নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির লাগাম টানতে হবে

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:০৮

মাহবুবুল আলম

একদিকে করোনায় দিশাহারা মানুষ। তার ওপর নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে উঠেছে মানুষ। বাজারে চাল, ডাল, আটা, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, দারচিনি, এলাচ, শুকনো মরিচ, আদাসহ প্রায় প্রতিটি পণ্যেরই দাম বেড়ে গেছে। এরমধ্যে কেবল চালের মূল্যই বেড়েছে কেজিতে ৭ টাকা। আটার মূল্য বেড়েছে ১০ টাকা। ডালের মূল্য বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা। আর সয়াবিন তেলের মূল্য বেড়েছে ২০ টাকারও বেশি। গরিবের মোটা সেদ্ধ চালের খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ৪৩ থেকে ৪৫ টাকা আর খোলা আটা প্রতি কেজি ২৮ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চালের বস্তায় অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। পাশাপাশি দাম বেড়েছে মোটা চালেরও। ৪৫০ টাকা বেড়ে বাজারে ৮৪ কেজির প্রতি বস্তা চিকন স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮৫০ টাকায়। ৪০০ টাকা বেড়ে ৮৪ কেজির প্রতি বস্তা গুটি স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। প্রতি কেজি আটাশ চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, মিনিকেট ৫২ থেকে ৫৮, বাসমতী ৫৮ থেকে ৬০ এবং আতপ ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া দাম বেড়েছে মোটা চালেরও। এরমধ্যে চিকন স্বর্ণা ৩৮ থেকে ৪০ টাকা, মোটা স্বর্ণা ৩৫ থেকে ৩৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাঙালিদের অতি প্রয়োজনীয় মসলা পেঁয়াজের দাম আবারও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ভারত সরকারের বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণায় নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজিতে পেঁয়াজের দাম প্রায় ৩০ টাকা বেড়ে ৬০ থেকে ৭০ টাকায় উঠেছে। গত বছর সিন্ডিকেটের কারণে পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এ ছাড়া অনেকটা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে আলু, পটোল, বেগুন, বরবটি, ঢেঁড়স, ধুন্দল, ঝিঙা, করলা, পেঁপেসহ প্রায় সব ধরনের সবজি। মাছের দাম কেজিতে বেড়েছ ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। ডিমের দাম প্রতি ডজনে বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকা। অনেক জায়গায়ই এখন ১২০ ডজন দরে ডিম বিক্রি হচ্ছে। মুরগি আকার ও প্রকারভেদে কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে আইন আছে, কিন্তু এই আইনের কোনো প্রয়োগ না থাকায় ভোক্তা সাধারণ নানাভাবে ঠকছেন। এটা অসাধু ব্যবসায়ীরা জানেন বলেই তারা যেকোনো অজুহাতে মানুষকে জিম্মি করতে পারছে। দেশে ১৯৬৪ সালের এগ্রিকালচারাল প্রডিউস মার্কেটস রেগুলেশন অ্যাক্ট ও ১৯৮৫ সালের সংশোধিত বাজার নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৬ (১) ও ১৬ (২) ধারামতে কৃষিজাত ও ভোগ্যপণ্যের ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য ও মজুদ পরিস্থিতির তদারকির ক্ষমতা রয়েছে কৃষি বিপণন অধিদফতরের বাজার কর্মকর্তাদের। কিন্তু বাস্তবে কোথাও আইনটির প্রয়োগ হতে দেখা যায় না। তা ছাড়া বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার না থাকায় মুনাফালোভীরা কোনো নিয়মনীতি মানে না।

দেশে ভোক্তা অধিকার আইন বলবৎ আছে। এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে একটি সুসংহত আইন। এ আইনে ভোক্তা স্বার্থবিরোধী কাজের জন্য সর্বোচ্চ ২ (দুই) লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তাছাড়া উক্ত দন্ডের অতিরিক্ত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবৈধ পণ্য বা পণ্য প্রস্ততের উপাদান, সামগ্রী ইত্যাদি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তকরণেরও বিধান রয়েছে। এ আইনের অধীনে কোনো সংক্ষুব্ধ পক্ষ আদেশ প্রদানের ৬০ দিনের মধ্যে সহনীয় অধিক্ষেত্রের সেশন জজ আদালতে আপিল দায়ের করতে পারেন। তা ছাড়া যুগ্ম জেলা জজ আদালতের রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগেও আপিল দায়ের করার বিধান রয়েছে। এ আইনটি বর্তমানে কার্যকর হলেও জনবলের অভাবে ঠিকমতো বাজার মনিটরিং করতে পারছে না। তা ছাড়া আইনটি জামিনযোগ্য হওয়ার কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা জরিমানা দিয়ে বা জামিন নিয়ে আবার অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েন।

পণ্যের সরবরাহ বা জোগানের কারণে দাম কিছুটা বাড়বে বা কমবে এটা স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। এখানে প্রায়ই কৃত্রিম সংকট বা গুজবের ওপরই যেন দাম বৃদ্ধি বা কমা নির্ভর করে। যেকোনো উছিলায় একবার জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে তা সব সময় বর্ধিতই থাকে, সহসাই সহনীয় পর্যায়ে থাকে না।

যাক শেষ করব এই বলে, বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির মাধ্যমে প্রতি কেজি ৩০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে। চলমান করোনাভাইরাস মহামারি ও বর্তমান বন্যা পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সারা দেশে তিনটি পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি। ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে পেঁয়াজের পাশাপাশি চিনি, মসুর ডাল ও সয়াবিন তেল বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই কেজি কিনতে পারবেন। এ ছাড়া প্রতি কেজি চিনি পাওয়া যাবে ৫০ টাকায়, যা একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই কেজি কিনতে পারবেন। মসুর ডাল ৫০ টাকা কেজিতে একজন ক্রেতা সার্বোচ্চ দুই কেজি নিতে পারবেন। এ ছাড়াও সয়াবিন তেল ৮০ টাকা লিটারে একজন ক্রেতা দুই থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লিটার নিতে পারবেন। শুক্র ও শনিবার ব্যতীত আগামী ১ অক্টোবর পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে বলে জানা গেছে। তবে আমাদের প্রত্যাশা যত দিন নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল না হবে; তত দিন যেন এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকে।

লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল