ব্রেকিং নিউজ

পর্যবেক্ষণ

স্বাগত বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নোবেল জয়

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

ড. মনসুর আলম খান

এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেল জাতিসংঘের ‘বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)’। গত ৯ অক্টোবর ২০২০ তারিখে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি ডব্লিউএফপির শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তি সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। কমিটি বৈশ্বিক শান্তি বজায় রাখতে ডব্লিউএফপির অবদানের কথা তুলে ধরেছে। তারা বলেছে, ‘সংস্থাটির ক্ষুধা নিবারণের প্রয়াসের জন্য, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শান্তির অবস্থা উন্নতিতে অবদান রাখার জন্য এবং যুদ্ধ ও সংঘর্ষের অস্ত্র হিসাবে ক্ষুধার ব্যবহার প্রতিরোধ করার প্রয়াসের জন্য’ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে ২০২০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান বেরিট রিস-অ্যান্ডারসন বলেছেন, ‘ডব্লিউএফপি করোনাকালে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে ফেরাতে সক্ষম হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তাকে শান্তির উপকরণ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সংস্থাটিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। অভিনন্দন জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিশ্ব নেতাদের এসব অভিনন্দন এবং নোবেল কমিটির মূল্যায়ন থেকে এ কথা স্পষ্ট, পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে বিশ্ব শান্তিকে এ বছর দেখা হয়েছে ক্ষুধাহীনতার আঙ্গিক থেকে এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে বিবেচনা করা হয়েছে বৈশ্বিক নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে। খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সম্মিলন ঘটানো হয়েছে শান্তির সূচককে।

করোনাকালে খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর সংবেদনশীল। করোনার কারণে বিশ্বে এখন বিরাজ করছে অভূতপূর্ব সংকট। কোভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে শুধু মহামারি ঘটিয়েই থামছে না, বিশ্ব সভ্যতাকে দাঁড় করিয়েছে এক সীমাহীন অনিশ্চয়তার মুখে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী চরম খাদ্য ঘাটতিজনিত ব্যাপক প্রাণহানির। ডব্লিউএফপি গত এপ্রিলে আশঙ্কা করেছিল যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হলে সারা বিশ্বে প্রায় তিন কোটি লোকের প্রাণহানি হতে পারে অপুষ্টি ও অনাহারে।

এই আশঙ্কাকে সামনে রেখে বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা আশু করণীয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন দেশ তাদের নিজেদের মতো করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও নিরূপণ করেছে। এরই মাঝে জি-২০ এর কৃষিমন্ত্রীগণ, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), বিশ্ব ব্যাংক এবং ডব্লিউএফপির এর প্রতিনিধিগণ। গত ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত অনলাইন সভায় যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশের কৃষিবান্ধব সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বিশ্বব্যাপী আসন্ন খাদ্য ঘটতি সম্পর্কে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নেতাদের সঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলা করার প্রস্তাব রেখেছেন বিশ্ব নেতাদের কাছে। দেশের অভ্যন্তরে বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে ৩১ দফা নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এগুলোর মধ্যে কৃষি-সংক্রান্ত প্রধান নির্দেশনাটি হচ্ছেÑ ‘খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, অধিক প্রকার ফসল উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার তা করতে হবে।’ সুতরাং কোভিড-১৯ এর প্রভাব মোকাবিলা করে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ব শান্তির নবতর প্রতীক ‘খাদ্য নিরাপত্তা’র তত্ত্বীয় ভাষা পড়তে পাড়াও জরুরি।

‘খাদ্য নিরাপত্তা’-এর তত্ত্বীয় সংজ্ঞা বোঝার জন্য আমাদের চোখ রাখতে হবে ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে রোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব খাদ্য শীর্ষ সম্মিলনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। সেখানে উল্লেখ্য করা হয়েছে, ‘কোনো সমাজে সবার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সব সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার প্রাপ্তির শারীরিক এবং অর্থনীতিক সক্ষমতা বিদ্যমান থাকলে তবেই উক্ত সমাজে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জিত হয়েছে বলা যাবে।’ এই সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে এফএও প্রাপ্যতা, প্রবেশাধিকার, খাদ্যের সঠিক ব্যবহার এবং টেকসই খাদ্য ব্যবস্থাপনাÑ এই চারটি আঙ্গিককে খাদ্য নিরাপত্তার স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে ইতোমধ্যেই খাদ্য নিরাপত্তার প্রথম স্তম্ভ খাদ্যের প্রাপ্যতা হুমকিতে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য সরবরাহ চেইন। কিছুদিন আগেও একদিকে ফসল নিয়ে বিপাকে ছিল কৃষক, অন্যদিকে ভোক্তা পর্যায়ে বিরাজ করেছিল অপ্রতুলতা। আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থা ছিল আরো সংকটাপন্ন। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫২.০৫৯ লাখ টন গম আমদানি করেছে এবং রফতানি করেছে ০.৫৮৭ লাখ টন সবজি। করোনা পরিস্থিতিতে আমদানি-রফতানি দুই-ই আছে হুমকিতে। আগামী দিনের বীজ, সার, বালাইনাশক, শ্রমিকের চলাচল, সংগ্রহ ইত্যাদি কারণে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘœ ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত আমদানির মাধ্যমে সমাজে খাদ্য উপাদান জোগান দেওয়ার চিরকালীন রীতি করোনাকালে হুমকিতে পড়েছে। এসব কারণে করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশের ১৬ কোটি লোকের জন্য খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হবে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। আর এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান, কোনো জমি যেন পতিত না থাকে। খুবই সময়োচিত, খাদ্য নিরাপত্তার প্রাপ্যতা স্তম্ভ নিশ্চিতকরণের এক দৃঢ় পদক্ষেপ।

খাদ্য নিরাপত্তার দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো খাদ্যে প্রবেশাধিকার। পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন অথবা আমদানির মধ্য দিয়ে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলেও খাদ্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয় না। খাদ্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য দরকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। পরিবারের সবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিকর খাদ্য সংস্থান করা নির্ভর করে খাদ্য মূল্য এবং আর্থিক সামর্থ্যরে ওপর। সরবরাহ পর্যাপ্ত হলে মূল্য নাগালে থাকে, আবার ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে উচ্চ মূল্য দিয়েও খাবার কেনা যায়। করোনাকালে খাদ্য সরবরাহের ঘাটতি এবং উচ্চ মূল্য দুটোই বিরাট চ্যালেঞ্জ। ডব্লিউএফপি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলছে। ডব্লিউএফপি ২০১৯ সালে ৮৮ দেশে তাদের ৫৬০০টি ট্রাক এবং ৩০টি জাহাজের মাধ্যমে ৯ কোটি ৭০ লাখ পরিবারের মাঝে ৯.১৫ বিলিয়ন ডলারের খাদ্য সহায়তা প্রদান করেছে।

খাদ্যের সঠিক ব্যবহার খাদ্য নিরাপত্তার তৃতীয় স্তম্ভ। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য দরকার সঠিক পুষ্টিজ্ঞান এবং খাদ্যাভ্যাস। পারিবারিক পর্যায়ে খাদ্য বাছাই, পুষ্টিমান বজায় রেখে প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ, সামাজিক পর্যায়ে পুষ্টিকর খাবার সহজলভ্যকরণ এবং বৈচিত্র্যানয়নের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারে খাদ্য নিরাপত্তার তৃতীয় এই স্তম্ভ। ভাতে বাঙালির খাদ্য তালিকায় শর্করার আধিক্য ছিল চিরকালের। অর্থনীতি আর জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে খাদ্যাভ্যাসেও। শস্য বহুমুখীকরণ, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন, দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথ ধরে আমিষজাত খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগোচ্ছে সঠিক পথেই। এই উন্নয়ন যাত্রায় ডব্লিউএফপি বাংলাদেশের অন্যতম অংশীদার।

টেকসই খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার খাদ্য নিরাপত্তার চতুর্থ স্তম্ভ। যেকোনো মহামারির ন্যায় করোনা সংক্রমণও আঘাত এনেছে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার ওপর। করোনার প্রাদুর্ভাবের একেবারে শুরুর দিকে গত এপ্রিলে এক নিবন্ধে ডব্লিউএফপি আশঙ্কা করেছিল, ‘করোনার প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা উন্নয়নশীল অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে, যা দেশগুলোর টেকসই খাদ্য ব্যবস্থাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।’ হয়েছেও তাই। অপরাপর উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও এখনো গড়ে উঠেনি টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা। অধারাবাহিক দ্রব্যমূল্য, অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা, খাদ্যের অপচয় ও ক্ষতি, উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকার এসবই বাংলাদেশে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার অন্তরায় হয়ে আছে। কৃষি ও শিল্প খাতে বরাদ্দকৃত প্রণোদনার সুষ্ঠু বণ্টন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে শ্রমঘন শিল্প স্থাপনের কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ন্যায় বাহ্যিক ঝুঁকি হ্রাসকরণ, জমি, মাটি এবং জলের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারই নিশ্চিত করতে পারে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা। বাংলাদেশ তথা বিশ্বের প্রতিটি খাদ্য সংকটাপন্ন এলাকায় কাজ করে যাচ্ছে ডব্লিউএফপি। বছরের পর বছর ধরে।

১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জাতিসংঘের এই সংস্থা ক্ষুধাকে জয় করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। যুদ্ধ-সংঘর্ষিত অঞ্চলে নিরীহ ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে থেকে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ে খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার মতো অভিনব কর্মসূচি তাদেরই সৃষ্টি। সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে যুদ্ধ ও সংঘাতের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে না দিয়ে বিশ্বে শান্তি স্থাপনে তাদের অবদান অনন্য। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন তাদের অবদানকে মহিমান্বিত করেছে।

২০২০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে অনেক অনেক অভিনন্দন।

লেখক : জেলা প্রশাসক, মেহেরপুর

[email protected]

 

 

"