আরমান ভূঁইয়া
হাতের কাছেই নেশার ওষুধ

দুই সন্তান আর স্ত্রীর মুখে একটু হাসি ফোটাতে ছয় বছর আগে ঢাকা পাড়ি দেন যশোরের শামীম হোসেন। অনেক কাজের খোঁজাখুঁজির পর রাজধানীতে দৈনিক ভাড়ায় রিকশা চালাতে শুরু করেন। মোহাম্মদপুর এলাকার বেড়িবাঁধে একটি কামরা ভাড়া নিয়ে তারা চারজন গাদাগাদি করে থাকেন। সবকিছু ভালোভাবেই চলছিল। হঠাৎ এক দিন শামীম কৌতূহলে ঢুকে পড়েন নেশার জগতে। সেই থেকে এই নেশাই এখন তার সর্বনাশ। রিকশাচালক শামীমের শুরুটা ইয়াবা দিয়ে। এরপর দুই বছর ধরে নিয়মিত ব্যথানাশক ট্যাবলেট দিয়ে নেশা চালিয়ে যাচ্ছেন। অতিমাত্রার সেবনে ধীরে ধীরে কর্মশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। অসুস্থতার কারণে দুই সপ্তাহ ধরে রিকশা চালাতে পারছে না তিনি। আর এখন বাড়ি থেকে টাকা এনে চলছে তার চিকিৎসা।
শুধু শামীম নয়! তার মতো অনেকেই নিষিদ্ধ এসব ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে নেশা করছে। এতে কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লিভার-ক্যানসারসহ শরীরিরের বিভিন্ন অঙ্গপতঙ্গ নষ্ট হচ্ছে। এসব ওষুধ সেবনকারী বলছে, ইয়াবা-হেরোইনসহ নানা মাদকে আসক্তরা বিভিন্ন ওষুধ দিয়ে মাদক সেবন করছে। বিশেষ করে তুলনামূলক দাম কম হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মাদকাসক্তরা মহল্লার ফার্মেসি থেকে যখন-তখন কিনছে এসব ওষুধ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক যুবক বলেন, ‘আমি নিয়মিত ইয়াবা সেবন করি। কয়েক বছর আগে হঠাৎ ইয়াবা পাচ্ছিলাম না। তখন আমার এক বন্ধু দুটি ব্যথানাশক ট্যাবলেটের সাজেস্ট করে। এরপর থেকে আমি প্রায় সময় এগুলো ব্যবহার করি।’
মাদক সেবনে ব্যথানাশক ট্যাবলেটের (জনসার্থে ওষুধের নাম উল্লেখ করা হয়নি) ব্যবহার খুব বেশিদিন না হলেও সময়ের ব্যবধানে নিম্ন আয়ের মাদকাসক্তের মধ্যে এর চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। হিরোইন বা ইয়াবার মতো করেই পুড়িয়ে মাদকদ্রব্য হিসেবে ব্যবহার করছে মাদকাসক্তরা। তুলনামূলক কম দামে পাওয়ায় এসব ট্যাবলেটের ব্যবহার বাড়ছে।
গত দুই বছর আগে দেশের কয়েকটি ব্যথানাশক ট্যাবলেটে ইয়াবা ও হিরোইনের উপাদান পাওয়া যায়। নেশা হিসেবে এসব ওষুধের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ২০২০ সালে তা নিষিদ্ধ করে ঔষধ প্রশাসন। এরপর থেকে ওইসব ওষুধ দেশীয়ভাবে উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ এবং এটি ‘খ’ শ্রেণির মাদকে তালিকাভুক্ত করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল চন্দ্র সাহা বলেন, ব্যথানাশক কয়েকটি ট্যাবলেটে মাদকদ্রব্যের উপাদান পাওয়া যাওয়ায় ২০২০ সালে এসব ট্যাবলেটকে নিষিদ্ধ ও ‘খ’ শ্রেণির মাদকে তালিকাভুক্ত করা হয়। মূলত মাদকসেবীরা চাহিদামতো মাদকদ্রব্য না পাওয়ায় বিকল্প হিসেবে এসব ওষুধ ব্যবহার করছে। এসব ব্যবহারে কিডনি, লিভার, হার্ডের সমস্যাসহ মানবদেহে নানা রোগের সৃষ্টি হতে পারে। ফলে মাদকসেবীরা দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঝুঁকতে থাকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, ব্যথানাশক এসব ট্যাবলেটের অধিক চাহিচা থাকায় বন্ধ করা যাচ্ছে না। ইয়াবা ও হিরোইনের চেয়ে দামে কম হওয়ায় মাদক বেসনকারীদের মধ্যে চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মাদকসেবকরা বেশি ব্যবহার করছে এসব নিধিদ্ধ ওষুধ। শহরের পাশাপাশি দেশে বিভিন্ন জেলাগুলোতেও এর চাহিদা বেড়েছে বহু গুণ।
গত কয়েক দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসি ও মাদক সেবনকারীদের সঙ্গে কথা হয় প্রতিদিনের সংবাদের। দেখা যায়, এসব ট্যাবলেট বিক্রির ফার্মেসিগুলোর নির্দিষ্ট ক্রেতা রয়েছে। তারা এসে চাইলেই বিক্রেতারা নিষিদ্ধ ওষুধ দিয়ে দেন। সাধারণ কোনো ক্রেতা এসব ওষুধ চাইলে বিক্রেতারা সাধারণত দেন না। শুধু তাদের নির্দিষ্ট ক্রেতাদের কাছেই বিক্রি করা হয়। ব্যথানাশক এসব ট্যাবলেট নিষিদ্ধ হওয়ার আগে এর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল ১০ থেকে ২০ টাকা। আর এখন এসব ট্যাবলেট ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করছেন দোকানিরা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর কয়েকটি থানা এলাকায় নিষিদ্ধ এসব ওষুধ বেশি পাওয়া যায়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, মিরপুর বেড়িবাঁধ, হাজারীবাগ, মিরপুরের বেশির ভাগ এলাকা, সূত্রাপুর, শনিরআখড়া, তেজগাঁও, আবদুল্লাহপুরসহ অধিকাংশ এলাকাতেই প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে।
মিরপুরের ১৪ নম্বর ভাষানটেক এলাকায় শ্যামল মেডিসিন কর্নার নামে একটি ফার্মেসিতে এ ওষুধ বিক্রি করতে দেখা যায়। জানতে চাইলে দোকানি সোহেল আহমেদ বলেন, মিটফোর্ডকেন্দ্রিক একটি পার্টি আমাদের এই ওষুধ সরবরাহ করে। এটার বেশ চাহিদা থাকায় আমরা রাখি। নিষিদ্ধ ঠিক আছে! তবে, আমরা সবার কাছে বিক্রি করি না। নির্দিষ্ট ক্রেতাদের কাছেই বিক্রি করি।
তাহলে প্রশ্ন উঠেছে, দেশে উৎপাদন বন্ধ থাকলে ফার্মেসিগুলোতে কীভাবে মিলছে এসব ওষুধ? জানা যায়, মাদক হিসেবে সেবন করার জন্য এসব ওষুধের অধিক চাহিদা থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নামমাত্র কয়েকটি কারখানায় তৈরি হচ্ছে নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য (ব্যথানাশক) এসব ট্যাবলেট। আর এর পেছনে রয়েছে রাজধানীর মিটফোর্ড ওষুধের বাজারের একটি চক্র। চক্রটি অধিক লোভে এসব ট্যাবলেট বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসিগুলোতে সাপ্লাই দিচ্ছে।
অন্যদিকে দেশে এসব ওষুধের উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও ভারতে এ ট্যাবলেট বৈধ রয়েছে। ফলে কালোবাজারে অতিরিক্ত মূল্য হওয়ায় ভারত থেকে নিষিদ্ধ এসব ওষুধ সরবরাহ করছে মাদককারবারিরা। এজন্য বর্তমানে বর্ডার এলাকাসহ দেশে বিভিন্ন জেলায় অবাধে মিলছে মাদকসেবনে ব্যবহৃত ব্যথানাশক এসব ওষুধ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় উপপরিচাল রাশেদুজ্জামান বলেন, দেশে এ ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ নিষিদ্ধ থাকলেও ভারতে এসব ট্যাবলেট বিক্রি বৈধ। এজন্য সীমান্ত এলাকায় এসব ট্যাবলেট বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এক শ্রেণির মাদককারবারি কালোবাজারের মাধ্যমে এসব ট্যাবলেট দেশে এনে বেশি দামে বিক্রি করছে। সব ধরনের মাদককাবারির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারি, অভিযান ও গ্রেপ্তার চলমান রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্মকমিশনার মাহবুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, মিটফোর্ডকেন্দ্রিক একটি চক্র আছে যারা বিভিন্ন নিষিদ্ধ ওষুধ নানা মাধ্যমে তৈরি করে সাপ্লাই দিচ্ছে। এ ধরনের চক্রের পেছনে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি চলমান। কয়েক দিন আগেও আমরা একটি চক্র থেকে প্রায় দুই লাখ টাকার নকল ওষুধ জব্দ করছি। শুধু নিষিদ্ধ এসব ব্যথানাশক ট্যাবলেট নয়, দেশ থেকে সব ধরনের মাদকদ্রব্য বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে বলেও জানান পুলিশের একটি কর্মকর্তা।
"







































