াতে পারতাম না। আমার ভাইয়েরা পারত। আর আমি ঘুড়ি কেটে গেলে ধরার জন্য দৌড়াতাম। তবে আমি মার্বেল খেলায় বেশ ভালো ছিলাম। আমার ছোট ভাই ছড়াকার শফীকুন নবী, সেও এই খেলায় বেশ পটু ছিল। ছোটবেলায় আমি শান্ত স্বভাবেরই ছিলাম। আর দুষ্টুমি করতে গেলে ধরা খেতাম।

আঁকাআঁকিতে আগ্রহ তৈরি হয় কীভাবে?

রফিকুন নবী : বাবার কারণে শ্লেটে প্রথম আঁকাআঁকিতে আগ্রহ হয়। তারপর স্কুলে ড্রইং ক্লাস হতো। তবে আঁকাআঁকির দিকে ঝুঁকে যাওয়ার বড় কারণ আমার বাবা। কারণ বাবা সবসময় বাড়িতে ছবি আঁকতেন। পাড়ার দেয়াল পত্রিকা, হাইস্কুলে আঁকার জন্য আমাকে ডাকা হতো। বাড়িতে কলকাতার প্রবাসী পত্রিকা, এছাড়া আরো অনেক বিদেশি পত্রিকা নিয়ে আসতেন বাবা। ওগুলোয় কিছু রিপোর্ট আসত। ইউরোপিয়ান, চাইনিজ, জাপানিজসহ দেশের জয়নুল আবেদিন, রবীন্দ্রনাথের ছবি ছাপা হতো। এসব দেখেও ছবির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তবে এটা বলা কঠিন, কীভাবে মাথায় ঢোকে যে ছবি আঁকতে হবে। বাবা চাইতেন আর্ট কলেজে পড়ানোর জন্য আমাকে কলকাতা না হয় বিলেতে পাঠিয়ে দেবেন। আমার চাইতে বাবার আগ্রহ ছিল বেশি, যেন আমি আর্ট কলেজে পড়ি। এভাবেই একসময় হয়ত মাথায় ঢুকে যায় যে, আমাকে আর্ট কলেজে পড়তে হবে। পরে জানলাম ঢাকায় একটি আর্ট কলেজ আছে যেটা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এবং কামরুল হাসান বানিয়েছেন। এরপর ম্যাট্রিক পাস করে আমি আর্ট কলেজে ভর্তি হই।

আপনি তো শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানÑ এদের সরাসরি ছাত্র ছিলেন।

রফিকুন নবী : শুধু জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান নন, শফিউদ্দীন আহমেদ, মোস্তফা মনোয়ার, রশিদ চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাকসহ বাংলাদেশের আরো যারা খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী আছেন তাদের সরাসরি ছাত্র আমি। আমার সৌভাগ্য যে, আমি তাদের প্রত্যেকের সাহচার্যে আসতে পেরেছি। আর্ট কলেজে ভর্তির আগে আমি ভাবতাম ওখানে গেলে মনে হয় শুধু ছবি আঁকা হবে। পরে দেখি অত্যন্ত কঠিন একটা লেখাপড়া। সেটা ছিল ভিন্ন এক জগত। আমাদের শিক্ষকরা আমাদের তো শেখাতেনই, সেই সঙ্গে নিজেদের কাজ নিয়েও ব্যস্ত থাকতেন। তখন পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা ছিল। দেখতাম, যত ধরনের জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী হতো আমাদের দেশের শিল্পীরাই অগ্রণী ভূমিকা রাখতেন। আমাদের আর্ট কলেজের পড়াশোনা অনেক কঠিন, কিছুটা বোরিং ছিল। স্যাররা এটা ইচ্ছে করেই করতেন। তারা চাইতেন যারা এটা সহ্য করতে পারবে না তারা যেন চলে যায়। আমরা ৪৯ জন ভর্তি হয়েছিলাম। পরে সেটা ৩১ জনে পৌঁছে। আমাদের শিক্ষকরা একেকজন একেক স্টাইলে কাজ করতেন, একেকজন একেকভাবে পড়াতেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এক রকম, কামরুল হাসান আরেক রকম। আমরা প্রত্যেকের স্টাইল অনুসরণের চেষ্টা করতাম। এভাবে সবার কাজ দেখতে দেখতে, কিংবা শুনতে শুনতে নিজের একটা স্টাইল তৈরি হয়।

শিল্পী এস এম সুলতানের কাজ কিছুটা ব্যতিক্রমী ঘরানার?

রফিকুন নবী : তিনিও নিজের স্টাইলেই কাজ করেছেন। গ্রাম-বাংলা তথা তার এলাকা নড়াইলের যে জীবন, কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষÑ এগুলো ছিল তার মূল বিষয়বস্তু। এসব বিষয় যে অন্য শিল্পীদের মধ্যে ছিল না তা নয়, কিন্তু এস এম সুলতান তার নিজস্ব স্টাইলে কাজ করেছেন। আমি তার একজন ভক্ত। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না। তারপরও আমার অনেক কাছের ছিলেন। চমৎকার কথা বলতেন, অনেক জানতেন। ছবি সম্পর্কে বা পাশ্চাত্যে কী হচ্ছেÑ এসব নিয়ে তার খুব ভালো পড়াশোনা ছিল। কিছু বরেণ্য শিল্পী আছেন যারা আমাদের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন আর অন্যরা ছিলেন যাদের কাজ দেখে, কথা শুনে আমরা আরো সমৃদ্ধ হতাম। সেই হিসেবে আমি এস এম সুলতানের একজন ভাবশিষ্য।

আপনার অনন্য সৃষ্টি টোকাই। জনপ্রিয় এই চরিত্রের নামকরণ নিয়ে অনেক সমালোচনাও হয়েছে। অনেকে নামটির মধ্যে অবজ্ঞা আছে বলে মনে করেন।

রফিকুন নবী : এটি ছিল একটি পজিটিভ চরিত্র। পরিবার ছাড়া একটি ছোট বাচ্চা, পথে-ঘাটে সারাদিন থাকেÑ এই চরিত্রটি সেখান থেকে তুলে আনা। সে কোনো খারাপ ছেলে নয়। পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে তা নিয়ে সে অবলীলায় মন্তব্য করে ফেলে। সেটা ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন। দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতিÑ যে বিষয়েই প্রশ্ন করা হোক না কেন সে উত্তর দেয়। ১৯৭৮ সালে প্রথম যেদিন এই নিষ্পাপ চরিত্রটি বিচিত্রায় প্রকাশিত হলো, পরের সপ্তাহ থেকে চিঠি আসা শুরু হলো। আমি সে রকম সিরিয়াসলি ভাবিনি। ভেবেছিলাম, দেখি একটা কার্টুন করে। যদি ভালো হয় বা কাজটাতে আনন্দ পাই তাহলে করব। কারণ আমার আসল কাজ তো কার্টুন আঁকা নয়। এর আগে কিন্তু আমি এই চরিত্রটি নাম না দিয়ে শুরু করেছিলাম। কিন্তু নাম দিয়ে যখন শুরু করলাম ব্যাপক সাড়া পেলাম। তারপর হেলাফেলা করে নয়। বেশ সিরিয়াসলি আমাদের চারপাশের জীবন, সাংস্কৃতিক অবস্থা, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, দুর্নীতি, অনিয়ম এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলতাম। পরবর্তীতে চরিত্রটি এতই জনপ্রিয় হয়ে গেল যে, অনেকে তার শিশুর নাম আদর করে ডাকতে শুরু করল টোকাই বলে। দোকানে যেসব ছেলেকে কাজে রাখা হয় তাদেরও সবাই টোকাই ডাকা শুরু করল। এমনকি কোনো একটি গ্রুপের টপ সন্ত্রাসীর নামও দেখা গেল টোকাই। আস্তে আস্তে দেখলাম, নামটি মানুষ খারাপভাবে ব্যবহার শুরু করল। ভালো করতে গিয়ে খারাপ হয়ে যাচ্ছে কি নাÑ এ ব্যাপারে আমি, আমার সম্পাদক সতর্ক থাকতাম। তবে আমার মনে হয়, চরিত্রটি যদি নেগেটিভ হতো তাহলে এত জনপ্রিয় হতো না।

শিল্পীদের আঁকা ছবিতে লোকজ উপাদানের উপস্থিতি ইদানিং কমে আসছে, আপনি মনে করেন?

রফিকুন নবী : লোকজ শিল্পের উৎস গ্রামাঞ্চল। আগে বংশ পরম্পরায় শিল্পীরা এটা অনুসরণ করত। এগুলো অনেকটা মুখস্থ বিদ্যার মতো। স্টাইলও ছিল সহজ-সরল। কারণ মানুষগুলোও তখন সহজ-সরল ছিল। তাদের সহজ ভাবনা থেকেই ছবি আঁকত। তখনকার শিল্পীদের এত শিক্ষাদীক্ষা ছিল না। আর এখনকার শিল্পীরা অনেক ইতিহাস জানছে। ছবির ইতিহাস জানতে গিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন সময়, যুগের ইতিহাসও জানছে। পাশ্চাত্য দেশ, ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, চীনে কী হচ্ছে তা-ও জানছে। ছবি নিয়ে বিশ্বের কোথায় কী হচ্ছেÑ সব খবরই তারা রাখছে। এত কিছু জানার পর শিল্পীরা নিজে প্র্যাকটিস করছে। তাই তারা কোনটা ভুল, কোনটা শুদ্ধÑ এটা চিন্তা করছে। কারণ শিল্পীরা অনুভূতি থেকেই সব কিছু করছে। আর যে বংশ পরম্পরায় করে আসছে তার মধ্যে এটা নেই। যেমনÑ গ্রামের একজন নারী সরাতে পাখি আঁকছে। সেটা তার সৃষ্ট পাখি। এটা কী পাখি সেটা নিয়ে তার চিন্তা নেই। তার ভালো লাগার বোধ থেকে সে এটা করছে। সে হিসেবে তাদের অনুভূতিটা একদম নিখাদ। এখন ওই নিখাদ শিল্পটিও আমাদের ভালো লাগে আবার আধুনিক যে চিত্রকলা সেটাও ভালো লাগে। ভালো লাগার পেছনে শিল্পীদের যে বোধটা কাজ করে সেটা যার যার মতো করে। এটি অদ্ভুত ধরনের এক ভালো লাগা। যার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

শিল্পীদের আঁকা ছবি এখন অনেকটাই অভিজাত পণ্যে পরিণত হয়েছে। শিল্পের সঙ্গে সমাজের যে দূরত্ব সেটা কীভাবে কমানো যায়?

রফিকুন নবী : এটি এখন একটি স্ট্যাটাসের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা দেশ-বিদেশ ঘুরছে। ঘোরাঘুরির কারণে মানুষ আজকাল অনেক কিছু দেখছে। শিখছেও। যারা সংগ্রাহক তাদের এক ধরনের টেস্ট তৈরি হয় ছবি সংগ্রহের ব্যাপারে। তারা তখন বিদেশে গেলেও ছবি সংগ্রহ করে, কেনে। এই গ্রুপ দেশের জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে বিশ্বের বিখ্যাত সব শিল্পীর ছবি সংগ্রহ করে। আরেক দল আছে যাদের ছবি দেখতে ভালো লাগে, কিন্তু সংগ্রহ করা সাধ্যে কুলায় না। অনেক সময় হয়ত শিল্পী কোনো বন্ধুর মাধ্যমে তারা পছন্দের ছবি পেয়েও যায়। কিন্তু তারা বড় সংগ্রাহক হতে চায় না। আবার এমনও অনেকে আছে যারা হয়ত বলতে পছন্দ করে আমার কাছে এতগুলো জয়নুল আবেদিনের ছবি আছে। সে মনে করে, এটা তার স্ট্যাটাস বাড়ায়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এখন এত বড় বড় ফ্ল্যাট হচ্ছে সেসব ঘর-বাড়ি সাজাতেও ছবির প্রয়োজন হচ্ছে। যিনি ফ্ল্যাট কিনছেন তিনি হয়তো ভাবছেন অমুকের বাড়ির ড্রইংরুমে একজন শিল্পীর আঁকা ছবি দেখেছিলাম সেটা তার ফ্ল্যাটে থাকলেও বাড়ির শোভা বাড়াবে। এটা মনে করে তিনি হয়ত ছবি কিনছেন ঘর সাজানোর জন্য। ছবির সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব এই কথা রেনেসাঁ যুগ থেকেই চলছে। কারণ এটা তো ঠিক, সবাই ছবি বুঝতে পারে না। যেমনÑ ক্লাসিক্যাল গান সবাই বোঝে না। কিন্তু শুনতে শুনতেই কান তৈরি হয়। তেমনি ছবিও দেখতে দেখতে চোখ তৈরি হয়।

এখনকার শিল্পীরা যে নিউ মিডিয়া কনসেপ্টে ছবি আঁকছে। এটা আপনাদের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়?

রফিকুন নবী : শিল্পকে আসলে নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা দিয়ে আবদ্ধ করা যায় না। ভালো লাগলেই ভালো। ভালো লাগাতে পারলেই ভালো। এটা শিল্পী নিজের মতো করে করে। সবসময় যে ক্যানভাসে আঁকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। শিল্পী নতুন কোনো মাধ্যম ব্যবহার করেও তার বক্তব্য বলার চেষ্টা করতে পারে।

আপনার জীবনবোধ....

রফিকুন নবী : ছেলেবেলায় একরকম জীবন দেখেছি। টানাপড়েনের সংসার। সেই জায়গা থেকে একজন শিল্পী হয়ে ওঠা বেশ কঠিনই ছিল। কারণ আর্ট কলেজে পড়ে চাকরি পাব কি না, কোনো বাণিজ্যিক কাজ করতে পারব কি নাÑ এসবের নিশ্চয়তা ছিল না। এসব অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে আমার শিল্পী হয়ে ওঠা। তাই জীবনবোধ বলতে আমি বুঝি কোনোমতে বেঁচেবর্তে থাকা। সেই সঙ্গে নিজের কাজটা চালিয়ে যাওয়া। আর এই সমাজ, সংসারে যা কিছু ভালো তা গ্রহণ করার মানসিকতা যদি কারো থাকে সেটা দিয়েই সে ভালো একটা অবস্থানে পৌঁছতে পারবে। হতাশ হলে চলবে না।

আপনার জীবনে প্রেম ....

রফিকুন নবী : আমাদের সময়ে মেয়েরা বেশ অন্তরীণই থাকত। তারপরও যে কেউ প্রেম করেনি তা নয়। প্রেম তো চিরন্তন। তবে আমার জীবনটা এত ব্যস্ততা, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গেছে যে, সেভাবে প্রেম করা হয়ে ওঠেনি। তবে শিল্পী, লেখক-সৃজনশীল সব মানুষের জীবনে রোমান্টিক কিছু বিষয় মানে ভালো লাগা, না বলা কথাÑ এসব তো থাকেই।...সেসব গোপন জিনিস গোপন থাকাই ভালো। ....আর আমি এগারো ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলাম। আমার ওপর সাংসারিক অনেক দায়িত্বও ছিল। সুতরাং প্রেম নিয়ে মাতামাতি করার সময় আমার ছিল না।

বিয়ে এবং ছেলেমেয়ে...

রফিকুন নবী : আমাদের বিয়েটা পারিবারিক। দুই ছেলে আর এক মেয়ের সংসার আমাদের।

’৭১-এর স্মৃতি...

রফিকুন নবী : আমি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেইনি। যুদ্ধ শুরুর আগে যত আন্দোলন হয়েছে সব জায়গাতেই যুক্ত থেকেছি। যখন যুদ্ধে যাব যাব করছি তখন বন্ধুরা বলল, সবাই চলে এলে তো হবে না। ঢাকায় কারো কারো থাকতে হবে। পরে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা কয়েকজন ঢাকায় থেকে গেলাম। যারা সরাসরি সম্মুখ সমরে ছিল, গেরিলা অ্যাকশনে ছিল যখন তারা ঢাকায় আসত তখন তাদের জামাকাপড়, আশ্রয়, টাকা-পয়সা, ওষুধপত্রের ব্যবস্থা আমরা করতাম। অনেক কঠিন আর ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কাজগুলো।

দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

রফিকুন নবী : অবাক এবং মন খারাপ লাগে এটা ভেবে যে, কী এমন ঘটে, কী এমন তাদের চোখের সামনে দেখানো হয়, কেমন করে কী তাদের মাথায় ঢোকায় যে, এত ভালো ভালো পরিবার, ভালো লেখাপড়া জানা ছেলেরা আত্মঘাতী কাজে ঢুকে যাচ্ছে। তারা নিজেরা তো ধ্বংস হচ্ছেই, সেই সঙ্গে নিরস্ত্র বিপন্ন মানুষের জীবন শেষ করে দিচ্ছে। এভাবে জীবন শেষ করে দেওয়ার তো তাদের কোনো অধিকার নেই। তরুণ প্রজন্মকে বলছিÑতোমরা দেশকে ভালোবাস, দেশের মানুষকে ভালোবাস। তোমাদের শিক্ষাদীক্ষা দেশের মানুষের স্বার্থে ব্যবহার কর।

নিজের বিষয়ে আপনার নিজের মূল্যায়ন যদি শুনতে চাই

রফিকুন নবী : আমার তো মনে হয় না আমি এত বড় কিছু। তারপরও যেটুকু হতে পেরেছি তা হলো নিজের কাজের প্রতি সবসময় নিষ্ঠা ছিল। জীবনে দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ সবকিছু থাকবে। আত্মপ্রসাদে হারিয়ে গেলে চলবে না। নাম হচ্ছে কি হচ্ছে নাÑতা দিয়ে কিছু যায় আসে না। কাজ হচ্ছে কি না সেটাই বিষয়।

ছবি : রাজীব জবরজং

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ছবি,মানুষের দূরত্ব,রেনেসাঁ যুগ,রফিকুন নবী
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist