কে এম মাসুম বিল্লাহ

  ০৫ জানুয়ারি, ২০২২

অনুসন্ধান

অনলাইন গেম আসক্তির সমাধান কোথায়

প্রযুক্তি এগিয়েছে বহুদূর, দৈনন্দিন জীবনে যার প্রভাবকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। একটা সময়ে গ্রামের মাঠেঘাটে শিশু-কিশোররা মেতে থাকত বিভিন্ন খেলাধুলায়। ক্রিকেট, ফুটবল থেকে শুরু করে গোল্লাছুট, কাবাডিসহ দেশীয় বিভিন্ন খেলাধুলায় কেটে যেত বিকাল। তবে দিন বদল হয়েছে প্রযুক্তির ছোঁয়ায়! সচেতন অনেক অভিভাবকই তাই শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছে স্মার্টফোন। শিশুদের ঘুম পাড়াতে কিংবা খাবার খাওয়ানোর সময় মোবাইল ফোনের সাহায়্য নিতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এতে সাময়িক সমস্যা দূর হলেও শিশুরা মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। যার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে পরবর্তীতে। শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে শরীরচর্চা ও খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বর্তমানে শিশুরা খেলাধুলা থেকে সরে গিয়ে অনেকটাই মোবাইল ফোনে ভিডিও গেমসের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এতে করে শারীরিক ও মানসিক উভয়ই দিকেই মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে যেভাবে শিশু-কিশোররা অতিরিক্ত ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে, তা অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়াও করোনার কারণে প্রায় দেড় বছর স্কুল বন্ধ থাকায় অধিকাংশ স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোর মোবাইল গেমসের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে।

ভিডিও গেমের প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। বর্তমানে এর প্রভাব খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে এই আসক্তিকে সম্প্রতি মানসিক রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশুদের অনলাইন ভিডিও গেম নিয়ে যথেষ্ট সচেতন। অনেক দেশই শিশুদের ভিডিও গেমসের ওপর মনিটরিং করছে। যদিও আমাদের দেশে এখন তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শিশুদের অতিরিক্ত ভিডিও গেমস আসক্তি নিয়ে দেশের বিশেষজ্ঞরাও অনেক দিন থেকে চিন্তিত। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ভিডিও গেম শিশুদের সামাজিকীকরণে বাধা দেয় এবং মেধাবিকাশে যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ ছাড়াও বর্তমানে অনেক শিশুর আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ভিডিও গেম খেলতে বাধা দিলে অনেক শিশু চিৎকার-চেঁচামেচি করে, উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে, রাগ দেখানো এবং অন্যান্য কাজে খুব বেশি মনোযোগ দিতে চায় না। গেম খেলতে না দেওয়া কিংবা এমবি কেনার টাকা না দেওয়ায় আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে আমাদের দেশে।

অধিকাংশ ভিডিও গেমের কন্টেন্টগুলো যুদ্ধ, সংঘাত, রক্তপাত নিয়ে, যা কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়। বর্তমানে শুধু শহর এলাকায় নয়, ভিডিও গেমসের দিকে ঝুঁকছে গ্রামের শিশু-কিশোররাও। ইদানীং মফস্বলের শিশু-কিশোররাও একত্রে বসে দলবেঁধে ভিডিও গেম খেলছে। খেলার মাঠ থাকা সত্ত্বেও ভিডিও গেমের দিকে ঝুঁকে পড়া আরো বেশি শঙ্কার। গ্রামের রাস্তাঘাটে, চায়ের দোকানে কিংবা মহল্লায় সব জায়গার একই চিত্র! ঘরে কিংবা বাইরে তাদের আচরণেও যার প্রভাব স্পষ্ট। এতে করে সচেতন সব মহলই উদ্বিগ্ন এসব শিশু-কিশোর নিয়ে। মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় কিশোর-তরুণরা ‘পাবজি’র মতো ভিডিওতে এতটাই মগ্ন থাকছে যে, বাস্তব পৃথিবী ভুলে তারা এক বিপজ্জনক নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা এবং হাতের নাগালের মধ্যে থাকা ইন্টারনেটের কারণেই এই গেমটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। এসব গেমে আসক্তির কারণে কিশোররা পারিবারিক, সামাজিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এক গবেষণার পর জানিয়েছে, ভিডিও গেমে আসক্তি এক ধরনের মানসিক রোগ। ভিডিও গেমগুলো একজনের জন্য ডিপ্রেশনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। শহরের শিশুদের চশমা ব্যবহার বেড়েছে অতিরিক্ত হারে, মোবাইল গেমে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হতে পারে তার বড় কারণ। আর সেই সঙ্গে দেখা দেয় ঘুমের ঘাটতিও। এ ছাড়াও ক্ষুধামন্দা সমস্যা তো থাকছেই।

অতিরিক্ত হিংস্রতার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে পাবজি গেমটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। গেমটি বন্ধ করা হয় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালেও। হিং¯্রতার কারণে এই গেমকে নিষিদ্ধ করে ইরাক ও জর্ডানের মতো দেশ। টেকনোলজির দেশ চায়নায়ও নিষিদ্ধ করা হয় গেমটি। যদিও নেপালে পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। সর্বশেষ বাংলাদেশেও নিষিদ্ধ করার পর আবারও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে হয়তো। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন ব্রিটেন, জার্মানি এবং চীনে ভিডিও গেমের আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আলাদা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে এমন পুনর্বাসন কেন্দ্র হয়তো আমাদের দেশেও দরকার হবে।

অনলাইন গেমের আসক্তি বাড়ায় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার মানসিকতাও কমে যাচ্ছে, পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চাও হচ্ছে না তাদের। ইলেকট্রনিক ডিভাইস ঘটিত অনলাইন গেমের এ আসক্তিকে মনোবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘ডিজিটাল মাদক’! এবং ভিডিও গেমে আসক্তির জন্য সৃষ্টি মানসিক সমস্যাকে বলা হচ্ছে গেমিং ডিজঅর্ডার। আমাদের দেশের কর্তৃপক্ষকেও এ বিষয়ে নজর দিতে হবে এখন। বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে হুমকির মুখে পড়বে শিশু-কিশোরদের মেধাবিকাশ, সংকটে পড়বে পরবর্তী প্রজন্ম। সরকারের উচিত হবে এই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। অভিভাবকদের দরকার বাড়তি সচেতনতা। সামাজিকভাবে একটা আন্দোলন হোক, সমাজের সব সচেতনরা ভূমিকা রাখুন, শিশু-কিশোররা ভিডিও গেমসের আসক্তি থেকে বের হয়ে খেলার মাঠে ফিরুক কিংবা নানা রকম বইয়ের জগতে নিজেদের আবিষ্কার করুক- এটাই আমাদের চাওয়া।

লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়