সোহেল মাজহার

  ০৩ ডিসেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক রচনা- ১২

উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু

বং থেকে বাংলা : রিজিয়া রহমান বং থেকে বাংলা উপন্যাসে নৃতাত্ত্বিক মিথস্ক্রিয়া, বাঙালির জাতিবোধ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুক্তির আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেন।

ইতিহাস ও নৃতত্ত্ববিদরা অনুমান করেন যে, আধুনিক বাংলায় খ্রিস্টের জন্মেরও ৩ হাজার বছর পূর্ব থেকেই মনুষ্য বসতি ছিল। নৃতাত্ত্বিকভাবে তারা ছিল অষ্ট্রিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের এক শাখা স্থলের অধিবাসী আর এক শাখা ছিল জলচারী বা বেদে। একই সময় ভারতের অন্য অংশে দ্রাবিড় জাতিগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। মৌর্য যুগেরও আগে উত্তরাপথ অর্থাৎ ভারতের উত্তরাঞ্চল দিয়ে আর্য জাতি ভারতে আগ্রাসন চালায়। তাদের আক্রমণে দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী ক্রমান্বয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এ প্রসঙ্গে লেখক ভূমিকায় উল্লেখ করেন- ‘আর্যরা উত্তর ভারতে প্রবেশ তাদের সংঘাতে পরাজিত হতে হতে দ্রাবিড় জাতি ক্রমশ দক্ষিণ পর্বত সংকুল অঞ্চলে সরে আসে। দ্রাবিড়দেরই একটি শাখা চলে আসে সমতটে। এই দ্রাবিড় গোত্রটিকে বং গোত্র বলে অনুমান করা হয়। অনেকে মনে করেন, দ্রাবিড় বং গোত্রের নাম থেকেই ‘বংগ’ বংগদেশ ও বংআল নামের উৎপত্তি।’

উপন্যাসে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে ৪৭-এর দেশভাগের কথা উঠে আসে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা প্রবাহের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত মূর্ত হয়। এ অধ্যায়ে তিনটি প্রজন্মের উপস্থিতি দেখা যায়। সাবের প্রথম প্রজন্ম সাহেবের ছেলে আনোয়ারের সঙ্গে ইসলাম সাহেবের মেয়ের বিয়ের সম্পর্ক সূত্রে তারা আবদ্ধ হয়। সাবের ও তার ছেলে আনোয়ার রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তাদের পরবর্তী প্রজন্ম মিন্টু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী। অসহযোগ আন্দোলনের ছবি ফুটে ওঠে এভাবে- ‘ঢাকায় উত্তেজনা উত্তাল ভরা উনিশ’শ একাত্তরের মার্চ। আনোয়ার খবরের কাগজ পড়তে পড়তে উৎকীর্ণ হলো। নীলক্ষেতের ছায়াচ্ছন্ন নিরিবিলি পথ আবার স্লোগানের গর্জনে থরথর। জমিলা বারান্দা থেকে সরে এলো। বলল, এ মাসটা যেন মিছিলের মাস। এদিকে তোমরা আবার অসহযোগ করে ঘরে বসে রইল। কি যে হবে কিছুই বুঝতে পারছি না।’

আখ্যানে ২৫ মার্চের পাকিস্তান বাহিনীর ক্র্যাকডাউন, ২৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা, বলেন- ‘সাতাশে মার্চ সকালে ট্রানজিস্টর রেডিও খুলে শুনল প্রতিবাদের কণ্ঠ। যেন কণ্ঠ। যেন কণ্ঠ নয় বিদ্রোহে প্রদীপ্ত আশায় ভাস্বর এক বাণী। অন্ধকার অমানিশায় আলোর দিশা। ‘আমি মেজর জিয়া, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’ পাকিস্তান বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন ধ্বংসযজ্ঞ, স্বাধীনতাবিরোধীদের তৎপরতার বিপরীতে মুক্তিকামী মানুষের গেরিলা যুদ্ধের কথা উঠে এসেছে। মিন্টুর একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি দেখা যায় উপন্যাসে। তার সঙ্গে জমিলার প্রেমময় মানসিক সম্পর্ক স্থাপন করে উপন্যাসে একটি মানবিক দ্যোতনা সৃষ্টি হয়। বাংলা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম জনজাতি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

বং থেকে বাংলায় লেখক বাঙালি জনজাতির ৫০০০ বছরের ইতিহাসকে ধারণ করেছেন। বাংলা ভাষার আর কোনো আখ্যানে বাঙালি জনজাতির ধারাবাহিক ইতিহাসের উদাহরণ নেই। তার অর্থ এই নয় যে, তিনি আখ্যান রচনা করেননি, ইতিহাস রচনা করেছেন। তিনি ইতিহাসের দায় পূরণের সঙ্গে সঙ্গে একটি সামগ্রিক মানবিক জাতিগত আখ্যানের ভেতর পরিভ্রমণ করেছেন। তার ভাষার একটি গতিশীল প্রবাহের ভেতর পাঠক স্বচ্ছন্দে নিজেকে যুক্ত করতে পারে। আস্বাদন করতে পারে ভাষার রূপ-রস, সৌকর্য। অবশ্য এ কথাও সত্য, উপন্যাসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অনুপস্থিতি উপন্যাসের মহিমাকে কিছু হলেও ক্ষুণœ করেছে। সব মিলিয়ে বাঙালি জাতি কীভাবে আদিম সাম্যবাদ, সামন্ত যুগ, কৃষক বিদ্রোহ, মধ্যযুগ ঔপনিবেশিক শাসন এবং পাকিস্তান শোষণ-নির্যাতন অতিক্রম করে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ও জাতি পরিচয়ের সর্বজনীন স্বীকৃতি অর্জন করেন, তার ক্রম ইতিহাস।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close