মোতাহার হোসেন

  ১৯ জানুয়ারি, ২০২১

স্বপ্ন ছুঁয়েছে প্রমত্ত পদ্মার এপার-ওপার

এক মহাকর্মযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে অবশেষে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এই সেতুর ওপর স্লাব বসানো ও রেললাইন স্থাপনের কাজ শেষ হলেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে সারা দেশের সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। সরকারি মহল আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছে, ২০২২ সালের জুনের মধ্যে যানবাহন চলাচলের জন্য সেতু খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। এরই মধ্যে ভায়াডাক্ট অর্থাৎ মূল নদীর বাইরে পিলার ও স্প্যান বসানো, সংযোগ সড়ক, নদীশাসনের কাজ শেষ হয়েছে। এই সেতু এবং সেতুর ওপর রেল সেতু নির্মাণকাজ শেষ হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত যেমন সুগম হবে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে দেশের জিডিপিতে যুক্ত হবে উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

মূলত পদ্মা সেতুর এই অগ্রগতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের ওপর বাংলাদেশের মানুষের আস্থা, অর্থনৈতিক, কারিগরি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সাহসের প্রতীক। বাংলাদেশ ও বীর বাঙালি চাইলে সবকিছু করতে পারে, পারে অসাধ্য সাধন করতে পদ্মা সেতু তারই একটি প্রমাণ। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বিজয়ের মাসে সেতুর স্প্যান স্থাপন সম্পন্ন করে প্রমত্ত পদ্মা জয় করে বিশে^ আরেকটি বিজয় নিশান উড়াল বাঙালি জাতি। বিজয়ের মাসে পদ্মা সেতুর স্প্যান স্থাপন সম্পন্ন করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আরেকটি উপহার দিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। শুধু পদ্মা সেতু নয়, খাদ্য ঘাটতির দেশকে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে উন্নীত, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী শিক্ষার হার সন্তোষজনক অবস্থানে উন্নীত, নারী ও শিশু মৃত্যুহার কমিয়ে আনা, নিম্ন আয়ের দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর, মানুষের গড় আয়ু, গড় আয় (মাথাপিছু) ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, সবার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দ্বারপ্রান্তে উপনীত, আগামী জুনের মধ্যে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে বলে আশা বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর। অনুরূপ মহাকাশে আমাদের জাতীয় পতাকা খচিত ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণ ও বিচরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মহাকাশ জয়সহ বাঙালির সব বড় অর্জন অর্জিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই। করোনাকালে দেশের অর্থনীতি সব সূচকে ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান পাশর্^বর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তানের চেয়ে অনেক গুণ এগিয়েছে মর্মে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে। করোনাকালেও মানুষের জীবন রক্ষা ও জীবিকার চাকা সচল রাখতে পারায় একইভাবে বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের প্রশংসা করছেন, প্রশংসা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে শত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে সফল হয়েছেন, তা তার নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও একাগ্রতার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম পদ্মার ঢেউকে তার শূন্য হৃদয়-পদ্ম নিয়ে যেতে বলেছিলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন, পদ্মা নদী বাঙালির শূন্য হৃদয়ের বাহন নয়; বরং বুকভরা গর্ব ও চোখভরা স্বপ্নের এক জীবন্ত সাক্ষী। আমরা দেখতে পাচ্ছি, পদ্মা নদীর সেই উদার নীল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছে পদ্মা সেতুর গৌরবময় কাঠামো। এও যেন এক অনবদ্য কবিতা। আর এ কবিতা রচয়িতার নাম শেখ হাসিনা।

মহামারি করোনার প্রথম ঢেউ সফলভাবে মোকাবিলার পর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে আগাচ্ছে সরকার। এ পর্যায়ে মানুষের জীবনের সুরক্ষা এবং জীবিকার চাকাকে সচল ও গতিশীল রাখতে প্রথম পর্যায়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। পদ্মা সেতু নিয়ে এই নিবন্ধের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বলেই উপরোক্ত তথ্যগুলো এখানে উল্লেখ করা হলো। প্রসঙ্গত স্বপ্নের এই সেতুতে প্রথম স্প্যান বসেছিল ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। আর ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্ভর পদ্মায় বসল সর্বশেষ স্প্যান। ৪১টি স্প্যান বসাতে তিন বছর দুই মাস ১০ দিন সময় লাগল। অবশ্য মহামারি করোনা এবং পদ্মার অত্যধিক স্রোত স্প্যান বসানোর কাজে গতি কমিয়ে দেয়। তবে গত ১১ অক্টোবর ৩২তম স্প্যান বসানোর পর অনুকূল আবহাওয়া পাওয়া যায়। কারিগরি কোনো জটিলতাও তৈরি হয়নি। ফলে বাকি স্প্যানগুলো দ্রুত বসানো সম্ভব হয়। এই স্প্যানই সেতুর মূল অবকাঠামো। পিলারের ওপর বসানো হয়েছে এগুলো। এর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন আর নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। যানবাহন ও ট্রেন চলাচলের রাস্তা নির্মাণের জন্য স্প্যানের ওপর ও নিচে স্লাব বসানোর কাজ চলছে। প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার। এসব স্প্যান চীনে তৈরি করে জাহাজে করে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে।

৪২টি পিলারের সঙ্গে স্প্যানগুলো জোড়া দেওয়ার মাধ্যমে পুরো সেতু দৃশ্যমান হয়েছে। মূল পদ্মা সেতুর অর্থাৎ নদীর অংশের দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তবে ডাঙার অংশ ধরলে সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য হবে ৯ কিলোমিটারের কিছু বেশি। নদীর দুপাশের অংশের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। পুরো কাজ শেষ হলে যানবাহন চলাচলের পথটি হবে ২২ মিটার চওড়া, চার লেনের। মাঝখানে থাকবে সড়ক বিভাজক। স্প্যানের ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন। সেতুতে একটিই রেললাইন থাকবে। তবে এর ওপর দিয়ে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ দুই ধরনের ট্রেন চলাচলেরই ব্যবস্থা থাকবে। ভায়াডাক্টে এসে যানবাহন ও ট্রেনের পথ আলাদা হয়ে মাটিতে মিশেছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের পেছনের ইতিহাস হচ্ছে, আজ থেকে ২২ বছর আগে ১৯৯৮ সালে সরকারের তহবিলে প্রথম এই সেতুর প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এরপর অর্থায়নে এগিয়ে আসে বিশ্বব্যাংক; কিন্তু কিছুদিন পরই বিপত্তি দেখা দেয়। এতে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সংস্থাটি প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে সেতুর ভবিষ্যৎ শঙ্কায় পড়ে যায়। এরপর সরকার এই সেতু নির্মাণে বিকল্প অর্থায়নের জন্য মালয়েশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে। একপর্যায়ে বিশ্বব্যাংক পুনরায় ফিরে আসে অর্থায়নের জন্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে এর বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন।

প্রকৌশলীরা বলেছেন, পদ্মার বুকে সেতু গড়ে তোলার ধারণাটিই ছিল বিস্ময়কর। কেননা পদ্মার নদী তলের মাটি এতই পরিবর্তনশীল যে, মুহূর্তে যেকোনো স্থান থেকে যে পরিমাণ মাটি সরে যায়, তাতে ২১ তলা উঁচু ভবনের উচ্চতার সমপরিমাণ গভীরতার খাদ তৈরি হয়। এমন একটি স্থানে পাইলিংয়ের মাধ্যমে খুঁটি স্থাপনের মতো বিশাল এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে পদ্মা সেতুর প্রকৌশলীদের। বিশেষ পদ্ধতিতে শেষ পর্যন্ত পাইলিং করতে হয়েছে। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার মতো করে পদ্মা সেতু নির্মাণ হচ্ছে। প্রকৌশলীরা জানান, নদীর পানি থেকে প্রায় ১৮ মিটার উঁচু পদ্মা সেতুর তলা। পানির উচ্চতা যতই বাড়ুক না কেন, এর নিচ দিয়ে পাঁচ তলার সমান উচ্চতার যেকোনো নৌযান সহজেই চলাচল করতে পারবে। মূল সেতুর কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। এই সেতু নির্মাণের কাজ পায় চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। তাদের সঙ্গে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার চুক্তি হয়। চার বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কাজ শুরুর পরের বছরই মাওয়ায় স্থাপিত নির্মাণ মাঠের বেচিং প্লান্টসহ একাংশ নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়।

২০১৭ সালে প্রতিটি খুঁটির নিচে মাটি পরীক্ষায় ২২টি খুঁটির নিচে নরম মাটি পাওয়া যায়। তখন নকশা সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়। ফেরিঘাট স্থানান্তরেও সময় লেগে যায়। শুরুতে প্রতিটি খুঁটির নিচে ছয়টি পাইল (মাটির গভীরে স্টিলের ভিত্তি বসানো) বসানোর পরিকল্পনা ছিল। যুক্তরাজ্যের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নকশা সংশোধন করে একটি করে পাইল বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। এজন্য খুঁটি নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হতে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত লেগে যায়। সব মিলিয়ে এই কাজে প্রায় এক বছর বাড়তি লাগে। এজন্য মাঝে কাজে কিছুটা গতি হারায়। ঠিকাদারকে দুই বছর আট মাস বাড়তি সময় দেওয়া হয়। প্রথম দফায় প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। পরে ২০১১ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ফের সংশোধনের পর ব্যয় দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এরপর প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন না করে ২০১৮ সালের জুনে আবারও ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। গত ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৪ হাজার ১১৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এসব খরচের মধ্যে রয়েছে সেতুর অবকাঠামো তৈরি, নদীশাসন, সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ, বেতন-ভাতা ইত্যাদি। এই সেতু নির্মাণের ফলে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে জিডিপি বাড়বে বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে। আর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। মোংলাবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু অর্থনীতিতে যেমন প্রভাব ফেলবে, তেমনি সহজ হবে মানুষের চলাচলও।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/ জিজাক

পদ্মা সেতু,পদ্মা
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close