ইসমাইল মাহমুদ

  ১১ এপ্রিল, ২০২১

শিশু সুরক্ষায় দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে

প্রতীকী ছবি

গত ৫ এপ্রিল রাত ১০টায় খুলনার তেরখাদা উপজেলার আড়াকান্দি গ্রামে মাত্র ৫ বয়স বয়সি তানিশা আক্তার নামে এক শিশুকে ঘুমন্ত অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে তার সৎমা মুক্তা খাতুন। পারিবারিক কলহের কারণে নিহত তানিশার মা তাসলিমার সঙ্গে তার পিতা আনসার ব্যাটালিয়নে কর্মরত খাজা শেখের প্রায় দেড় বছর আগে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর খাজা শেখ মুক্তা খাতুনকে বিয়ে করেন। শিশু তানিশা কিছুদিন মা ও কিছু দিন বাবার বাড়িতে বসবাস করত। তানিশার বাবার বাড়িতে আসা সৎমা মুক্তা খাতুন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। সম্প্রতি তানিশা বাবার বাড়িতে এলে ৫ এপ্রিল ঘুমন্ত শিশু তানিশাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে মুক্তা খাতুন। পুলিশ ঘাতক মুক্তা খাতুনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। এর আগে গত ২৮ মার্চ সাভারের আশুলিয়ায় ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে না পেয়ে বঙ্গবন্ধু রোডের চৌরাস্তা এলাকার বাড়ির মালিক আবুল কালাম আজাদ মাতব্বরের ১০ বছর বয়সি ছেলে স্থানীয় হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজাকে হত্যা করে ভাড়াটিয়া পাবনার সুজানগর থানার ভাতশালা গ্রামের তফিজ উদ্দিনের ছেলে আরিফুল ইসলাম। হত্যাকা-ের পর ভাড়াটিয়া আরিফুল ইসলাম পালিয়ে গেলেও তার স্ত্রী লিজা আক্তারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এদিকে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ছালিয়াকান্দি গ্রামের ফারুক মিয়ার শিশুপুত্র আবদুর রহমান গত ২০ ফেব্রুয়ারি নিজ বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় অপহরণের শিকার হয়। রহমানকে অপহরণের সময় অপহারণকারীরা তার বাবার মোবাইল ফোনটিও নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ফারুক মিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। অপহরণের ঘটনার কিছু দিন পর অপহরণকারীরা ফারুক মিয়ার ওই মোবাইল ফোন থেকে তার স্ত্রীর নম্বরে ফোন করে মুক্তিপণ হিসেবে ৫০ লাখ টাকা দাবি করে। গত ২৯ মার্চ রাত ৮টার দিকে মুরাদনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর আবিদুর রহমানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ছদ্মবেশে মুক্তিপণের টাকা দিতে বাখরাবাদ এলাকায় অপহরণ চক্রের দেওয়া ঠিকানায় যান। সেখানে টাকা নিতে আসে অপহরণকারী চক্রের সদস্য ময়নাল মিয়া। টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ ময়নালকে ধরে ফেললে তার সহযোগীরা লাঠি দিয়ে এসআই হামিদুল ইসলাম ও এসআই সাইফুল ইসলামকে আঘাত করেন। তবে ময়নাল পালাতে পারেনি। ওই রাতে ময়নাল মিয়ার তথ্যমতে, গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের অপরাপর সদস্য শিশু আবদুর রহমানের ফুফা নাজমুল হাসান ও রবিউল হাসানকে। তাদের তথ্য মতে, একই রাতে উপজেলার ছালিয়াকান্দি ইউনিয়নের বোড়ারচর গ্রামে ময়নাল মিয়ার ফসলি জমি থেকে শিশু আব্দুর রহমানের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

শুধু খুলনার তানিশা, সাভারের রাজা, মুরাদনগরের আবদুর রহমান নয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভয়ানক নিষ্ঠুরতায় মারা গেছে একাধিক শিশু। একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটছে আরেকটি বীভৎস ঘটনা। একের পর এক এমন নিষ্ঠুর ও বীভৎস ঘটনায় ক্ষুব্ধ, হতবিহ্বল অভিভাবকরা।

দুই : দেশের সচেতন মানুষ, মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, দেশে মাদকের বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয়, দ্রুত সুবিচার নিশ্চিত না হওয়া এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারায় একের পর এক বীভৎসতার শিকার হচ্ছে শিশুরা। তাদের মতে, এখনই শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রণয়ন, বিদ্যমান আইনের দ্রুত ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া পারিবারিক, সামাজিক অস্থিরতা এবং অসতর্কতা নিরসনে সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। তবেই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি অনেকটা রোধ করা যাবে।

তিন : শিশু হত্যাসহ শিশু নির্যাতনের সার্বিক পরিসংখ্যান আঁতকে ওঠার মতো। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্য মতে, ২০২০ সালের প্রতি মাসে অন্তত ৪০৮ শিশু নানা ধরনের নিষ্ঠুর অপরাধের শিকার হয়। সে হিসেবে দিনে অন্তত ১৪ শিশু নানা নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। তবে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য মতে, এগুলো বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরিকৃত পরিসংখ্যান। ওই পরিসংখ্যানের বাইরেও শিশু নির্যাতনের অনেক ঘটনা রয়েছে; যা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে গেছে।

এদিকে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) নামের আরেকটি বেসরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্য মতে, গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, হত্যা, অপহরণ, নিখোঁজ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে ১৪৫ শিশু। করোনাকালীন গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় সাত মেয়েশিশু নির্যাতনের শিকার হয়। এই সাতজনের মধ্যে মারা যায় তিনজন। বাকি চারজন অনেকটা পঙ্গুত্ব অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া ওই বছরে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১৯২ শিশু নিহত হয়েছে; যার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৫৮ শিশু ও পানিতে ডুবে মারা গেছে ১৬৫ শিশু। ওই সংগঠনের তথ্য, ২০২০ সালে ১ হাজার ৫২১টি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মেয়েশিশু ১ হাজার ৮৮ আর ছেলেশিশুর সংখ্যা ৪৩৩। নির্যাতনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৬২৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে ১৪ শিশু। ওই সময়ে নিখোঁজ ও অপহরণের শিকার হয়েছে ২৯ শিশু। বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ১০১ শিশু। ২০২০ সালে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশুরাই ধর্ষণের শিকার হয়েছে বেশি। এরপর রয়েছে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশু। শিশুদের চকলেট বা খাবারের লোভ দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে, মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে এবং ঘরে একা পেয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। এমনকি করোনাকালীন ত্রাণ দেওয়ার কথা বলেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

চার : শিশুদের প্রতি বীভৎসতা, অমানবিক নির্যাতন, নিষ্ঠুরতা বা পাশবিকতার একটি অন্যতম কারণ অপরাধীরা মনে করছে শিশুদের আত্মনিয়ন্ত্রণ নেই বা অপরাধের শিকার হলেও তারা প্রতিবাদ করতে পারবে না। শিশুরা ধর্ষণের শিকার হলেও সামাজিক আতঙ্কে বা লোকলজ্জার ভয়ে অনেক সময় অভিভাবকরা মুখ খোলেন না। এর ফলে অপরাধী দিন দিন বেপরোয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সাইবার প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ ও এর অপব্যবহারে কারো কারো মধ্যে বিকৃত মানসিকতা দেখা দিচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর এমনটাই মনে করছেন মানবাধিকারকর্মী ও সমাজসচেতন ব্যক্তিরা।

পাঁচ : শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় কৌশলগুলো নিশ্চিত করতে হবে। শিশু হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, নির্যাতন রোধ করতে শিশুদের আলাদা অধিদপ্তর আমাদের দরকার। শিশু নির্যাতনের প্রতিটি জায়গায় দেখা যায়, এটি সামাজিক সমস্যা। শুধু আইন দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। সামাজিকভাবেই এটি মোকাবিলা করতে হবে। সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে নিয়েই কাজ করতে হবে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের দেশের সংগঠিত শিশু নির্যাতন, শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যা অনেক সময় পারিবারিক পরিমন্ডলে পরিচিতদের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়েছে। এ কারণে আরো অধিক সচেতন হতে হবে অভিভাবকদের। সেই সঙ্গে শিশু রক্ষায় নিয়োজিত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আরো বেশি দায়িত্ববান হওয়ার পাশাপাশি শিশু অধিকার রক্ষায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
শিশু সুরক্ষা,শিশু নির্যাতন,মুক্তমত
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close