জুনায়েদ কবীর , ঠাকুরগাঁও

  ০৪ ডিসেম্বর, ২০২১

মসজিদ ঘিরে আগ্রহ!

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে বালিয়া ইউনিয়নে রয়েছে এক অনিন্দ্য সুন্দর ঐতিহ্যবাহী বালিয়া জামে মসজিদ। এই পুরোনো মসজিদকে ঘিরে মানুষের মাঝে রয়েছে নানা কৌতূহল। স্থানীয়দের মতে, ঠাকুরগাঁওয়ের ছোট বালিয়ার এ মসজিদটি জিনে তৈরি করেছে বলে অনেক মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। আসলে কি এই মসজিদটি জিনের তৈরি না জিনের মসজিদ? চলুন জানা যাক এর আসল রহস্য। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শত বছর ধরে এ মসজিদটি লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল।

১৮০০ সালের শেষের দিকে বালিয়ার জমিদার মেহের বক্স সরকার এ মসজিদটি স্থাপন করেন। তার সম্পর্কে অনেক গল্প এখনো বালিয়া এলাকার মানুষের মুখে প্রচলিত আছে। মেহের বক্স সরকারের স্ত্রী গুলমতি নেছা ব্রিটিশদের কাছে সুষ্ঠুভাবে নিজের জমিদারি কর-ট্যাক্স পৌঁছানোর স্বীকৃতিস্বরূপ চৌধুরানী উপাধি লাভ করেন। সে সূত্রে চৌধুরী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন মেহের বক্স সরকার।

তিনি ১৮ শতকের শেষভাগে বালিয়াতে এক মসজিদ তৈরির পরিকল্পনা করেন। সে লক্ষ্যে দিল্লি থেকে মিস্ত্রি আনা হয়। এ মসজিদ তৈরি ছিল অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ইট তৈরি, চুন-সুরকির কাজ- সব মিলিয়ে এক কঠিন কর্মযজ্ঞ। সেসময় এত ইটের ভাটাও ছিল না। তাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইট তৈরির ব্যবস্থা করা হয়, সেটাও ছিল জটিল প্রক্রিয়া। তবু পুরোদমে কাজ চলছিল মসজিদটির। মসজিদের ছাদ পর্যন্ত নির্মাণ হয়, কিন্তু গম্বুজ নির্মিত হয়নি। এ সময় হঠাৎ করে প্রধান কারিগরের মৃত্যু হয় এবং মসজিদ নির্মাণের কাজ থেমে যায়। পরবর্তীকালে মেহের বক্স সরকার চৌধুরী স্থানীয় মিস্ত্রিদের দিয়ে কাজ শুরু করালেও তারা গম্বুজ নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়। পরে তিনি ১৯০৫ সালে ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পরও তার পরিবারের সদস্যরা চেষ্টা করেছিলেন মসজিদ নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করার, কিন্তু তারাও ব্যর্থ হন। অবশেষে মসজিদের নির্মাণ কাজ শত বছরের জন্য বন্ধ হয়ে যায় এবং স্থাপনা এলাকা জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে ও বাঘ, বানর, সাপ ও পোকামাকড়ের বাসস্থানে পরিণত হয়। এরপর ১৯৮০-র দশকের দিকে, তখন মেহের বক্স সরকার চৌধুরীর পৌত্র (নাতি) রেজওয়ানুল হক ইদু ঢাকা থেকে একজন প্রকৌশলীকে এনে এ মসজিদ সংস্কার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু সে-ই প্রকৌশলী বলেন, এ মসজিদ কোনোভাবেই আর সংস্কার করা সম্ভব না। পরে ইদু চৌধুরী নিজস্ব উদ্যোগে সোনাপাতিলা মসজিদ নির্মাণ করেন।

এরপর ২১ শতকে ছোট বালিয়া এলাকায় মসজিদের প্রয়োজন দেখা দিলে নতুন মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এ নিয়ে বহু তর্ক-বিতর্কের পর অবশেষে সেই পরিত্যক্ত মসজিদ সংস্কার করার সিদ্ধান্ত নেন।

এই মসজিদটি সংস্কারের উদ্যোগ যারা নিয়েছিল তাদের অন্যতম হলো বালিয়া চৌধুরী পরিবারের সন্তানরা, শিল্পী কামরুজ্জামান স্বাধীন, শাহীদ জাকিরুল হক চৌধুরী, মরহুম সাইফুল আলম নুরুজ্জামান চৌধুরী, আনসারুল হক চৌধুরী এবং মসজিদসংলগ্ন বাড়ির কয়েকজন। মসজিদ সংস্কারে প্রথম তিনজন সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে, এর মধ্যে তৃতীয় জন সংস্কারের শুরু থেকে উনার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মসজিদের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি মৃত্যুশয্যায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও মসজিদের খবর নিতেন। তার চিন্তাভাবনাই ছিল মসজিদকেন্দ্রিক। মসজিদ সংস্কারের যত ফান্ড সবই তার নিজ উদ্যোগে কামরুজ্জামান স্বাধীন ও শাহীদ জাকিরুল হক এ দুজনকে সঙ্গে নিয়ে জোগাড় করেছেন। তার অনুরোধেই বালিয়া চৌধুরী পরিবারের সন্তান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক আর্কিটেক্ট সৈয়দ আবু সুফিয়ান কুশল গম্বুজের ডিজাইন সংস্কারের পর মসজিদটি দেখতে কেমন হবে সে ডিজাইন এবং অজুখানার ডিজাইন (যা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি) তৈরি করেন।

এই বৃহত্তম কাজের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা পালন করেন মেহের বক্স সরকার পৌত্র (নাতি) চৌধুরীর সুযোগ্য প্রোপৌত্রি নর্দান তসরিফা গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সেসঙ্গে সফিউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন ও চক্ষু হাসপাতালের চেয়ারম্যান তসরিফা খাতুন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের একদল শিক্ষার্থী সেই মসজিদ পরিদর্শন করে সংস্কার করার ইতিবাচক মনোভাব দেখায়। সে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই এবং কিছু শ্রমিকসহ মসজিদের জঙ্গল-আগাছা পরিষ্কার করেন। এরপর শুরু হয়ে যায় ঐতিহ্যকে অবিকৃত রেখে পুনর্নির্মাণ কাজ। আধুনিক ও বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত পদ্ধতিতে এই মসজিদের সংস্কার করেছে প্রতœতত্ত ইনস্টিটিউট। যদিও প্রতœতত্ত বিভাগ এ কাজ তদারকিতে প্রথমে তেমন সদিচ্ছা দেখায়নি। অবশেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে প্রতœতত্ত বিভাগের লোকদের এই মসজিদ পুনর্নির্মাণের কাজে তদারকির জন্য আনা হয়। পরে সংরক্ষণের প্রয়োজনে দেয়ালের কিছু অংশ খুলে ফেলা হয়। সেখানে দেখা যায়, বর্তমান দেয়ালের ১১ ইঞ্চি ভেতরে একই নকশার একটি দেয়াল। এই ভেতরের দেয়ালটির ইট ও মর্টারের সঙ্গে পরে নির্মিত ইট ও মর্টারের পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে মসজিদটির সম্ভাব্য বয়স নির্ধারণ করা হয় ১২০ বছরের অধিক।

উল্লেখ্য, ব্যয়বহুল বলে বয়স নির্ধারণে কার্বন-১৪ বা থার্মালুমেনিসেন্স ধরনের কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করা হয়নি।

৩ গম্বুজ ও ৪ মিনার বিশিষ্ট মসজিদটির আয়তন, পূর্ব-পশ্চিমে ৬২ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং উত্তর-দক্ষিণে ৬৯ ফুট ২ ইঞ্চি। আয়তাকার এই কমপ্লেক্সটিকে ‘সিঁড়িসহ প্রবেশপথ’, ‘খোলা চত্বর’ ও ‘মূল ভবন বা নামাজঘর’- এ তিনটি অংশে বিভক্ত করা যায়। মূল ভবনটি পূর্ব-পশ্চিমে ২৫ ফুট ১১ ইঞ্চি প্রশস্ত। প্রবেশপথ, খোলা চত্বর ও মূল ভবন একই প্লাটফর্মের উপর অবস্থিত। স্থানভেদে সাড়ে ৩ ফুট থেকে সাড়ে ৪ ফুট গভীর ভিত্তির ওপর ৫ ফুট সাড়ে ৩ ইঞ্চি উঁচু প্লাটফর্মের উপর মসজিদটি স্থাপিত। প্লাটফর্ম থেকে ছাদের উচ্চতা ১৭ ফুট। ভিত্তিসহ পুরো মসজিদটিই চুন-সুরকির মর্টার এবং হাতে পোড়ানো ইট দিয়ে নির্মিত হয়। প্রচলিত রূপকথা অনুসারে মানুষের মুখে শোনা যায়, এটি জিন নির্মিত মসজিদ।

এ সম্পর্কে মসজিদটির মুয়াজ্জিন জাহাঙ্গীর বলেন, আসলে জিন নির্মিত কোনো কিছুর হদিস পৃথিবীতে নেই। এটি সম্পূর্ণই মানুষের অজ্ঞতা, কুসংস্কারমূলক কথা। এভাবে জিন নির্মিত মসজিদ নামে মানুষের দক্ষতাকে অপমান করা হচ্ছে।

এছাড়া চৌধুরী বংশের বাবু চৌধুরী ও তার চাচা জানান, পূর্ব চৌধুরী বংশে মেহের বক্স চৌধুরী ১৩১৭ বঙ্গাব্দে মসজিদটির প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদ নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৩১৭ সালে মেহের বক্স চৌধুরীর মৃত্যু হলে মসজিদের কাজ স্থগিত হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন পর ফের মেহের বক্স চৌধুুরীর বংশধরেরা মসজিদটির পুনর্নির্মাণ করেন। এটি তাদের জন্মের অনেক আগের নির্মিত। তার দাদার দাদার আমলে প্রায় ১০০ বছরের বেশি আগের তৈরি নিদর্শন। তারা আরো বলেন, এটি তাদের চৌধুরী বংশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত করা হয়।

এ বিষয়ে চৌধুরী পরিবারের, নাট্য অভিনেতা ও ঠাকুরগাঁও জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক রেজাউর রাজি স্বপন চৌধুরী বলেন, এই বালিয়া মসজিদটিকে অনেকেই সংবাদপত্রে জিনের মসজিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। আসলে এটি জিনের মসজিদ নয়। আমাদের পরিবারের, হাজি মেহের বক্স চৌধুরী তিনি মসজিদের কাজ শুরু করেছিলেন ১৮৮৫ সালের দিকে এবং ১৯০৫ সাল পর্যন্ত তিনি এটার কাজ চলমান রেখেছিলেন। এরই মধ্যে হাজি মেহের বক্স চৌধুরী ও মসজিদ নির্মাণের প্রধান কারিগরের মৃত্যু হয়। ফলে তখন তার পরিবারের সন্তানরা মসজিদের কাজটি সম্পন্ন করতে পারেননি। যার ফলে অর্ধনির্মিতভাবেই অনেকদিন মসজিদটি পড়ে ছিল।

তিনি আরো বলেন, পরে আমাদের পরিবারের চাচা, দাদারা ২০০৫ সালের দিকে মসজিদটিকে পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। বুয়েটের প্রকৌশলীদের এনে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ২০০৮ সালে এটির কাজ শুরু করে এবং ২০১০ সালের শেষের দিকে ভবনের কাজ শেষ হলেও অজুখানার কিছু কাজ এখনো অসম্পূর্ণ আছে। এ মসজিদটি ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে। মসজিদটিকে যারা জিনের মসজিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে এটা আসলে ভুল তথ্য, সত্য হলো এটি হাজি মেহের বক্স চৌধুরী স্থাপিত করেছিলেন ও এটি মানুষের তৈরি একটি মসজিদ। আরো উল্লেখ্য, শত বছরেরও অধিক পুরাতন ছোট বালিয়া ঐতিহাসিক জামে মসজিদের অসমাপ্ত কাজ ফের শুভারম্ভ করেন এ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা বালিয়া চৌধুরী পরিবারের প্রথম পুরুষ হাজী মেহের বক্স চৌধুরীর পৌত্র (নাতি) বসরত আলী চৌধুরীর মেয়ে, বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি তসরিফা খাতুন ১৯ নভেম্বর ২০১০ সালে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close