রায়হান আহমেদ তপাদার

  ০৮ এপ্রিল, ২০২১

ফিলিস্তিন ইস্যু এবং বিশ্ব বাস্তবতা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্য কার্যত ভেঙে পড়ে। তখন যে লিগ অব নেশন গঠিত হয়েছিল, সেই বিশ্ব সংস্থার পক্ষ থেকে ব্রিটেনকে ‘ম্যান্ডেট’ দেওয়া হয় ফিলিস্তিন শাসন করার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছিল তখন ব্রিটেন আরব এবং ইহুদি উভয়পক্ষের কাছেই নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ফিলিস্তিন নিয়ে। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটিই ব্রিটেন রক্ষা করেনি। পুরো মধ্যপ্রাচ্য তখন কার্যত ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল ব্রিটেন আর ফ্রান্স। এই দুই বৃহৎ শক্তি পুরো অঞ্চলকে তাদের মতো করে ভাগ করে নিজেদের প্রভাব বলয়ে ঢোকায়। ফিলিস্তিনে তখন আরব জাতীয়তাবাদী এবং ইহুদিবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়। ইহুদি এবং আরব মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপে বসবাসকারী ইহুদিরা ব্যাপক বিদ্বেষ-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। সেখান থেকেই ‘জাওনিজম’ বা ইহুদিবাদী আন্দোলনের শুরু। তাদের লক্ষ্য ছিল ইউরোপের বাইরে কেবলমাত্র ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র পত্তন করা। সেসময় ফিলিস্তিন বা ফিলিস্তিন ছিল তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। এটি মুসলিম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান এই তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র ভূমি হিসেবে বিবেচিত। গত মাসে নেদারল্যান্ডসের হেগভিত্তিক এই আদালত রুল জারি করেছিল, উল্লিখিত অঞ্চলগুলোর ওপর নিজেদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রয়োগ করার অধিকার রয়েছে তাদের। যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু হওয়ায় ফিলিস্তিন এর প্রশংসা করলেও ফাতৌ বেনসাওদার এমন সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছে ইসরায়েল। এরপরও আশায় বুক বেঁধে আছে বিশ্ব।

অসলো শান্তিচুক্তির পর ফিলিস্তিনে সীমিত আকারে স্বশাসন প্রতিষ্ঠায় ইয়াসির আরাফাত সফল হয়েছিলেন, কিন্তু আরাফাতের মৃত্যুর পর ইসরায়েল ফিলিস্তিনি এলাকায় দখল, সম্প্রসারণ করে এবং অবৈধ ইসরায়েল বসতি স্থাপন করে। ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতন বৃদ্ধি পায়। শান্তিচুক্তির পর ২৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও শান্তি এখনো অধরা। ফিলিস্তিন ইসরায়েল রাষ্ট্র স্বীকার করে নিলেও ইসরায়েল জাতিসংঘ ও অসলো প্রস্তাব অনুসারে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করতে জোর জবরদস্তিভাবে সেনা প্রহরায় দখল-দারিত্ব সম্প্রসারণ করতে থাকে। এমনকি আমেরিকা ও ইসরায়েল ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিতে থাকে। এর ফলে ফিলিস্তিনের জাতীয়তাবাদী শক্তি বিভক্ত হয়ে পড়ে। গাজা এলাকা ধর্মীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠী হামাসের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, পশ্চিম তীরে মাহমুদ আব্বাসের সরকার প্রশাসন চালায়। বিগত ১৫ বছর ফিলিস্তিনে নির্বাচন হয়নি সম্প্রতি হামাস ও ফাত্তা নির্বাচন অনুষ্ঠানে সম্মত হয় এবং নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে বলে তাদের মধ্যে চুক্তি হয়। এটি ফিলিস্তিনবাসীর জন্য শুভ সংবাদ। এখন এটা পরিষ্কার যে, বিশ্ব বাস্তবতা উপলব্ধি করে হামাস ও ফাত্তাকে ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জোরদার করতে হবে। ফিলিস্তিনিদের জাতিগত বিভক্তির কারণে অসলো শান্তিচুক্তির কার্যকারিতা এগোয়নি এবং তা ইসরায়েল ও তার আমেরিকা এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ইসরায়েলি আধিপত্য কায়েমের সুযোগ করে দেয়।

ফিলিস্তিনবাসী ও বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জন্য এটি শুভ সংবাদ হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে উৎকণ্ঠা থেকেই যায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ফিলিস্তিনের এলাকায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি ফাতু বেনসুদা জানান, ২০১৪ সাল থেকে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গাজা উপত্যকার যেসব এলাকা ইসরায়েল দখল করেছে, সেসব এলাকা অপরাধ তদন্তের আওতায় আসবে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের পর এ পর্যন্ত ২ হাজার ২৫০ জন ফিলিস্তিনি এবং ৭৪ জন ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহত ফিলিস্তিনিদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক এবং ইসরায়েলের যারা নিহত হয়েছেন তাদের অধিকাংশই সেনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এ বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে জানায় যে, ফিলিস্তিন ভূখন্ডে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারের এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রয়েছে। আইসিসির এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনের যেসব এলাকা ইসরায়েল দখল করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর যেসব নারকীয় অপরাধ সংঘটন ও নির্যাতন চালিয়েছে, সেসবের অভিযোগ ও বিচার চাইতে পারবে ফিলিস্তিনবাসী। আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিতায়েহ বলেছেন, আইসিসির এই সিদ্ধান্ত ন্যায়বিচার ও মানবতা, সত্যের মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা এবং শহীদদের রক্তের জন্য এক বড় বিজয়।

তবে আইসিসির তদন্ত শুরুর প্রক্রিয়া ইসরায়েল ও তার মুরব্বি যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস আইসিসির ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে নাকচ করার কথা বলেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আইসিসির পদক্ষেপকে ইহুদি বিদ্বেষ বলেছেন। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল মালিকি বলেন, ইসরায়েলের নেতারা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আইসিসির তদন্তের বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন করল, যা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষকে হতাশ করেছে। আমেরিকার নতুন প্রশাসন যে ইহুদি লবির বিরুদ্ধে যেতে পারবে না তা যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে পরিষ্কার হলো। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে জো বাইডেন যে পরিবর্তন আনবেন, তা দুরাশা মাত্র। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় ইরান সমর্থক গোষ্ঠীর অবস্থানের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজা বাদশাহদের আমেরিকা হাতে রাখবে কেননা তাদের অস্ত্র বিক্রি করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও খনিজ সম্পদের ওপর ইউরোপ ও আমেরিকা কর্তৃত্ব কিছুতেই হারাতে চাইবে না। এর পরিণতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত সংঘর্ষ কখনো বন্ধ হবে না আর এটা অব্যাহত রাখতে পারলে ইসরায়েল নিরাপদ থাকবে। বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের হত্যা নির্যাতনের ব্যাপারে খুব একটা সরব নয়। ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র নেই, বিশ্বে তারাই দুর্ভাগ্যজনক জনগোষ্ঠী যাদের একদা বিস্তৃত ফিলিস্তিন পিতৃভূমি থাকলেও এখন তারা নিজ দেশে অনেকটা উদ্বাস্তু জীবনযাপন করছে। অপরের করুণার ওপর নির্ভর করে তাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে।

একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব, পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি নির্মাণ অব্যাহত রাখা এবং ফিলিস্তিনি ও ইহুদি এলাকার মধ্যে নিরাপত্তা প্রাচীর তৈরি করা এগুলো শান্তি প্রক্রিয়াকে বেশি জটিল করে ফেলেছে। যদিও দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি নির্মাণকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে শান্তির পথে এগুলোই একমাত্র বাধা নয়। বিল ক্লিনটন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তখন ক্যাম্প ডেভিডে ২০০০ সালে তিনি যে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেখানে এর ব্যর্থতার আরো অনেক কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এ হুদ বারাক এবং ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত সেই বৈঠকে একমত হতে পারেননি আরো অনেক বিষয়ে।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল যেসব ফিলিস্তিনি এলাকা দখল করে নিয়েছিল, সেখানে তারা অনেক ইহুদি বসতি গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ। কেবল পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমেই এখন বসতি গেড়েছে পাঁচ লাখের বেশি ইহুদি। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখান থেকে বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল লাখ লাখ ফিলিস্তিনি। এরা ইসরায়েলের ভেতর তাদের বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবি করে আসছে। পিএলওর হিসেবে এই ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধরদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ। কিন্তু ইসরায়েল এই অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চায় না।

আরব-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাসে এর পরের যুদ্ধটি ‘ইয়োম কিপুর’ যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরের এই যুদ্ধের একদিকে ছিল মিসর আর সিরিয়া; অন্যপক্ষে ইসরায়েল। মিসর এই যুদ্ধে সিনাই অঞ্চলে তাদের কিছু হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করে। তবে গাজা বা গোলান মালভূমি থেকে ইসরায়েলকে হটানো যায়নি। কিন্তু এই যুদ্ধের ছয় বছর পর ঘটল সেই ঐতিহাসিক সন্ধি। মিসর প্রথম কোনো আরব রাষ্ট্র, যারা ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করল। এরপর তাদের পথ অনুসরণ করল জর্দান। কিন্তু তাই বলে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হলো না। গাজা ভূখন্ড যেটি বহু দশক ধরে ইসরায়েল দখল করে রেখেছিল, সেটি ১৯৯৪ সালে তারা ফিলিস্তিনিদের কাছে ফিরিয়ে দিল। সেখানে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বড় ধরনের লড়াই হয় ২০০৮, ২০০৯, ২০১২ এবং ২০১৪ সালে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের যে তদন্ত শুরু করার প্রক্রিয়া সূচনা করেছে তাতে এত দিনকার বিশ্ববাসীর দায়মোচনের সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। আরব রাষ্ট্রগুলো অনেক আগেই এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যেতে পারত যেমন করে গাম্বিয়া রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিয়ে আইসিসিতে অভিযোগ উত্থাপন করেছে। ওআইসি জাতিসংঘেও ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে পারেনি, বরং কিছু আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সখ্য স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফিলিস্তিনবাসীর ওপর ইসরায়েলের নিপীড়ন, নির্যাতন, ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে অবৈধ দখল ও বসতি নির্মাণ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। একটি প্রাচীন সভ্যতার জনপদ এখন রক্তাক্ত। সভ্যতা ও মানবতার স্বার্থেই ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের অবসান প্রয়োজন। প্রয়োজন তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের স্বীকৃতি।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ফিলিস্তিন,বিশ্ব,মুক্তমত
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close