আবদুর রউফ

  ০৭ এপ্রিল, ২০২১

জীবনের বাস্তবতায় ভার্চুয়াল জগৎ

গ্রামে জন্মগ্রহণ করা অধিকাংশের শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণ প্রায় একই রকম। সারা দিন এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করা। নানা রকম খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকা। মাঝে মাঝে খেলার আনন্দে খাবার খাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া। আবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়ের বকাবকি শোনা। সন্ধ্যার পর হারিকেনের আলোতে বড় ভাই-বোনদের সঙ্গে পড়তে বসা। পড়তে বসে কত খুটসুটি, কত রকম কথা বলা। আর ছোটবেলায় যারা দাদি বা নানির সঙ্গে ঘুমাই তো তাদের আনন্দ আরো আলাদা। দাদি-নানিরা নানা রকম কিচ্ছা কাহিনি বলে ঘুম পাড়িয়ে দিত। যেহেতু রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া, তাই খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে যাওয়া। আবার সেই কোলাহল।

গোল্লাছুট, কানামাছি, বৌছি, বর-বউ, ক্রিকেট, ফুটবল, কড়ি খেলা, গুটি (মার্বেল) খেলা, বদনখেলা আর কত মজার মজার খেলায় সারা দিন কাটিয়ে দেওয়া। যারা স্কুলে যেত তারা ক্লাসের ফাঁকে যতটুকু সময় পেত, কলম খেলা, বইয়ের পাতা দিয়ে ওপর-নিচ (যেমন ধরুন একটি পাতার ওপর পাশে দুটো মানুষের ছবি আছে, তাহলে দুটো মারব বা দু পয়েন্ট পাব এমন) খেলা, হইহুল্লোড় করে চলত সময়ের রেল। টিফিনের সময় বাড়ি খেতে না যাওয়া। ওই সময়ে খেলাধুলা করে সময় ব্যয় করা। আর কোনো রকম ছুটির ঘণ্টা পড়লে কে কার আগে দৌড়ে বাড়ি যেতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা। হাফ স্কুলের দিন তথা বৃহস্পতিবারের আগে ছুটি হওয়ার আনন্দ ছিল অন্যরকম। হঠাৎ যদি কোনো কারণে স্কুল বন্ধ দিত অথবা স্যারেরা ক্লাসে আসত না, তাহলে আনন্দের সীমা থাকত না। গ্রামের সমবয়সি ছেলেমেয়ে মিলে বিকালবেলা খেলাধুলা করা। এইতো ছিল আমাদের শৈশব।

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনের নানা পটপরিবর্তন হয়। পড়াশোনা বা জীবনের তাগিদে নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। সময়ের ব্যবধানে চলার পথে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে বন্ধুত্বের বন্ধন। গ্রামের স্কুলজীবনের পর থেকে কর্মজীবনের মাঝে যতগুলো পর্যায়ে বন্ধুত্ব হয়, সেগুলো অধিকাংশ অটুট থাকে না। শুধু সেই গ্রামের শৈশবের বন্ধুত্বগুলো সারা জীবন টিকে যায়। আর চাকরিজীবনে কাজের সুবাদে সহকর্মীদের সঙ্গে যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়, সেটির বন্ধন অনেক শক্ত হয়। তবে সেই গ্রামের শৈশবের বন্ধুত্ব একটু আলাদা। প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মজীবন ও চলার পথে যত মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটুক না কেন, সবচেয়ে ভালো ও স্থায়ী বন্ধুত্ব হয় শৈশবেই। সেই পাড়াগায়ের মাটির সুবাস মাখানো বন্ধুত্বের আজ বড় আকাল।

শহর ও গ্রাম এই দুই জায়গার শৈশবে বেড়ে ওঠার মাঝে অনেক পার্থক্য রয়েছে। গ্রামের বড় হওয়া একজন শিশুর আচরণ শহরে বেড়ে ওঠার শিশুর মধ্য অনেক তফাত। শহরে আগে তাও কিছু খেলার মাঠ চোখে পড়ত। যেখানে বিকালে ছোট বড় সকলে খেলাধুলা বা আড্ডা দিত। এখন শহরে কালেভদ্রে খেলার মাঠ চোখে পড়ে। আধুনিকতার নামে মাঠ দখল করে গড়ে তুলেছে ইটপাথরের দালানকোঠা। শহরে শিশুদের বেড়া ওঠা তাই গ্রামের শিশুদের থেকে অনেক আলাদা। শহরে বন্ধুত্বগুলো স্বার্থের গন্ডি পেরিয়ে নিঃস্বার্থের বন্ধুত্বে পরিণত হতে পারে খুবই কম। পড়াশোনা, ভিডিও গেম, আর টিভিতে কার্টুন দেখেই সাধারণত শহরে ছেলেমেয়েরা শৈশব পার করে কৈশোরে পদার্পণ করে। যার ফলে গ্রামের মানুষের চেয়ে শহরের মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা অনেক বেশি। বন্ধুত্বের ধরনও একটু আলাদা। মানুষের জীবনে যতগুলো বিষয় খুবই প্রভাব বিস্তার করে তার মধ্যে বন্ধুত্ব অন্যতম। একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ বাক্য এমনটি প্রমাণ করে, ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। তাই জীবনে যদি আপনার ভালো ও সৎ মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়, তাহলে আপনার জীবন হবে আলোকিত। আর অসৎ মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলে অনেক সময় আপনার অসৎ হয়ে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি। তাই জীবনে বন্ধু নির্বাচনে থাকতে হবে বেশ সতর্ক।

বন্ধুত্বের সংজ্ঞা আমাদের সবার জানা। তবে ভার্চুয়াল জগতের সুবাদে বন্ধুত্বের সংজ্ঞায় এসেছে অনেক পরিবর্তন। আমরা আধুনিক যুগে যে বন্ধুত্বের চর্চা করি, তা সেই আগেকার দিনের মতো মোটেও না। তাই বর্তমানে আধুনিক যুগে দুই ধরনের বন্ধুত্বের সঙ্গে পরিচিত। প্রথমত, ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব, দ্বিতীয়ত, বাস্তব জীবনের বন্ধুত্ব। আবার এই দুটির মধ্য রয়েছে অনেক পার্থক্য। ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুত্বের চর্চা হয় বা বন্ধুত্ব গড়ে উঠে ইন্টারনেট ভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই জগতের বন্ধুদের সঙ্গে বাস্তবে তেমন দেখা হয় না। অনেক সময় দেখা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা একবারেই থাকে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব বাস্তব বন্ধুত্বেও রূপ নেয়। আর বাস্তব জগতের বন্ধুত্ব বলতে, যাদের সঙ্গে আমাদের বেড়ে ওঠা। আর এমন বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হয় বাল্যকালে, কৈশোরকালে বা আরো পরে, কিন্তু তা অবশ্যই মুখোমুখি পরিচয়। হতে পারে সে একই গ্রামের বা পড়াশোনার সুবাদে স্কুল কলেজের বন্ধু। অথবা একজন বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয় হয়। যাদের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয় ও একে অপরকে খুব ভালো করে চেনে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানেও যাদের অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায়। বিপদে-আপদে যাদের সব সময় পাশে পাওয়া যায়।

আমরা বর্তমান বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম প্রয়োজনের তুলনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুকে) বেশি সময় ব্যয় করি। এই জগতে বন্ধুত্বের সংখ্যা অনেক বেশি। ভার্চুয়াল জগতের কাল্পনিক বন্ধুদের কারণে বাস্তব জগতের বন্ধুর সংখ্যা আমাদের অনেক কমে গেছে। আগে সবাই এক জায়গায় হলে নানা রকম সুখ-দুঃখের গল্প করে সময় কেটে যেত। এখন যদি চার-পাঁচজন বন্ধু একত্র হওয়া হয়, কেউ কারো সঙ্গে তেমন কথা বলে না। সবাই সবার মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। পাঁচজন বন্ধু একসঙ্গে বসে একে অপরের সঙ্গে কথা বলে না। যার ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষের আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। খুব কাছের মানুষগুলোর সঙ্গে একদম জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যোগাযোগ করা হয় না। অথচ বাস্তব জীবনে ভার্চুয়াল বন্ধুদের চেয়ে বাস্তব জগতের বন্ধুত্বের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি, এটি সবার জানা কথা। মনে করেন আপনার জ্বর হলো, আপনি ফেসবুকে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দিলেন যে, আপনি জ্বরে বিছানায় পড়ে আছেন। অনেক কষ্টে আছেন, সেবা করার মতো পাশে কেউ নেই। এমন্ত অবস্থায় আপনার ভার্চুয়াল বন্ধুরা কমেন্টে আপনার জন্য সমবেদনা জানিয়ে ঝড় তুলে ফেলবে। কেউ লিখবে দ্রুত সুস্থ হোন, কেউ সৃষ্টিকর্তার কাছে কমেন্টের মাধ্যমে দোয়া করবেন। কেউ কান্নার রিয়েক্ট দিয়েই দায় সারবেন। তবে বাস্তব জগতের বন্ধুরা আপনার বিপদে পাশে এসে দাঁড়াবে। আপনার যত রকম সেবা দরকার সব তারা করবে। আপনার জন্য নিজের যতই ক্ষতি হোক তাও পাশে থাকবে। এটিই বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুত্বের কিছু বিড়ম্বনা রয়েছে। যেমন সবার ক্ষেত্রে যেমনটি হয়, ধরুন ভার্চুয়াল জগতে আপনার স্ট্যাটাসে একজন নিয়মিত লাইক, কমেন্ট করে। তবে বাস্তব জীবনের তার সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ হয়নি বললেই চলে। হঠাৎ যদি কখনো তার সঙ্গে দেখা হয়, আর আপনি যদি তাকে চিনতে না পারেন আর ওই ব্যক্তি যদি আপনাকে চিনতে পারে। আপনার না চেনার কারণে স্বাভাবিকভাবে আপনি তার সঙ্গে কথা বলবেন না। আর ওইদিকে ভার্চুয়াল জগতের বন্ধু মনে করবে ইচ্ছা বা অহংকার করে আপনি কথা বলেননি। আবার এমন হয়, ভার্চুয়াল জগতে কিছু মানুষের সঙ্গে খুবই ভালো সম্পর্ক, মাঝেমধ্যে দেখাও হয় তার পরও নিজের বাল্যকাল বা ক্লাসমেটদের মতো তাদের সঙ্গে বাস্তবে সখ্যতা তেমন জমে না। এখন তো আবার এই জগতে বন্ধুত্বের নামে চলছে অবাধে প্রতারণা। মানুষের আগ্রহ ভার্চুয়াল জগতে বেড়ে যাওয়াতে, নানা রকম প্রতারকচক্র তাদের প্রতারণার জাল সুকৌশলে বিছিয়ে রেখেছে। একটু অসাবধানতার ও ভুল সিদ্ধান্তের ফলে অনেক আত্মহত্যাসহ নানা করম ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে এই জগতে বন্ধুত্ব বা প্রেমের সম্পর্ক জড়িয়ে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। বাস্তব জীবনের পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগৎ হয়ে উঠছে অপরাধীদের অভয়ারণ্য। এই জগতে পুরোটাই অন্ধকার এবং গোপন। তাই পরিবারে কোনো সন্তান হেনস্তার স্বীকার হলেও জানতেও পারা যায় না। যেহেতু এই জগতে প্রবেশের তেমন কোনো বিধিনিষেধ নেই। তেমন কোনো নিয়মনীতি নেই। তাই অপরাধীদের পছন্দের জগৎ হয়ে উঠেছে ভার্চুয়াল জগৎ।

ভার্চুয়াল জগৎ বর্তমান প্রজন্মের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। এই জগতে যেমন সুবিধা আছে, তেমন অসুবিধাও রয়েছে। তবে বন্ধুত্ব করার ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল জগতের চেয়ে বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াই শ্রেয়। ভার্চুয়াল জগতে প্রতারণার শিকার হয়ে বন্ধুত্বের ওপরে কারো অনীহা তৈরি না হোক। বন্ধুত্বের পবিত্র সম্পর্কগুলো আমাদের আজীবন সুখে-দুঃখে বটবৃক্ষের ছায়ার মতো অটুট থাকুক, সেই প্রত্যাশা রইল।

লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও
সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ভার্চুয়াল জগৎ,জীবন,মুক্তমত
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close