মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
নিবন্ধ
সভ্যতার সাতকাহন

যা অসভ্য নয়, তা-ই সভ্য। আর যে সমাজ ও পরিবেশ সভ্য-অসভ্যের ভেদাভেদ করতে শেখায়, তা-ই সভ্যতা। প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে মানবসভ্যতার অগ্রগতির বর্তমানকাল পর্যন্ত ধারাবাহিক উন্নতিই হচ্ছে সভ্যতা। সভ্যতার সঠিক কোনো সংজ্ঞা নেই। সাধারণ অর্থে সভ্যতা বলতে মানবজাতির বিকশিত অবস্থাকে বোঝায়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে সভ্যতা গড়ে উঠেছে একের পর এক। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন সভ্যতার চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী, ধর্মীয় নেতারা মানবজীবনকে সুখী ও সমৃদ্ধিশালী করার জন্য মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় জীবনধারায় উন্নয়ন ঘটাতে গিয়ে সে সভ্যতা সৃষ্টি করেছেন। ‘সভ্যতা’ শব্দের উৎপত্তি ‘সভা’ থেকে। আর ‘সভা’র অর্থ হলো, যা সবাইকে নিয়ে শোভা পায়। এ অর্থে সভ্যতার অন্যতম মানে হচ্ছে সামাজিক সুসঙ্গত অবস্থা। যে অবস্থায় মানুষের সামাজিক জীবন প্রতিভাত হয়, তার বিকাশ বা উন্নতি হয়; তা-ই সভ্যতা। এটি মানুষের জীবনযাত্রা প্রণালির শোভনতার পরিচায়ক। এছাড়াও সভ্যতা বলতে আরো বহু বস্তুগত সংস্কৃতি বোঝায়। যেমন-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সব বস্তুগত আবিষ্কারের ফলকে একসঙ্গে ‘সভ্যতা’ বলা হয়। প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)-এর পৃথিবীতে আগমনের মাধ্যমে মানবসভ্যতার গোড়াপত্তন হয়। সব নবী ও রাসুল উৎকৃষ্ট সভ্যতার প্রকৃষ্ট বাহক। সবাই তিনটি প্রশ্নের মিশন নিয়ে তাদের নবুওয়ত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনে সদা তৎপর ছিলেন। আমায় কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? কে সৃষ্টি করেছেন? আমার চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায়? এ তিনটি প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গিয়ে পৃথিবীর প্রথিতযশা দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, লেখক-গবেষকরা আজ হয়রান। কেউ কেউ নিজস্ব চিন্তা-গবেষণা, ঐশীগ্রন্থ, সৃষ্টিজগতের বিশাল অস্তিত্বের মাধ্যমে প্রশ্নগুলোর সঠিক সমাধান খুঁজে পেয়ে হয়েছেন বিশ্বাসী। আবার কেউ কেউ চিন্তার বিকৃতি, অতিপ্রাকৃতিক দর্শন, সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসহীনতার কারণে প্রশ্নগুলোর ভিন্ন সমাধান পেশ করে হয়েছে নাস্তিক। মানবসভ্যতার আলোচনা-পর্যালোচনার মাঝে লাখো পৃষ্ঠার ইতিহাস নিহিত রয়েছে। সভ্যতার পরিচায়ক হলো সংস্কৃতি, যেমনিভাবে ফল গাছের পরিচায়ক। সভ্যতা ও সংস্কৃতি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো। মনের বিকাশের নাম সংস্কৃতি, মস্তিষ্কের বিকাশের নাম সভ্যতা। যেমন ‘বিয়ে’ একটি সভ্যতা, আর বিয়ের নিয়মনীতি ও কার্যপ্রণালি সংস্কৃতিমাত্র। সভ্যতার বাহক হলো সমাজ আর সংস্কৃতির বাহক মানুষ। যুগে যুগে সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। মানুষের চিন্তাচেতনা, ভৌগোলিক অবস্থান, পরিবেশ ও পার্থিব সুযোগ-সুবিধা, উপায়-উপকরণের কারণে সভ্যতা-সংস্কৃতির তারতম্য সৃষ্টি হয়। কারণ Civilization is what we use and culture is what we are. সংস্কৃতিকে যদি আরেকটু সহজ করে ব্যাখ্যা করা হয়-Culture is the reflection of our mind অর্থাৎ আমাদের মনের চিন্তার প্রতিচ্ছবি তথা বহিঃপ্রকাশই হলো সংস্কৃতি। একেকটি জাতি একেকটি সভ্যতা বহন করে। কিন্তু স্থান-কাল ও রুচিবোধের কারণে সংস্কৃতির পার্থক্য ঘটতে পারে। সভ্যতা ও সংস্কৃতি যুগপরিক্রমায় আধুনিকতার রূপ লাভ করেছে। যদিও আমরা উত্তর আধুনিককালে বাস করছি, কিন্তু মুসলিম সভ্যতা কখনই সেকেলে ছিল না। যদিও modern civilization-এর দৃষ্টিতে ইউরোপে রেনেসাঁর পূর্ববর্তী সময়কে অন্ধকার যুগ বলা হচ্ছে। যদি আমরা প্রাচীন মুসলিম সভ্যতা ও অমুসলিম সভ্যতার পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যায় বর্তমান ইংল্যান্ড সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর পরও ছিল একটি অনুন্নত ও নিঃস্ব দেশ। সর্বত্রই ছিল মূর্খতা ও বর্বরতা। সমগ্র ভূখন্ড ছিল গভীর বন-জঙ্গলে পূর্ণ। অনেকে গৃহপালিত পশুকেও নিজেদের সঙ্গে শয়নকক্ষেই রাখত। ঠিক সে সময় মুসলিম বিশ্বের বড় বড় শহর বাগদাদ, দামেস্ক, কর্ডোভা, গ্রানাডার সভ্যতা-সংস্কৃতি অনেক বেশি উন্নত ছিল। ইউরোপিয়ানরা যখন বিল্ডিং তৈরি করতে জানত না, সে সময় কেবল কর্ডোভাতে আশি হাজার পাকা বাড়ি ছিল। শহরের সব নাগরিক ছিল শিক্ষিত। হাসপাতালের সংখ্যা ছিল পঞ্চাশটি। মসজিদ ছিল আশিটি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি সভ্যতা ও সংস্কৃতির আলোচনা করা হয়, তাহলে আমরা বলতে পারি, দীর্ঘদিনের লালিত সাহিত্য-সংস্কৃতি, গ্রামীণ ঐতিহ্য, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আস্থা, লোকশিল্প, মরমি, লোকগীতি, কুটিরশিল্প, কৃষি, ধর্ম ও দর্শন, সৌহার্দ্য ও সহায়তা এবং ভাষার গৌরবোজ্জ্বল অতীত রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে যদিও আমাদের একটি সভ্যতা, কিন্তু ধর্ম ও স্থানের তারতম্যের দিক থেকে আমাদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি। একজন মুসলিম ও একজন অমুসলিম ব্যক্তির সংস্কৃতি কখনো এক হতে পারে না। তবে সে ভিন্নতার মাঝেও অবশ্যই রুচিশীলতা থাকতে হবে। একজন মুসলিম যুবকের সংস্কৃতি আবর্তিত হয় তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাতকে ঘিরে। ভোরে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আজানের ধ্বনি দিয়ে যে মুসলিম সংস্কৃতি আরম্ভ হয়, তার পরিসমাপ্তি ঘটে আবারো এশার আজানের সুললিত ধ্বনিতে। তার মানে একত্ববাদের ঘোষণা, রিসালাতের শিক্ষা অনুসরণের মাধ্যমে হাশরের ময়দানে সফল একজন ব্যক্তি হওয়ার প্রত্যাশায় দিবানিশি অতিবাহিত হয়। প্রতি মুহূর্ত যার ব্যয় হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে। ‘নিশ্চয়ই আল্লাহভীরুদের জন্য রয়েছে চূড়ান্ত সফলতা।’ (সুরা নাবা : ৩১)। কিন্তু আজ সব কিছুতে আমরা বড়ই অমিল খুঁজে পাচ্ছি। সভ্যতার নামে অসভ্যতার প্রচলন, সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির লালন, পরিবার প্রথার ক্রমশ বিলোপ সাধন, আধুনিকতার নামে পোশাক-পরিচ্ছদের জীর্ণতা, খাওয়া-দাওয়ায় রুচির পরিবর্তনশীলতা, বিনোদনের নামে বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা, স্মার্টনেসের নামে অপচয়, অপ্রয়োজনীয় স্মার্টফোনের ব্যাপক সয়লাব, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন, অর্থের প্রতি সীমাহীন লোভ ও সামান্য অজুহাতে হত্যাকান্ড-এ জাতির মাঝে নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
"




































