গাজী শাহনেওয়াজ

  ০৪ আগস্ট, ২০২১

প্রতিদিনের সংবাদকে ডা. আয়শা আক্তার

বাড়তি অক্সিজেনেও মৃত্যুর আশঙ্কা

নভেল করোনাভাইরাসে (কোভিডণ্ড১৯) আক্রান্ত হলে অনেকেই বাসায় সিলিন্ডার কিনে রোগীর শ্বাসণ্ডপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে নিজে নিজেই অক্সিজেন নিয়ে থাকেন। ডাক্তার ও প্রশিক্ষিত নার্সের উপস্থিতি ছাড়া রোগীকে এভাবে অক্সিজেন দেওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন একজন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ। তিনি বলছেন, প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত অক্সিজেন নেওয়ার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুস (লান্স) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। এর ফলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া করোনা রোগীর কোনো ধরনের ওষুধ সেবন করা উচিত নয় এবং স্বজনদের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করাও ঠিক না। এমনকি হাসপাতালে যাওয়া বিষয়েও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।

প্রতিদিনের সংবাদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজধানীর টিবি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ও করোনা চিকিৎসক ডা. আয়শা আক্তার গতকাল মঙ্গলবার এসব কথা জানান। স্বাস্থ্যব্যাবস্থা ও হাসপাতালগুলোতে সক্ষমতাসহ মানুষের স্বাস্থ্যাবিধি মেনে চলাসহ নানা বিষয়ে পরামর্শ দেন তিনি।

২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ও করোনা বিশেষজ্ঞ ডা. আয়শা আক্তার বলেন, গত বছরের ৮ মার্চ প্রথমে বাংলাদেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এর আগে চীনের উহানে রোগটির সূত্রপাত ঘটে। বিস্তার রোধে জানুয়ারি থেকে দেশের নৌ, বিমান ও স্থলপথে থার্মার স্ক্যানসহ উন্নতমানের যন্ত্র বসানো হয়; যাতে ভাইরাস বহন করে দেশে করোনা রোগী ঢুকতে না পারে। এই সংক্রমিত রোগটি শুরুতে কম থাকলেও ধীরে ধীরে এটি বাড়তে থাকে। শুধু এখানে না সারা বিশ্বের জন্যা এটা মোকাবিলা করা বর্তমানে চ্যালেঞ্জ।

করোনা রোগীর সেবা দেওয়া বিষয়ে এই চিকিৎসক বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্যাব্যাবস্থা এখন থেকে ২৫ণ্ড৩০ বছর আগে যা ছিল বর্তমানে অনেক উন্নত ও সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটা ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবাদে সম্ভব হয়েছে।’

ডা. আয়শা আক্তার বলেন, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) থেকে শুরু করে করোনা রোগীর জন্যা অক্সিজেনসহ যা যা লাগছে এবং মোটামুটি পর্যায়ে জনবলও নিয়োগ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যা টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। এখানে কিন্তু সবাই সম্পৃক্ত। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একা না, স্বাস্থ্যা অধিদপ্তর তো আছেই। পাশাপাশি অন্যান্যা সেক্টর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সম্পৃক্ত। সবার সম্মিলিতভাবে কাজ করার উদ্দেশ্যে যাতে সংক্রমণটা কম থাকে। লকডাউনের ফলে সংক্রমণটা কমে ২০০ণ্ডএর নিচে নেমে এলো। আর যখন ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করল আর সবাই ভাবল শতভাগ সুরক্ষিত। এরপর লকডাউন শিথিল হলো বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ল। স্বাস্থ্যাবিধি কিছুই থাকল না। এরপর থেকেই বাড়া শুরু হলো সংক্রমণ।

কারণ হিসেবে টিবি হাসপাতালের এই চিকিৎসক বলেন, ভ্যাকসিক তো শতভাগ সুরক্ষা দিচ্ছে না। ৯ শতাংশ সুরক্ষা দিলেও তো ১ শতাংশ থেকে যাচ্ছে আক্রান্ত হওয়ার। এই ভ্যাকসিনটা দিলে সুবিধাটি হচ্ছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ইমিউনিটি বাড়ে। যারা মৃদু, মাঝারি ও মারাত্মক সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকেন, তাদের ঝুঁকি অনেকটা কমে যাচ্ছে। মৃদু যারা আক্রান্ত হন তারা হাসপাতালে যাওয়া লাগে না, স্বল্পসময়ের মধ্যে সুস্থ হয়ে যান। এই পর্যায়ে মৃত্যুর সংখ্যা বলা যায় একেবারেই নেই। এজন্যা ভ্যাকসিনটা অবশ্যাই দিতে হবে। যদি ৮০ শতাংশ মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে পারি, তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এর আগ পর্যন্ত এই সংক্রমণ কমানোর জন্যা মানুষকে সুরক্ষা দেবে স্বাস্থ্যাবিধি। এ কারণে লকডাউনটা এখনো চলছে। বলা হচ্ছে আপনারা ঘরে থাকুন। তাদের সেবা চিকিৎসক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যা ও সাংবাদিকসহ সবাই মাঠেণ্ডঘাটে আছেন।

তিনি বলেন, দেখা যায় ভ্যাকসিন দিতে এসে, টেস্ট করাতে এসে সবাই হুড়োহুড়ি করেন, লাইন মেইনটেন্ট করেন না এবং সামাজিক দূরত্বও বজায় রাখেন না। পাশাপাশি মাস্কটিও ঠিকভাবে পরেন না, এটা থাকে নাকের নিচে। এগুলো করলে তো সংক্রমণ বাড়বে। বেশি সংক্রমণ বাড়লে হাসপাতালে চাপ পড়বে। হাসপাতালে একটি সক্ষমতা ও ধারণক্ষমতা আছে আমি কতটুকু পারব। এটা সারা বিশ্বের জন্যা একই। সংক্রমণ বাড়লে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে অন্যা দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা ভালো।

ডা. আয়শা আক্তার বলেন, সংক্রমণ কমানোর জন্যা নিজের সুরক্ষা নিজের কাছে। নিজে সচেতন হলে পরিবার সুরক্ষিত থাকবে। এই বোধটা যখন মানুষের মধ্যে জাগ্রত হবে, আমি, আমার বাবাণ্ডমা ও স্ত্রীণ্ডসন্তানকে ভালোবাসি, তখন স্বাস্থ্যাবিধি মানায় উদ্বুদ্ধ হবেন। একসঙ্গে কাজ করা ছাড়া প্রচারণ্ডপ্রচারণা ও যতই জেলণ্ডজরিমানা করেন না কেন করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস করা অসম্ভব। আর ভ্যাকসিনের সুফলটা আরো সময় লাগবে। সবাইকে নিবন্ধন করানোর পরও এক বছর লেগে যেতে পারে। এর আগে তো আপনাকে সুস্থ থাকতে হবে।

হাসপাতালে একজন করোনা রোগীর কোনপর্যায়ে যাওয়া উচিত জানতে চাইলে এই চিকিৎসক বলেন, করোনা রোগীর লক্ষণ তিনটি। এর মধ্যে মৃদু, মাঝারি ও মারাত্মক। মৃদু লক্ষণটি মাইল্ড, যারা এ পর্যায়ের করোনা রোগী, তারা ঘরেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। তাদের হাসপাতালে যাওয়া কিংবা অক্সিজেন দেওয়া লাগছে না। কিন্তু অনেকে দেখা যাচ্ছে, সামান্য সমস্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ঘরে অক্সিজেন নিচ্ছেন এটি খুবই ক্ষতিকর। কারণ ভুল চিকিৎসায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অক্সিজেন বেশি হলে লান্স অ্যাফেক্ট বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্ষতি হতে পারে। কারণ যিনি ঘরে অক্সিজেন নিচ্ছেন, তার জানা নেই কতটুকু অক্সিজেন নেওয়ার প্রয়োজন আছে। এর ফলে লান্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। আর যারা অল্প আক্রান্ত, জ্বর কমছে না ও শ্বাসকষ্ট ভাব আসছে, তারা হাসপাতালে ভিড় না করে অনেকগুলো হটলাইন নম্বর আছে, সেখানে ফোন করে চিকিৎসা নিতে পারেন। এ পর্যায়ের রোগীরা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করবেন এবং হাসপাতালে যাওয়ার আগে যোগাযোগ করেও যেতে পারেন। এসব না করে এই রোগীরা হাসপাতালে এসে ভিড় জমান। ফলে অনেক মারাত্মক রোগী বেড ও অক্সিজেন পাচ্ছেন না বলেই মৃত্যুটা বেড়ে যাচ্ছে। তাই সুস্থ থাকার জন্যা ঘরে থাকা উচিত। কারণ আক্রান্ত বেশি হলে মৃত্যু বাড়বে। এই জিনিসটা সবার মাথায় রাখা উচিত।

অনেক রোগী যদি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত ভর্তি হন, তাহলে আইসিইউ পর্যন্ত যাওয়া লাগে? না; প্রাথমিক চিকিৎসায় ভালো হয়ে যান। কিন্তু এক শ্রেণির রোগী আছেন, তাদের ধারণা আইসিইউ লাগবেই। এ ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলে সুস্থ থাকতে পারবেন। কারণ টেনশন করলে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইমিউনিটি পাওয়ার কমে যায়। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে মৃত্যু বেড়ে যাচ্ছে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close