নদী বাঁচাতে প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। হিমালয় থেকে নেমে আসা অনেক নদ-নদীর প্রবাহ থেকে এই ভূখণ্ডের সৃষ্টি। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ গড়ে উঠেছে হাজার হাজার বছর ধরে বহমান সেই নদীর পলিমাটি থেকে। এসব নদীকে কেন্দ্র করেই মানুষ তার জীবন-জীবিকার পথ তৈরি করে নিয়েছে। জনজীবনে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতিতে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নদীর বয়ে আসা পলিমাটিতেই কৃষিজমি অত্যন্ত উর্বর হয়। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে নদীই ভরসা। সেচ আর বিদ্যুতের জন্যও নদীর প্রয়োজন ব্যাপক। তবে বাংলাদেশকে এখন নদী বিপর্যয়ের দেশ বলা যায়। নদ-নদীর ওপর কোনো না কোনোভাবে আগ্রাসন-নির্যাতন চলছেই। আড়াই শতাধিক নদ-নদী মরে গেছে বলে জানা যায়। অনেক নদীর অস্তিত্ব সংকট তৈরি হয়েছে। নাব্য, গভীরতা, আকার-আকৃতি হারিয়েছে দেশের বেশির ভাগ নদী। অনেক নদী জীর্ণশীর্ণ হয়ে যাওয়ায় তীর বেদখল হয়ে গেছে। এ অবস্থায় নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদ-নদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা।
রাজধানী ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী। এই নদীকে কি এখন আর ঢাকার প্রাণ বলা চলে? দখল-দূষণে বুড়িগঙ্গার অস্তিত্ব হুমকির মুখে। শুধু বুড়িগঙ্গাই নয়, ঢাকার চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা দূষণ-দখলে বিপর্যস্ত। এই চার নদ-নদী রক্ষায় ২০০৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিকাল এরিয়া-ইসিএ) ঘোষণা করেছিল সরকার। কিন্তু ১৩ বছর পার হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এটি বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগই নেয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর। এতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকাকে ‘রহস্যজনক’ বলে মনে করছে নদীরক্ষা কমিশন। গত মঙ্গলবার প্রতিদিনের সংবাদের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইসিএ বাস্তবায়নে এরই মধ্যে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে কয়েক দফায় অনুরোধ করা হলেও তাতে সাড়া দেয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর। বিষয়টি নিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে কয়েক দফায় বৈঠক ও চিঠি পাঠানো হয়েছে, এমনকি টেলিফোন করে তাগাদাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে রাজধানীর এই চার নদী এলাকায় ইসিএ বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসিএ বাস্তবায়নের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকেই উদ্যোগী হতে হবে। পুরো নদী এলাকার প্রশাসনিক পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে ইসিএ বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, ২০২২ সালের ১৬ মার্চ তুরাগ নদের তীরে দাঁড়িয়ে কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী সংবাদমাধ্যমের সামনে বলেছিলেন, ঢাকার চারটি নদী দূষণমুক্ত করতে যত দ্রুত সম্ভব সক্ষমতা অর্জন করা হবে। এর পরপরই জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবহিত করে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকেও তুরাগ নদকে দূষণমুক্ত করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নদীর দুই তীরে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা গেলে নদীকে দখলমুক্ত করা সম্ভব হবে। এছাড়া নদীর নাব্য সংকট দূর করতে খনন কাজ জোরালো করতে হবে। নদীকে দূষণমুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর যে নির্দেশনা রয়েছে তাও বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। তা না হলে প্রকৃতির প্রাণ মরেই যাবে। কেবল রাজধানীর চার দিকের নদী নয়, পুরো দেশের নদ-নদী নিয়েই ভাবতে হয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে। নদী বাঁচাতে কমিশনের অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন।
"




































