এম এ মাসুদ

  ০৫ ডিসেম্বর, ২০২১

মানবিক কারণে হলেও অনুপাত প্রথার বাস্তবায়ন জরুরি

জাতীয় জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আর তাই তো বলা হয়ে থাকে 'শিক্ষাই জাতীর মেরুদণ্ড।' যদি তাই হয় তবে শিক্ষা নামক সেই মেরুদণ্ডের স্রষ্টার দাবিদার নিশ্চয়ই শিক্ষকগণ। নৈতিকতার বিচারে শিক্ষকরা সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি। তারাই মানুষ গড়ার কারিগর। দুনিয়ায় যারাই মহৎ হয়েছেন বা উচ্চতর পদে সমাসীন হয়েছেন তারা কোনো না কোনো শিক্ষকের নিকট জ্ঞানার্জন করেছেন। সেই বিচারে সম্মানজনক পেশাগুলোর মধ্যে শিক্ষকতা অন্যতম একটি মহৎ পেশা। তবে পেশা হিসেবে শুধু মহৎ হলেই তো চলবে না, সাথে প্রয়োজন যথাযথ মর্যাদা ও তাদের পদোন্নতি।

জনবল কাঠামো ১৯৯৫ নীতিমালায় বেসরকারি কলেজ, কারিগরি কলেজ ও মাদ্রাসার প্রভাষকদের ৮ বছরে ৫:২ অনুপাতে অর্থাৎ, প্রতি ৭ জনে ২ জন প্রভাষক সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতেন। সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি বঞ্চিত অন্যান্য প্রভাষকগণ এমপিওভূক্তির ২ বছর পর ৮ম গ্রেড এবং ৮ বছর পর ৭ম গ্রেড পেয়ে একটু হলেও স্বস্তি পেতেন। এরপর ২০১০ নীতিমালায় প্রভাষকগণের ২ বছর পূর্তিতে ৯ম গ্রেড থেকে ৮ম গ্রেড প্রাপ্তির বিষয়টি পরিবর্তন করে ৮ বছর পূর্তিতে ৭ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়। এমপিওভূক্তির ৮ বছর হতে যাওয়া প্রভাষকগণ তবুও আশার আলো দেখছিলেন। কিন্তু ২০১৮ এর নীতিমালায় দুই বছর বাড়িয়ে ৮ বছরের পরিবর্তে ১০ বছরে ৯ম গ্রেড থেকে ৮ম গ্রেড পদোন্নতি অর্থাৎ ১০০০ টাকা বৃদ্ধির ধারাটি অন্তর্ভূক্ত করায় প্রভাষকগণের শেষ আশাটুকুও নিরাশায় পরিণত হয়। আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন তারা। অনুপাত প্রথার কারণে অধিকাংশ প্রভাষকগণকে প্রভাষক পদবি নিয়েই অবসরে যেতে হয়েছে বা হচ্ছে। এমনও দেখা গেছে, যে প্রভাষক ছাত্রকে পড়িয়েছেন ওই ছাত্রই নতুন কলেজ বা মাদ্রাসায় ঢুকে সহকারী অধ্যাপক হয়েছেন, যা ওই শিক্ষকের জন্য বিব্রতকর।

এ জন্য বেসরকারি কলেজ, কারিগরি কলেজ ও মাদ্রাসার প্রভাষকগণ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দাবি করে আসছেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৫:২ অনুপাত প্রথার বিলুপ্ত করে শতভাগ পদোন্নতির ব্যবস্থা করা।

অবশেষে গতবছরের ২৩ নভেম্বর ২০২০ সংশোধিত এমপিও নীতিমালা (মাদ্রাসা)য় কর্মরত প্রভাষকগণের ৮ বছর পুর্তিতে ১:১ অনুপাতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে আলিম মাদ্রাসায় জ্যেষ্ঠ প্রভাষক এবং ফাজিল, কামিল মাদ্রাসায় সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির বিধান রেখে নীতিমালা জারি করা হয়। ওই নীতিমালা জারির এক বছর পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়নে নেই কোনো পদক্ষেপ। নীতিমালা জারির দীর্ঘদিন পর গত ৫ অক্টোবর মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাষকগণের পদোন্নতির বিষয়টি স্পষ্টিকরণের জন্য কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সচিব বরাবর চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়, মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত প্রভাষকদের ৮ বছর পূর্তিতে ৫০% হিসেবে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ সাপেক্ষে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নীতিমালার ১১.৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে এমপিওভুক্ত প্রভাষকগণ এমপিওভুক্তির ৮ বছর পূর্তিতে ৫০% হিসেবে অনুচ্ছেদ ১৩ অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাবেন। এতে মোট পদসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে না। একই নীতিমালার পরিশিষ্ট 'ঘ' এর ১১ নং ক্রমিকে আলিম মাদ্রাসার জন্য জ্যেষ্ঠ প্রভাষকের কথা বলা আছে এবং পদোন্নতির শর্ত হিসেবে এমপিওভুক্ত পদে ৮ বছরের অভিজ্ঞতার কথা বলা আছে। ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে যা শর্ত আলিম মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদোন্নতির ক্ষেত্রেও একই শর্ত রয়েছে এবং উভয় পদের বেতন গ্রেড-০৬। একই নীতিমালা রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের প্রভাষকগণ পদোন্নতি পেয়ে হবেন জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ও ডিগ্রী কলেজের প্রভাষকগণ পদোন্নতি পেয়ে হবেন সহকারী অধ্যাপক এবং পদবীর নামে ভিন্নতা থাকলেও উভয় পদের বেতন কোড হবে-০৬। দেখেছি আলিম মাদ্রাসায় ৫:২ অনুযায়ী ইতোমধ্যে যারা জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন তাদের এমপিও সীটে বেতন কোড হয়েছে-০৬। এ নিয়ে দীর্ঘদিন পর আবার স্পষ্টিকরণের চিঠির বিষয়টি শিক্ষকগণের বোধগম্য নয়। আজ দু'মাস অতিবাহিত হলেও স্পষ্টিকরণের বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়েছে বলে কী না তাও জানতে পারেননি প্রভাষকগণ।

এছাড়া, গত ২৮ মার্চ প্রকাশিত স্কুল-কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে এমপিওভুক্ত প্রভাষকগণ প্রভাষক পদে এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে ৮ বছর চাকরি পুর্তিতে মোট পদের ৫০% নির্ধারিত বিভিন্ন সূচকে মোট ১০০ নম্বরের মূল্যায়নের ভিত্তিতে 'জ্যেষ্ঠ প্রভাষক' (উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ) এবং সহকারী অধ্যাপক( ডিগ্রী কলেজ) পদে পদোন্নতি পাবেন। কলেজের প্রভাষকগণের পদোন্নতির বিষয়টি চূড়ান্ত করতে বার বার মিটিং হচ্ছে বটে কিন্তু তা আর আলোর মুখ দেখছে না।

প্রভাষকগণের ৫০% পদোন্নতি নিয়ে সময়ক্ষেপণে কলেজ, কারিগরি কলেজ ও মাদ্রাসার প্রভাষকদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা আর ফেলছেন দীর্ঘশ্বাস। কারণ বয়স তো আর ফ্রেমে আটকানো যায় না! তাছাড়া বর্তমান দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ, সন্তানদের উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন, সামাজিকতা রক্ষা করতে গিয়ে হিমসিম খেতে হচ্ছে প্রভাষকগণকে। জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছেন তারা ঋণে। যা বেতন-ভাতা বন্টনকারি ব্যাংকসমূহের তথ্য থেকে জানা যায়। এভাবে অভাব আর অনটনের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন পাঠদানের মতো মহান দায়িত্বে নিয়োজিত মানুষ গড়ার কারিগরগণ।

যা হোক, বর্তমান সরকার শিক্ষার মানোন্নয়নে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। আশাকরি প্রভাষকগণের ৫০ শতাংশ পদোন্নতির বিষয়টিও খুব দ্রুতই বাস্তবায়ন হবে। শুধু এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা। যদিও বা পদোন্নতি

করণা নয়, তাদের অধিকার, তথাপি মানবিক কারণে হলেও প্রভাষকগণের পদোন্নতির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা আবশ্যক। আর বাস্তবায়ন হলে বাড়বে শিক্ষার মান আর পরিবারপরিজন নিয়ে ভালথাকবেন মানুষ গড়ার কারিগরগণ।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মানবিক,অনুপাত প্রথা
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close