দৃষ্টিপাত

শেখ হাসিনার চার দশকের রাজনীতি

মাহবুবুল আলম

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে এসে দেখলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য ও কান্ডারীবিহীন। দলের ভেতর বিভিন্ন উপদল ও বিভেদে জর্জরিত একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার পরপরই শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। তাকে বারবার কারান্তরীণ করা হয়। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সামরিক সরকার তাকে আটক করে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং নভেম্বর মাসে তাকে দুবার গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ তাকে আটক করে প্রায় ৩ মাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি ১৫ দিন গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৮৭ সালে ১১ নভেম্বর তাকে গ্রেফতার করে এক মাস অন্তরীণ রাখা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা

গ্রেফতার হয়ে গৃহবন্দি হন। ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনা ৩টি সংসদীয় আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালে ২৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়।

১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পরই দেশ থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহার করে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। শেখ হাসিনা নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং এই আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। স্বৈরাচার এরশাদ শাহীর পতনের পর ১৯৯১ সালের সংসদীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। তবে সেই নির্বাচনে তিনি সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করেন। এ নিয়ে দলের ভেতর ও বাইরের একটি কুচক্রীমহল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। তাই শেখ হাসিনা দলের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তার গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ে এবং পদত্যাগের ঘোষণা প্রত্যাহারের দাবিতে অনড় থাকে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মীদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা প্রত্যাহার করে নেন।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির ভোটারবিহীন নির্বাচনের বিরুদ্ধে তিনি গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের মুখে ৩০ মার্চ তৎকালীন খালেদা জিয়ার সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি প্রথম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। তার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সে বছরের ১২ জুনের সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। এ সময়ে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে যায়। দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সফল নেতৃত্ব দেন। এ সময়ে তিনি মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রেখে কৃষিক্ষেত্রে উচ্চপ্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে দেশের গরিব-দুঃখী মেহনতী মানষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেন। তার প্রথম শাসনামলে ১৯৯৮ সালে দেশে ভয়াবহ বন্যা হয়। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা অনুমান করেছিল বাংলাদেশের এই বন্যায় ২ কোটি লোক না খেয়ে মারা যাবে। কিন্তু শেখ হাসিনার অবিচল ও সাহসী নেতৃত্বে দেশ মারাত্মক কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বগুণে সে যাত্রায় দেশ রক্ষা পায় এবং প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান। দেশে প্রথমবারের মতো বয়স্কভাতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা চালু করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াতের তীব্র বিরোধিতা হরতাল ধর্মঘটসহ না বিশৃঙ্খলা মোকাবিলা করে শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে শুরু হয় পর্দার অন্তরালে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র। তার ফলে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তার দল আওয়ামী লীগ পরাজয় বরণ করে। ২০০১ সালের কারচুপি, ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসীপন্থায় বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসে সহিংস নির্যাতন, লুটপাট, নারী ধর্ষণ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর বিনাশী আক্রমণ চালিয়ে গণতন্ত্রকে বিপন্ন, বিপর্যস্ত এবং মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। দেশে শুরু হয় ত্রাসের রাজত্ব। আওয়ামী লীগবিরোধী সরকার শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ১৯ বার তার ওপর আঘাত হানে। সবচে ভায়াবহ হামলাটি হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট।

২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে নানা তালবাহানা ও ছলচাতুরীর আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের বশংবদ ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানাতে সংবিধান লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টাকে নিয়োগ দিলে শেখ হাসিনা এর বিরুদ্ধে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেন। যার ফলে ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সামরিক নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, মিথ্যা মামলায় শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘদিন কারাবাসে থেকেও কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করেননি শেখ হাসিনা। ওই সময় ভয়ভীতি ও ষড়যন্ত্রে অনেক নেতা পথভ্রষ্ট হওয়ার উপক্রম হলেও জেলে থেকেও সফল দিকনির্দেশনা দিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হন। শেখ হাসিনার এই অবিচল ও সাহসী নেতৃত্ব আর জনগণের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের কারণেই ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দেশের জনগণ ইতিহাসের সর্ববৃহৎ তিন-চতুর্থাংশ আসনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করে প্রধানমন্ত্রী করেন শেখ হাসিনাকে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এবং বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করা জন্য ভিষন ২০২১-এর ঘোষণা দেন। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশকে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে নিতে থাকেন। তার শাসনামলে ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সিটমহল বিনিময় চুক্তি, মিয়ানমার ও ভারতের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সমুদ্রসীমা আদায়, নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দেন। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করে চতুর্থবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশকে সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

পরিশেষে বলতে চাই, শেখ হাসিনা একজন অনুসরণীয় প্রধানমন্ত্রী। যার কারণে আজ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে। বাংলাদেশকে তিনি এনে দিয়েছেন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এবং উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা। শেখ হাসিনার শাসনামলেই বাংলাদেশের সিংহভাগ আর্থসামাজিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। তিনি জীবনে যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন সমসাময়িক রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে এমন দৃষ্টান্ত আর কারো নেই। তার সাহসী ও নির্ভীক নেতৃত্বগুণে সব বাধা অতিক্রম করে দেশ সামগ্রিক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ এই মহান নেতার ৭৪তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে জানাই নিরন্তর শুভেচ্ছা।

লেখক : কবি-কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক

[email protected]

 

 

 

"