ইসমাইল মাহমুদ
অনুসন্ধান
‘মাকাল’ আসলে মাকাল নয়

আবহমান বাংলার গ্রামগঞ্জে অন্তঃসারশূন্য বা অকর্মঠ মানুষকে ‘মাকাল ফল’ নামে ডাকা হয়। বলা হয় ‘মাকাল ফল দেখতে ভালো, তবে এর ভেতরটা কালো’। টু টু করে ঘুরে বেড়ানো মানুষকেও বলা হয়ে থাকে ‘সে কোনো কাজেরই নয়Ñ সে একটি মাকাল ফল’। ‘মাকাল ফল’ প্রবাদটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। তবে বর্তমান প্রজন্মের বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক অনেকের ভেতরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায় আসলে কি ‘মাকাল ফল’ নামে কোনো ফল আছে? নাকি এটি নিছক কথার কথা। আসলেই কিন্তু আমাদের দেশে ‘মাকাল ফল’ নামে একটি ফল রয়েছে। উদ্যান তত্ত্ববিদদের মতে, মাকাল ফল একটি অন্তঃসারশূন্য ফল হলেও এটি একটি উপকারী ভেষজ এবং পরিবেশবান্ধব বিষ। এক সময় আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জের ঝোপ-জঙ্গলে প্রচুর পরিমাণে মাকাল ফলের গাছ দেখা যেত। বর্তমানে দেশে বন-জঙ্গলের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ায় মাকাল ফলের গাছ খুব একটা দেখা যায় না। ‘মাকাল ফল’ এখন অনেকটা বিলুপ্তপ্রায়।
সম্প্রতি পত্রিকার সংবাদ সংগ্রহের কাজে ফটোসাংবাদিক মাহফুজ সুমন এবং পর্যটনবিষয়ক কলাম লেখক শ্যামল দেববর্মাকে নিয়ে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাধানগর পাহাড়ে যাই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত রাধানগরের নিসর্গ নীরব ইকো-কটেজে যাত্রাবিরতিকালে কটেজের মূল ভবনের সামনের একটি গাছে লাল রঙের মনোমুগ্ধকর ডিম্বাকৃতির ফল দেখে কটেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী শামসুল হককে এ ফলটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি এটি ‘মাকাল ফল’ বলে আমাদের জানান। ফলটির পরিচয় জানার পর মাহফুজ সুমন দ্রুত ছবি তুলতে শুরু করেন। শহরে ফিরে এসে ফলটির সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য বৃক্ষবিশারদদের দ্বারস্থ হই। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংগ্রহ করি বেশকিছু তথ্য। আসুন উদ্যান তত্ত্ববিদদের মতে অন্তঃসারশূন্য ফল মাকালের বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-
বাংলায় ফলটির নাম মাকাল ফল। ইংরেজিতে এটির নাম Colocynth, Cucumber. Gi wØc`x bvg Citrullus colocynthis (L.) Schrad. বৈজ্ঞানিক নাম ‘সিট রুলুস কোলো সিন্থিস’। এ ফলটিকে আরবিতে ‘হানজাল’, সংস্কৃতে ‘দেব দালিকা’ এবং হিন্দিতে ‘ইন্দ্রায়ন’ বলা হয়। উদ্যান তত্ত্ববিদ ‘উইলিয়াম মিথিউস’ মাকাল ফলকে অন্তঃসারশূন্য ফল বলে অভিহিত করেছেন। ‘মাকাল ফল’ নিয়ে আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি গল্প প্রচলিত আছে। প্রবাদটি হলোÑ ‘এক সুন্দরী গৃহবধূ রাতের আঁধারে পারিবারিক কলহের জেরে তার শাশুড়িকে বিষ প্রয়োগে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন। শাশুড়িকে খাবারের সঙ্গে বিষ প্রয়োগের পর দুর্ভাগ্যক্রমে ওই বিষ মাখানো খাবার ওই গৃহবধূকেও খেতে হয়। ফলে বিষক্রিয়ায় বউ-শাশুড়ি দুজনেই মারা যান। মারা যাওয়ার আগেই মৃত্যুপথযাত্রী শাশুড়ি বিষ প্রয়োগে হত্যার জন্য পুত্রবধূকে অভিশাপ দেন। ওই অভিশাপেই মৃত্যুর পর গৃহবধূ মাকাল ফলে পরিণত হয়।’ সুন্দরী গৃহবধূর বাহ্যিক রূপ অপরূপ হলেও তার অন্তর ছিল কালিমাময়। এ কারণেই নাকি মাকাল ফলের বাইরের রূপ মনমাতানো লাল আকৃতির হলেও ভেতরটি কুঁচকুঁচে কালো। মাকাল ফলের গাছ লতানো আকৃতির হয়। এটি একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। মাকাল ফলের গাছ জঙ্গল বা বাড়ির বড় বড় গাছকে আশ্রয় করে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। একটি পরিপূর্ণ মাকাল ফলের গাছ লম্বায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। মাকাল ফল গাছের পাতা অনেকটা মানুষের হাতের তালুর মতো। প্রতিটি পাতায় থাকে অনেকগুলো খাঁজ। গাছের প্রতিটি পর্ব থেকে একটি করে পাতা ও আকর্ষি বের হয়। এই আকর্ষির সাহায্যে মাকাল ফলের গাছ অন্য গাছকে জড়িয়ে ধরে রাখে। পাতার কক্ষে ফুটে সাদা রঙের ফুল। মাকাল ফল দেখতে অনেকটা ডিমের মতো। যদিও ডিম থেকে এর আকার অনেক বড় হয়। মাকাল ফল কাঁচা অবস্থায় গাঢ় সবুজ, কিছুদিন পর হলুদ ও ফলটি পাকলে লাল বর্ণ ধারণ করে। বর্ষাকালে সাধারণত মাকাল ফলের ফুল ও ফল হয়।
বাইরের চাকচিক্য যতই থাকুক না কেন ভেতরটা অন্তঃসারশূন্য এমন অর্থ বোঝাতে ‘মাকাল ফল’ প্রবচনটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাস্তবে মাকাল ফল ও গাছের বেশ কিছু ভেষজ গুণও আছে। মাকাল গাছের শিকড় কোষ্ঠকাঠিন্য ও বদহজমের ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে। কফ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে মাকাল কাজে লাগে। নাক ও কানের ক্ষত উপশমে মাকাল গাছ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জন্ডিস নিরাময়, দেহে কোনো কারণে পানি জমলে অর্থাৎ শ্লোথ রোগে দেহ থেকে পানি দূর করতে, স্তনের প্রদাহ, প্র¯্রাবের সমস্যা, বাত-ব্যথা, কাশি, পেট বড় হয়ে যাওয়া এবং শিশুদের অ্যাজমা নিরাময়ে মাকাল গাছের ফল-মূল-কান্ড বিশেষ ভূমিকা পালন করে। মাকাল ফলের বীজের তেল সাপের কামড়, বিছার কামড়, পেটের সমস্যা (আমাশয়, ডায়রিয়া), মৃগীরোগ এবং সাবান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যায়। এছাড়া মাকাল ফলের বীজের তেল চুলের বৃদ্ধি ও চুল কালো করতে কার্যকর। ব্রিটিশ ফার্মাকোপিয়াতে মাকাল ফল ও গাছের ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে। পৃথিবীতে এই জেনাসের ৪২টি প্রজাতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে দেখতে পাওয়া যায় প্রায় ১২টি প্রজাতি। মাকাল ফলের জন্মস্থান সম্পর্কে বৃক্ষ গবেষকরা জানান, এ গাছটির জন্মস্থান তুর্কী। তুর্কী থেকে এশিয়া মহাদেশ ও আফ্রিকা মহাদেশে এ গাছটির বিস্তার লাভ করে। মাকাল ফলের গাছ প্রাকৃতিকভাবে বন-জঙ্গলে ও পরিত্যক্ত জায়গায় জন্মায়। বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইল জেলার জঙ্গলে এই গাছ অধিক পরিমাণে দেখা যায়। তবে গত একযুগ আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে মাকাল ফলের গাছ দেখা যেত। এক যুগের ব্যবধানে তা হ্রাস পেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে ১০ ভাগের এক ভাগে। এ অবস্থা চলমান থাকলে আগামী দশকে এদেশ থেকে মাকাল ফল চিরতরে হারিয়ে যাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট
"




































