নিজস্ব প্রতিবেদক

  ২৭ এপ্রিল, ২০২৩

বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী জাপান

জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী দেশ। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ৫০ বছর আগে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রদান করে আসছে। করোনার মধ্যেও জাপান বাংলাদেশে মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া জাপান বাংলাদেশকে যে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়, সে সুদের টাকাও পরে জাইকার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে এ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। ফলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্মুক্ত ও বাণিজ্যমুখী অর্থনীতি হওয়ায় ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে একটি প্রতিশ্রুতিশীল এবং লাভজনক ব্যবসায়িক গন্তব্য হয়ে উঠছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৩২৪টি জাপানি কোম্পানির ব্যবসা রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব কোম্পানির বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৫ কোটি ৭৯ লাখ ডলার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে পিছিয়ে থাকলেও জাপানি বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে বাংলাদেশ। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক হাজার একর জমির ওপর গড়ে উঠছে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল। সেখানে কারখানা স্থাপনে চারটি বিদেশি কোম্পানি চুক্তি করেছে। এছাড়া জাপানের ৩০টিসহ ৪০টি কোম্পানি বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে।

দেশের ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জাপানি কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই চীনের বাইরে বিকল্প দেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে ভিয়েতনাম ও ভারতে বিনিয়োগ করছে তারা। এই তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্যয় কম হওয়ায় এবং বিশেষায়িত খাতে কর সুবিধা, অভ্যন্তরীণ বাজার ও আঞ্চলিক বাজারে পণ্য রপ্তানির সুযোগ থাকায় জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। এছাড়া জাপানের বাজারেও বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ভালো সম্ভাবনা আছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সাফল্য জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

জানা যায়, ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি টোকিও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে। জাপান ১৯৭২ সাল থেকে সে দেশের সরকারি উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নে উদারভাবে অবদান রেখেছে এবং শীর্ষস্থানীয় দ্বিপক্ষীয় দাতা হতে নাম লিখিয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও বঙ্গোপসাগরীয় সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে জাপানের কাছে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত কূটনীতিতে ভূমিকা রাখছে। এর সুবিধাও এসে ধরা দিচ্ছে। সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের নীতিই ঢাকাকে এ সুবিধা এনে দিয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, দিনকে দিন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ছে। সামনের দিনগুলোয় আরো বাড়বে। এ ক্ষেত্রে হাতছানি দেওয়া সুবিধা পেতে আমাদের কূটনৈতিক দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা এমন হতে হবে, যেখানে যার সঙ্গে কাজ করলে আমাদের সুবিধা হবে, যাদের বিনিয়োগ আমাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আমরা তাদের সঙ্গেই কাজ করব।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, জাপান বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী হচ্ছে জাপান। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১০০টি স্পেশাল ইকোনমিক জোন গড়ে তোলার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এছাড়া অনেকগুলোর কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। জাপানও এখানে বিনিয়োগ করছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করবে, তখন বিভিন্ন দেশ থেকে বাণিজ্য সুবিধা পেতে পিটিএ বা এফটিএ এর মতো বাণিজ্য চুক্তি করার জন্য আমরা কাজ করছি। তখন বাংলাদেশকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জাপানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও দক্ষ নেগোসিয়েশনের সুবিধার্থে একটি জয়েন্ট স্টার্ডি গ্রুপ কাজ করার জন্য প্রস্তুত।

জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি বলেন, কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কক্সবাজার-চট্টগ্রাম সড়ক সম্প্রসারণের কাজ করে যাচ্ছে জাপান। এছাড়া জাপান বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে ঢাকা মেট্রোরেল, ঢাকা বিমানবন্দরের টার্মিনাল নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকির মতে, বাংলাদেশ জাপান থেকে সবচেয়ে বেশি ওডিএ পায়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ এবং জাপান একটি ব্যাপক অংশীদারত্ব শুরু করে, যার ফলে আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি পায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে জাপান বাংলাদেশকে ২ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন সাহায্য দিয়েছে যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে, জাপান আনুমানিক ২৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারের অনুদান ও ঋণ দিয়েছে। জাপান বাংলাদেশকে এনার্জি ও পাওয়ার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অবকাঠামোর উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করে। গ্যাস ও কয়লা, ব্লু ইকোনমি, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো খাতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারিত হচ্ছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়