রিহাব মাহমুদ

  ০১ জানুয়ারি, ২০২১

গল্প

​কইন্যার নাম কী জানি না

চোখের পাপড়ি একবারও পড়েনি তার। অপলক তাকিয়ে আছে সেই থেকে। ভালো করে খেয়াল করতেই বিষয়টা বোঝা গেল। দৃষ্টি তার ভাবলেশহীন। কোথায় যেন এক শূন্যতা ভর করেছে তাকে। আমি বিস্মিত হলাম এই ভেবে, অনেকক্ষণ ধরে দেখছি সে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো কোনো কারণ নেই, আবার থাকতেও পারে। যা আমি জানি না। অস্বস্তিবোধ করলাম কিছুটা। 

তুমি আমার আশপাশে ঘোরাঘুরি করছো। কিন্তু কেন? এই কথায় সচকিত হলো সে। স্পষ্ট দেখলাম, চোখের পাপড়ি পড়ল তার। আমার সারা শরীরে বিদ্যুৎ চমকাল। এমন অনুভূতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। 

তার দৃষ্টি নত হলো। একদম নিচে। দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালাম। পায়ের আঙুল দিয়ে বালু খুঁটছে। তাও কতটা যত্ন নিয়ে। স্নায়বিক চাপ অনুভব করলাম। এত সুন্দর দেখতে পা কারো হতে পারে? খালি পা, বাম পায়ে সিলভার কালারের নূপুর। পায়ের রংটা দুধে আলতা মেশানো। পরনে কালো ডিভাইডার-জাতীয় কিছু একটা হবে। তা কি না পায়ের গোছার অনেক ওপরে। অনাবৃত অংশ দিয়ে হাজার পাওয়ারের বিদ্যুতের রশ্মি বের হচ্ছে। সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছি। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস কখন যে থেমে গেছে, খেয়াল করিনি। 

পায়ের আঙুলে বালু খোঁটানো থেমেছে। আমিও সংবিৎ ফিরে পেলাম। তাকালাম তার দিকে। এবারের নজরটা ভিন্ন। খুঁটিয়ে পরখ করা। গায়ে আকাশি রঙের একটা জামা। কিন্তু কোনো ওড়না নেই। বুকের গড়নও চোখ ধাঁধানো। সুউচ্চ না। যে কারো চোখ আটকে যাবে। গলা ও ঘাড়ের রঙের সঙ্গে পায়ের রঙের যথেষ্ট মিল। মুখের রঙে কিছুটা ভিন্নতা। হয়তো রোদে পোড়া তাই। বয়স আনুমানিক ১৪। কমও হতে পারে অথবা তারও বেশি। চেহারায় যে লাবণ্য ফুটে আছে, তাতে এই মেয়ের এখানে থাকার কথা না। হাতকাটা জামা। বাহুতে আঁটসাঁট হয়ে আছে। তাতেই আগত যৌবনের হাতছানি। এতক্ষণে লক্ষ করলাম, তার বাম হাতে কয়েকটা ঝিনুকের মালা। সে এই মালা বিক্রি করে তা বোঝা গেল। আমার আশপাশ ঘোরার কারণও স্পষ্ট হলো। 


চোখ ফেরাতে পারছি না। সে চলে গেছে অনেক দূরে। সাগরের দিকে। তার ছুটে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছে, সাগরে ঝাঁপ দেবে। হঠাৎ একটা শঙ্কা বুকে এসে বিঁধল...


কক্সবাজার সি-বিচের শৈবাল পয়েন্টে বিচ চেয়ারে বসেছিলাম। সময়টা দুপুর। আশপাশে তেমন লোকজন নেই। যারা আছে তারা কিছুটা দূরে। এ সময়ে তাকে আমার কাছে পরীর মতো মনে হলো। হয়তো সাগরের জল থেকে উঠে এসেছে। তাকে নিয়ে ভাবনায় ডুবে গেলাম। ভালো লাগছে। অনুভব করলাম, তার সঙ্গটা খারাপ লাগছে না। যদিওবা এটাকে সঙ্গ বলা যায় না। আমার কাছ থেকে তার দূরত্ব পাঁচ হাত হবে। তাতেও মনে হলো, তার শরীরের ঘ্রাণটা আমার নাকে এসে লাগছে। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা ঘ্রাণ, যা আগে কোনোদিন পাইনি। 

কত করে? তার হাতের ঝিনুকের মালার দাম জিজ্ঞেস করতেই সে দুই পা এগিয়ে এলো। একটা মালা বাড়িয়ে ধরল। 
২০ টাকা। জবাব দিল সে। 
এতক্ষণে তার গলা শুনলাম। কিশোরী গলা। 
আমি মানিব্যাগ বের করে ১০০ টাকার নোট তার দিকে বাড়িয়ে ধরলাম। 
কটা দেব? 
দুটো দাও। 
ভাংতি নাই। ৪০ টাকা ভাংতি দেন। 
আমার কাছেও কোনো ভাংতি নেই। তাই বললাম, ফেরত দিতে হবে না। তুমি সবটা রেখে দাও। এবার সে আমার চোখের দিকে তাকাল। আমিও তাকালাম। এতে সে লজ্জা পেল বলে মনে হলো। মাথা নিচু করে বালুতে পায়ের আঙুল খুঁটছে আগের মতো। শরীরটা হালকা দুলছে। এটা মেয়েলি ভঙ্গি। এই সুযোগে আমি আবার তার পায়ের দিকে তাকালাম। কেন জানি চোখ ফেরাতে ইচ্ছা করছে না। আমি তাকিয়ে থাকলাম। তার পা দুটো সুন্দর। মোহাবিষ্টের মতো তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর স্থির হলো তার পা। এবার চোখ তুলে তাকালাম তার দিকে। সে তাকিয়ে ছিল। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখা। এই হাসিটাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমি হারিয়ে ফেললাম। শরীরে কিঞ্চিৎ কাঁপুনি টের পাচ্ছি। 
অমনি সে এগিয়ে এসে দুটো মালা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল, নেন। 
মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার হাত থেকে মালা নিয়ে টাকাটা বাড়িয়ে ধরতেই সে ছোঁ মেরে নিয়ে এক দৌড় দিল। বিস্মিত চোখে তার চলে যাওয়া দেখছি। উত্তপ্ত বালুতে সে দৌড়াচ্ছে। অবিরাম। যেন ভয় পেয়েছে। আমি কি তাকে ভয় পাওয়ার মতো কিছু করেছি? সে আমার চোখে কোনো ইঙ্গিত খুঁজে পেয়েছে? যা একটি মেয়ের জন্য ভয়ংকর? 

চোখ ফেরাতে পারছি না। সে চলে গেছে অনেক দূরে। সাগরের দিকে। তার ছুটে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছে, সাগরে ঝাঁপ দেবে। হঠাৎ একটা শঙ্কা বুকে এসে বিঁধল। কখন যে উঠে দাঁড়িয়েছি খেয়াল নেই। ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে তাকে থামাই। গলা দিয়ে একটা আর্তনাদের মতো বের হলো। আমার অবচেতন মন তাকে ডাকছে। কিন্তু কোনো ডাক খুঁজে পাচ্ছে না। কারণ তার নাম কী আমি জানি না। সে এখন অনেক দূরে। যেখানে আরো অনেক লোকজনের ভিড়। তাদের ভিড়ে তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। 

আমার বুকটা হু-হু করে উঠল। সামনে বিশাল সমুদ্র। সাগরের ঢেউয়ের গর্জন আমার ভেতরের চাপা আর্তনাদকে বাড়তে দিচ্ছে না। হার মানলাম। কিছু সময়ের জন্য হয়তো স্বপ্নে ডুবে ছিলাম। হাতে এখনো তার দেওয়া মালা। যেখানে তার স্পর্শ লেগে আছে। অজান্তে নাকের কাছে ধরলাম। গন্ধ শুঁকলাম। মনে হলো, তার শরীরের গন্ধ মালায় লেগে আছে। 

 

লেখক : সাংবাদিক ও নাট্যকার
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল

গল্প,​কইন্যার নাম কী জানি না,রিহাব মাহমুদ,কিশোরী
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়