জীবন স্বাভাবিক হচ্ছে, ভুললে চলবে না স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি

করোনাভাইরাস সংক্রমণ

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

যেকোনো মহামারিকাল দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে একসময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতেই হয় নাগরিকদের। করোনা সংক্রমণ শুরুর পরে প্রায় সব দেশেই লকডাউন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, অফিস-আদালত-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব বন্ধ করে ঘরে অবস্থান করে রক্ষা পাওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই সব দেশ আবার নিজেদের মতো করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। চিকিৎসকরা বলছেন, মহামারি চলাকালে একটা পর্যায়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করতে হয় ঠিকই, কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস জারি রাখা জরুরি। এ বিষয়টি ভুললে চলবে না। তা না হলে আগের চেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে ফিরে আসতে পারে করোনাভাইরাস। এসব কথা জানা গেছে বিবিসির প্রতিবেদন থেকে।

গত ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথমবারের মতো এই ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস। এরপর ২০২০-এর অর্ধেকটা জুড়েই করোনা মোকাবিলায় রীতিমতো হিমশিম খেয়েছে বিশ্বের বড় বড় দেশ। করোনার বিস্তার রোধ করতে বিভিন্ন দেশে লকডাউন, জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছে। এই মহামারিতে এখনো জর্জরিত পুরো বিশ্ব। এরপরও করোনা মহামারির মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

চীনের উহানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর লকডাউন ও কঠোর পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি একসময় স্বাভাবিক হয়। পুরো শহর পরিচ্ছন্ন করে মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। কিন্তু সেখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি চলার চার মাস পর আবার ভাইরাস ফিরে আসে।

করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করণীয় বিষয়ে বিবৃতি দিয়ে আসছে। তারা বলছে, করোনাভাইরাস যে আবার ফিরে আসবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে ফিরে আসলে তার রূপ হবে আগের চেয়ে ভয়াবহ। এতে আবার বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে বিশ্ব। ফলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টার মধ্যে হ্যান্ডশেক, জনসমাগম, অনুষ্ঠানÑ এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। আবার আগের মতো পরিস্থিতিতে ফিরতে সময় লাগবে বেশকিছু। সেটি জনগণের যেমন মাথায় রাখতে হবে, তেমনই সরকারের দায়িত্ব জনগণকে সীমিত পরিসরে স্বাভাবিক জীবনযাপনে সতর্ক করা। চলাফেরায় অসতর্কতা বিপদ ডেকে আনতে পারে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস তার জিন পরিবর্তন করে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। ফলে ভাইরাস আর নেই, ভেবে নেওয়া যাবে না কোনোভাবেই।

চীন, ইতালিসহ যেসব দেশে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতা বেশি দেখা গেছে, তারা ধাপে ধাপে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। গত মে মাসে ইতালিতে করোনায় মৃতের সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৭৯ জন। আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৯৩৮। এ পরিস্থিতিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জোসেফ কোতে দেশটিতে লকডাউন শিথিল ঘোষণা করেন। শুরুতে সীমিত আকারে বার, রেস্টুরেন্ট, খুচরা ও পাইকারি দোকানপাট, স্টেশনারি, বইয়ের দোকান, বাচ্চাদের কাপড়ের দোকান, কম্পিউটার ও কাগজপত্র তৈরির কাজ শুরুর অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মে মাসের শেষের দিকে বাণিজ্যিক কিছু অফিস, প্রদর্শনী, জাদুঘর, প্রশিক্ষণ টিম, ক্রীড়া ক্ষেত্র এবং গ্রন্থাগার খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়। লকডাউন শিথিল করা হলেও করোনাভাইরাসের প্রকোপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সবাইকে গণপরিবহনসহ বাইরে মাস্ক ব্যবহার করতে এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়। গত মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই ক্রমশ স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে ইউরোপসহ গোটা বিশ্ব। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালির মতো দেশগুলোতে ধীরে ধীরে লকডাউন উঠে গেছে। করোনাকালে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ নিজেদের সীমান্ত বন্ধ করে দিলেও দেশগুলোর অর্থনীতি বাঁচাতে এখন পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়েছে সীমান্ত।

যুক্তরাষ্ট্রে মাস্ক পরা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আন্দোলনেও নেমে পড়েছিলেন অ্যাক্টিভিস্টরা। সংক্রমণ রোধে মাস্ক পরার ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জোর দিলেও খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মাস্ক পরতে দেখা যায়নি শুরুর দিকে। জুলাইতে এসে তিনি হোয়াইট হাউস থেকে বের হওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করেন এবং বলেন, ‘আমি মাস্কের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু আমার মতে, সেটা পরার জন্য নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা রয়েছে।’

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশের অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। সংক্রমণের মাত্রা অনুযায়ী রেড জোন নির্ধারণ করে লকডাউনেরও ঘোষণা আসে। দুই মাসের বেশি সময় পরে দেশে এক দিনে সর্বাধিক কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের দিন ঘোষণা আসে, ৩১ মে থেকে অফিস খুলবে, বাস-লঞ্চ-ট্রেন-বিমান চলবে।

ভাইরাস সংক্রমণের দিক থেকে নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে এভাবে সব খোলার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী মনে করছিলেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু দেশের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরারও তাড়া ছিল। যে দুই মাস সাধারণ ছুটি ও বাসা থেকে বের হওয়ায় বিধিনিষেধ ছিল, সেই দুই মাসে দিন ভিত্তিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্তদের আয় ছিল পুরোপুরি বন্ধ। শুরুতে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এসব খোলার ঘোষণা হয়। এরপর গত দুই মাসে পর্যায়ক্রমে সব বিধিনিষেধ উঠিয়ে নেওয়া হয়। যদিও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ ও মাস্ক বাধ্যতামূলকভাবে পরে চলার পরিপত্র এখনো জারি আছে।

খাপ খাইয়ে নেওয়া মহামারিকালের বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের চিকিৎসক লেলিন চৌধুরী বিবিসিকে বলছেন, বিশেষ কারণে একটা পর্যায়ের পর আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরতে হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু এখনো বলতে পারছি না যে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নেই, সেহেতু সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করার কাজগুলো অব্যাহত রাখতে হবে। বিশ্বের যারাই মে মাসের পরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলে জীবনযাপন করতে গেছে, তারাই দ্বিতীয়বারের মতো সংক্রমণের শিকার হয়েছে। অফিস খুলে গেছে বলেই আপনি অনেক দিন পর দেখা হওয়া সহকর্মীর সঙ্গে করমর্দন করবেন সেটি হবে না। এই বিষয়গুলো অনবরত টেলিভিশনে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। আগামীর যেকোনো বিপদ এড়াতে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। জনপরিসরে আমরা স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে পারিনি বলে মন্তব্য করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আমরা গরুর হাট উন্মুক্ত করে দিয়ে মাস্ক পরতে বলেছিলাম। কিন্তু সেটি কেউ না করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখিনি। ফলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সময়ে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য না করা গেলে সংক্রমণ কমানো সম্ভব না।

 

"