মো. জিল্লুর রহমান

  ০৮ এপ্রিল, ২০২১

যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন আবশ্যক

যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনোক্রমেই সফলতা আসছে না। সামাজিক এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। গ্রাম থেকে শহরে, উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সর্বত্রই এই ব্যাধির প্রকোপ। আসলে মানুষের প্রচন্ড অর্থের লোভ-লালসা থেকেই যৌতুকপ্রথার সৃষ্টি। দারিদ্র্য ও স্বল্প সময়ে অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার কামনাও যৌতুকপ্রথা বৃদ্ধি হওয়ার কারণগুলোর একটি অন্যতম বড় কারণ। বেকারত্ব, বাল্যবিয়ে, নারীর কালো চেহারা, সামাজিক হতাশা এবং সঠিক নৈতিক শিক্ষার সংকটেও যৌতুকের প্রসার এতটা ভয়াবহতায় পৌঁছাচ্ছে। এ ছাড়া কুসংস্কারে আচ্ছন্নতা ও উচ্চভিলাষী মনমানসিকতাও এর কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যৌতুকের বলি হয়ে কত মা-বাবা তার আদরের মেয়েকে হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এ কারণে যৌতুকের লাগাম এখনই টেনে ধরতে না পারলে ভয়ংকর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

সাধারণ অর্থে যৌতুক বলতে বিয়ের সময় বরকে কনের অভিভাবক কর্তৃক প্রদেয় অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রীকে বোঝায়। ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধক আইন অনুসারে ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যদি কোনো পক্ষ অপর পক্ষকে বিয়ের আগে পরে চলাকালীন যেকোনো সময় যেকোনো সম্পদ বা মূল্যবান জামানত হস্তান্তর করে বা করতে সম্মত হয়, সেটাই যৌতুক বলে বিবেচ্য হবে।’ তবে বিয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নন এমন কেউ ৫০০ টাকা বা তার চেয়ে কম মূল্যমানের কোনো বস্তু উপহার হিসেবে কোনো পক্ষকে দিলে তা যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হবে না। তবে বিয়ের শর্ত হিসেবে এই সমপরিমাণ কোনো কিছু আদান-প্রদান করলে তা যৌতুক হিসাবে বিবেচিত হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুসারে বিয়ে স্থির থাকার শর্ত হিসেবে বা বিয়ের পণ হিসাবে প্রদত্ত অর্থ বা সম্পদ যৌতুক হিসাবে বিবেচিত হবে। প্রচলিত আইনে যৌতুক দেওয়া বা নেওয়া উভয়ই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা অথবা উভয় দ হতে পারে। যৌতুক দাবি করার জন্যও একই সাজা হতে পারে। আইনে অনেক কিছু থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন খুবই কম এবং এ কারণে যৌতুকের থাবা কিছুতেই থামছে না।

ইসলামে সুদ, ঘুষকে যেমন হারাম ঘোষণা করা হয়েছে তেমনিভাবে যৌতুককেও হারাম বলে সাবধান করা হয়েছে। নারীরা মায়ের জাতি, অসামান্য সম্মানের দাবিদার। নারী কোনো সস্তা পণ্য নয় যে, তাকে নিয়ে দরদাম করা হবে, নিলামে তোলা হবে। ইসলামে মূলত বিবাহ হচ্ছে আল্লাহর একটি হুকুম ও নেয়ামত এবং এর মাধ্যমে মানুষ তাদের প্রাকৃতিক চাহিদা বৈধপন্থায় পূর্ণ করে। পারিবারিক জীবনে প্রশান্তি লাভ করে এবং বৈধভাবে সন্তান জন্মদান করে। এজন্যই মহানবি (সা.) স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে সক্ষম সব যুবককে বিবাহের নির্দেশ দিয়েছেন, বৈরাগ্য জীবনযাপনকে নিষেধ করেছেন অথচ বর্তমান সমাজে এর সম্পূর্ণ উল্টো যৌতুক নামক এক দানব বিবাহের মতো একটি পবিত্র কাজকে বিভীষিকাময় করে তুলছে। ইসলামে পুরুষের ওপর বিবাহের সময় স্ত্রীদের জন্য মোহরানা দেওয়া ফরজ করেছে। কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘সুতরাং তোমরা তাদেরকে তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে বিবাহ করো এবং ন্যায়সংগতভাবে তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও (সুরা নিসা, আয়াত ২৫)।’ তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিয়ের ক্ষেত্রে বিয়ের মোহরানা যৌতুক হিসাবে বিবেচিত হয় না। বাংলাদেশের সমাজে যৌতুকের জন্য নারীর প্রতি অসম্মান ও অত্যাচারের অনেক ঘটনা ঘটে। এমনকি যৌতুকের দাবিতে স্বামী বা তার আত্মীয়স্বজনদের দ্বারা অত্যাচারের পর হত্যাকাে র ঘটনাও কম নয়।

তবে হিন্দু সমাজে নারীরা পুরুষ আত্মীয়ের কাছ থেকে পুরুষ উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে যুগপৎ সম্পত্তি লাভ করতে পারত না বিধায় স্মরণাতীত কাল থেকে সমাজে যৌতুক দেওয়ার প্রচলন গড়ে উঠে। কিন্তু কালক্রমে যৌতুক বিয়ের পণ হিসেবে কনের বাবা-মা বা অভিভাবকের কাছ থেকে বর ও তার স্বজনদের নগদ অর্থ বা সামগ্রী কিংবা উভয়বিধ আকারে সম্পত্তি আদায়ের এক গুরুভার ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয় এবং প্রথমে তা হিন্দু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজে গড়ে উঠে। উপনিবেশিক আমলে ক্রমবর্ধমান যৌতুক সমস্যার রাশ টেনে ধরার বা যৌতুক নিরুৎসাহিত করার কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তবে ব্যতিক্রম শুধু এই যে, এ সময় সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার আইন ১৯৩৭ পাস করা হয়েছিল। সেই আইনে একজন হিন্দু বিধবাকে তার মৃত স্বামীর সম্পত্তি পুত্রসন্তান যতটুকু পাবে তার সমপরিমাণ অংশ পাওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। তবে সে অধিকারও ছিল সীমিত এবং তা নিরঙ্কুশ কোনো অধিকার ছিল না। অবশ্য ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর স্বাধীন দেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ১৯৫৭-তে সনাতন উত্তরাধিকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া হয় এবং তখন হিন্দু সমাজে মৃত ব্যক্তির পুত্র ও কন্যারা পিতা বা মাতার সম্পত্তির সমান অংশ পাওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু এমন বিধান থাকা সত্ত্বেও ভারতে যৌতুক প্রথার অভিশাপ তিরোহিত হয়নি। সে কারণে ভারত সরকার বিবাহের পণ হিসেবে বিয়ের আগে বা পরে কিংবা বিয়ের সময় যৌতুক দাবি করা বা গ্রহণ করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করে যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন ১৯৬১ বিধিবদ্ধ করতে বাধ্য হয়।

বর্তমান সমাজে যৌতুক হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়াও টিভি, ফ্রিজ, ঘরের দামি আসবাবপত্র ইত্যাদিসহ ফ্ল্যাট বাড়ি বা উচ্চমানের গাড়ি দাবি করা হয়। যৌতুক হিসেবে ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর খরচ বা চাকরিতে ঢুকিয়ে দেওয়ার চুক্তিও করা হয়। এত কিছুর পরও কন্যার বাবা দায়মুক্ত হতে পারেন না। বারবার নানামুখী চাপ আসতে থাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে। যদি মেয়ের অভিভাবক চাহিদা পূরণে সমর্থ হয়, তাহলে বউমা লক্ষ্মীমা হিসেবে গণ্য হয়। আর যদি মেয়ের অভিভাবক অক্ষম হয়, তখনই শুরু হয় নির্যাতন-নিপীড়ন, অমানবিক অত্যাচার ও নানাবিধ অভিযোগ। বউয়ের কথাবার্তা আর যাবতীয় কার্যক্রম যেন তেতো ফলের মতো অস্পৃশ্য মনে হয়। শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনসহ হত্যার চক্রান্ত, কখনো অসহায় মেয়েটিকে নির্মমভাবে হত্যার শিকারও হতে হয়। হত্যার পর লাশ সিলিংফ্যানে ঝুলিয়ে রাখা হয়, আত্মহত্যা প্রমাণে অথবা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় কিংবা রাতের অন্ধকারে মাটির নিচে পুঁতে দেওয়া হয়; যেন লাশ লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়, কাকপক্ষীও যেন টের না পায়। এ হলো যৌতুকপ্রথার বিষময় পরিণতি।

বাংলাদেশে ১৯৮০ সাল থেকে আইন করে যৌতুক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপর দুই দফায় সংশোধন করে তা হালনাগাদ করে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ নামে নতুন আইন পাস করা হয়। যেখানে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এর সঙ্গে নির্যাতন জড়িত থাকলে তখনই শুধু এই মামলা গুরুত্ব পায় এবং তা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন দিয়ে বিচার করা হয়। তবে যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন, ১৯৮০ এ দেশে যৌতুকের অভিশাপ রোধ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে যৌতুক দাবির পরিণতিতে কনের ওপর নির্যাতন নেমে আসে। তারা শারীরিকভাবে নিগৃহীত হয়। এমনকি খুনও হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যৌতুক দাবিকে কেন্দ্র করে কোনো মহিলা বা শিশুকে সামান্য বা গুরুতর জখম করা, হত্যার চেষ্টা করা বা হত্যা করার জন্য শাস্তির বিধান করে নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯৫ জারি করতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেই আইনটিও এই অভিশাপ মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রমাণিত না হওয়ায় আইনটি রহিত করে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (নির্যাতনমূলক শাস্তি) আইন ২০০০ বলবৎ করা হয়। আইনটি ২০০৩ সালে আরেকবার সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আইনের ১১ অনুচ্ছেদে যৌতুকের দাবি নিয়ে হত্যার দায়ে মৃত্যুদ , হত্যার চেষ্টা চালানোর জন্য যাবজ্জীবন কারাদ , মারাত্মক জখম করার দায়ে ৫ থেকে ১২ বছরের কারাদ এবং সাধারণ বা মামুলী জখম করার দায়ে ১ থেকে ৩ বছরের কারাদে র বিধান রাখা হয়েছে।

ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, ঢাকায় ২০১৬ সালে ২৭ জন, ২০১৫ সালে ২৫ জন, ২০১৪ সালে ২২ জন, ২০১৩ সালে ৩০ জন, ২০১২ সালে ২৫ জন, ২০১১ সালে ২৬ জন এবং ২০১০ সালে ১৫ জন নারীকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তবে যৌতুকের কারণে ঢাকায় যে হারে নারীরা হত্যার শিকার হচ্ছেন, সে অনুপাতে সাজার হার খুব কম। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, ২০০২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া যৌতুকের জন্য হত্যা মামলার মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে।

যৌতুক প্রথার অভিশাপ মোকাবিলায় সরকার এতসব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরও যৌতুক প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি; বরং তা বেড়েই চলছে এবং এই অভিশাপের যারা শিকার তাদের অর্থনৈতিক কাঠামোকে কুরে কুরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যৌতুকপ্রথার অভিশাপ বাংলাদেশের ধর্ম-বর্ণ সব সমাজে এতটাই সংক্রমিত হয়েছে যে, তা উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে দারিদ্র্যের সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তাই যৌতুক প্রতিরোধে আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন যেমন জরুরি, ঠিক তেমনিভাবে সামাজিক আন্দোলনও সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। যারা যৌতুক দিচ্ছে বা নিচ্ছে তারা সামাজিকভাবে অপরাধী। তাদের বয়কট করতে হবে। আর এটা যে একটা সামাজিক ব্যাধি, তা তরুণ প্রজন্মকে বোঝাতে হবে এবং তাদের সঙ্গে নিয়েই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর এই আন্দোলন গড়ে উঠলেই যৌতুক নামের অভিশাপ থেকে আমরা মুক্ত হতে সক্ষম হব।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
যৌতুক,আন্দোলন,মুক্তমত
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close