এস এম মুকুল
মৎস্য খনি
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে হালদা

বিরল বৈশিষ্ট্যের একমাত্র নদী হালদা। বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটাসমৃদ্ধ নদী হালদা স্বাদু পানির মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র। নদীটির উৎপত্তি আর সমাপ্তি দুটিই দেশের ভেতরে। রুই জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয় এ নদী থেকে। হালদা নদী বাংলাদেশের সাদা সোনার খনি হিসেবেও পরিচিত। জনশ্রুতি আছে, হালদা নদী থেকে প্রতিবছর এক হাজার কোটি টাকা জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ হতো। এ নদী শুধু মৎস্য সম্পদের জন্য নয়, যোগাযোগ, কৃষি ও পানি সম্পদেরও একটি বড় উৎস। জেনে রাখার মতো বিষয় হলো- ডিম থেকে উৎপাদিত রেণুু পোনা থেকে মাছ হিসেবে খাবার টেবিলে আসা পর্যন্ত দেশের মৎস্য খাতে হালদা নদী চার ধাপে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে। প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হিসেবে নদীটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও দখল, দূষণ, লবণাক্ততা, রাবার ড্যাম নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে হালদা নদী এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
মৃগেল ও কাতল মাছের খাদ্য হচ্ছে প্ল্যাঙ্কটন আর রুই ও কালবাউশের খাদ্য বেনথোস। বাঁধের কারণে নিচের অংশে প্রায় ২০ কিলোমিটার এ দুই খাদ্যের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। বাঁধ যখন কার্যকর থাকে, তখন নদীর নিচের অংশে অন্তত ৫-৬ কিলোমিটার এলাকা শুকিয়ে যায়। বাঁধের কারণে নদীর নিচের অংশে মাছের খাদ্য ক্ষুদ্র প্রাণী ও জলজ উদ্ভিদের ঘাটতি দেখা দেয়। এ কারণে মৃগেল ও কালবাউশ মাছ কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১০০ বছরে হালদা নদীর অন্তত ১১টি বড় আকারের বাঁক কেটে সোজা করে ফেলা হয়েছে। নদীর বাঁক কার্প-জাতীয় মাছের প্রধান বসতি। বাঁক সোজা করে ফেলায় মাছের বিচরণক্ষেত্র কমে গেছে। তবে আশার খবর হচ্ছে, হালদা রক্ষায় রাবার ড্যামের ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তা করছে সরকার। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, কৃষকদের ক্ষতি না করে হালদায় রাবার ড্যামের বিকল্প ব্যবস্থা নিতে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি উপজেলার কৃষকদের হালদার পানি ব্যবহার থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে রাবার ড্যামগুলো সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে উৎস থেকে নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে।
হালদা খালের উৎপত্তিস্থল মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের পাহাড়ি গ্রাম সালদা। সালদার পাহাড়ি ঝরনা থেকে নেমে আসা ছড়া সালদা থেকে নামকরণ হয় হালদা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার রামগড় পাহাড় হতে উৎপন্ন হয়ে মানিকছড়ি, চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বুড়িশ্চরের কর্ণফুলী নদীতে মিলিত হয়েছে। হালদার দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৫ কিলোমিটার। পানির উৎস মানিকছড়ি, ধুরং, বারমাসিয়া, মন্দাকিনী, লেলাং, বোয়ালিয়া, চানখালী, সর্ত্তা, কাগতিয়া, সোনাইখাল, পারাখালী, খাটাখালীসহ বেশকিছু ছোট ছোট ছড়া। নদীটির গভীরতা স্থান বিশেষ ২৫ থেকে ৫০ ফুট। একক নদী হিসেবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে হালদা নদীর অবদান সবচেয়ে বেশি। হালদাকে আঁকড়ে থাকা প্রায় তিন হাজার জেলে পরিবারসহ জড়িয়ে আছে বিশ হাজার মানুষের জীবিকায়ন। নদী গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের অসংখ্য নদী থেকে হালদা নদীর বিশেষ পার্থক্য মূলত পরিবেশগত। এ বৈশিষ্ট্যগুলো ভৌতিক, রাসায়নিক এবং জৈবিক। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিম ছাড়ার উপযোগী প্রতিটি মাছের ওজন সর্বনিম্ন পাঁচ কেজি থেকে সর্বোচ্চ এক মণ পর্যন্ত হয়। হালদা নদীতে মিঠা পানির ডলফিনসহ ৬০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। জানা গেছে, পঞ্চাশের দশকে দেশের মোট চাহিদার ৭০ ভাগেরও বেশি পোনার চাহিদা পূরণ করত হালদা। হালদা বিশেষজ্ঞদের গবেষণা অনুযায়ী, হালদার পাঁচ কেজি ওজনের ডিমওয়ালা একটি মাছ থেকে বছরে সাড়ে তিন কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। তাই অপার সম্ভাবনাময় এ নদীকে ঘিরে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিলে জাতীয় অর্থনীতিতে শত কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা আছে।
গবেষণা তথ্যে জানা গেছে, মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে হালদায় বর্তমানে মাছ যে পরিমাণে ডিম ছাড়ে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ডিম ছাড়ে কাতল মাছ। ১৮ থেকে ২০ কেজি ওজনের একটি কাতল মাছ ডিম দেয় প্রায় ৪০ লাখ। হালদার প্রতিটি মা মাছকে একেকটি প্রাকৃতিক অ্যাগ্রো মেগা ইন্ডাস্ট্রি বলেও অভিহিত করছেন গবেষকরা। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, একটি মা মাছ থেকে এক বছরে চার ধাপে আয় করা যায়। ১ম ধাপে ডিম থেকে রেণু বিক্রি করে, ২য় ধাপে ধানী পোনা বিক্রি করে, ৩য় ধাপে আঙ্গুলী পোনা বিক্রি করে, ৪র্থ ধাপে এক বছর বয়সে মাছ হিসেবে বাজারজাত করে। বিভিন্ন গবেষণা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিটি ধাপে ৪০ শতাংশ মৃত্যু হার বাদ দিয়ে হিসাব করলে একটি মা কাতলা মাছ প্রতিবছর হালদা নদীতে ডিম ছাড়ে ১৯ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার। তথ্য বিশ্লেষণে আরো দেখা গেছে, হালদায় এক সময় ৭২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কালপরিক্রমায় পাঙ্গাশ, ঘনি চাপিলা, কইপুঁটি, বাণী কোকসা, ঘর পুঁইয়া, গুইজ্জা আইর, বুদ বাইলাসহ অন্তত ১৫টি প্রজাতির মৎস্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জানা গেছে, ১৯৪৫ সালে শুধু হালদা থেকেই ৫০০০ কেজি রেণু সংগ্রহ করা হতো। এক সময় হালদায় ২০-২৫ কেজি ওজনের কাতলা, ১২-১৫ কেজি ওজনের রুই এবং ৮-১০ কেজি ওজনের মৃগেল পাওয়া যেত, যা এখন কালেভদ্রে চোখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরে চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান প্রায় ৮০০ কোটি টাকা, যা দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় হালদা নদীর জন্য মানবসৃষ্ট ক্ষতিকর অন্তত ১০টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফটিকছড়ির চা-বাগানগুলোর জন্য নদীর পানি ব্যবহার, নদী থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি উত্তোলন, মা মাছ নিধন, নদী থেকে নির্বিচারে বালু তোলায় এর মাটির গঠন নষ্ট। তীরে একের পর এক গড়ে ওঠা ইটভাটায় ব্যবহৃত হচ্ছে নদীর মাটি ও পানি, নদীর ১১টি স্থানের বাঁক সমান করে ফেলায় মাছের বিচরণ ও প্রজনন কমে গেছে, খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে নদীর তীরে তামাক চাষ ও যন্ত্রচালিত নৌযান থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ে দূষিত হচ্ছে হালদা নদী। অপরদিকে হালদা রক্ষায় গবেষণা প্রতিবেদনে ১০টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খালের মাধ্যমে হালদা নদীতে শিল্প ও আবাসিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, ভারী শিল্প-কারখানায় ইটিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মা মাছ ধরা বন্ধে নদীতে পাহারা জোরদার করা, রাবার ড্যাম প্রত্যাহার, তামাক চাষ বন্ধ করা।
হালদাকে তুলনা করা যেতে পারে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম নদী মেকংয়ের সঙ্গে। মিয়ানমার, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড যৌথভাবে একটি সমন্বিত নদী কমিশন গঠন করে মেকং নদীতে মৎস্য চাষের মাধ্যমে তাদের সারা বছরের মাছের চাহিদা পূরণ করছে। জানা গেছে, মেকং নদীর প্রায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত সমন্বিত নদী কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নদী থেকে মাছ শিকার বন্ধ থাকে। এর ফলে দেখা গেছে, নবেম্বর থেকে মে পর্যন্ত মাছ ধরার জন্য মেকং নদী উন্মুক্ত করে দিলে জেলেরা নদী থেকে প্রচুর মাছ আহরণ করতে পারছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কেন দেশের অভ্যন্তরের মাছের খনি হালদা, কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীতে বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত মাছ শিকার বন্ধ করে মাছের উৎপাদন বাড়াতে পারছি না। এ প্রশ্নের জবাবে বলতে হয়, সদিচ্ছার অভাব। জানা গেছে, রুই জাতীয় মাছের পর হালদার অন্যতম প্রধান মাছ হচ্ছে গলদা চিংড়ি। গবেষকদের মতে, একটি পরিপক্ব গলদা চিংড়ি একসঙ্গে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার ডিম ছাড়ে। কর্ণফুলীর মুখ থেকে মাদারীখালের মুখ পর্যন্ত জেলেরা গলদা চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করে যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা গলদা চিংড়ি খামারগুলোতে সরবরাহ করে। আমরা আশা করব, মৎস্য বিভাগ আরো দায়িত্ববান হয়ে বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রটিকে পূর্বের ন্যায় প্রাণবন্ত করে মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক
"




































