‘খুব কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল’ (ভিডিও)

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ১৫:২৫ | আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ১৫:৪৯

মো.সবুজ হোসেন, নওগাঁ

নওগাঁর বীর মুক্তিযোদ্ধা এবিএম রফিকুল ইসলাম (৬৬) খুব কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে শুনেছেন- এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। ভাষণ শোনার পর থেকেই ভাবতে শুরু করলেন দেশ ও জাতির জন্য কিছু একটা করতে হবে। কয়েক দিন পর ২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণ করলো এদেশের মানুষের ওপর। শুরু হলো হত্যা ও নির্যাতন। ৭১ সালে ঘটে যাওয়া সেইসব শিহরণ জাগানো ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরলেন প্রতিদিনের সংবাদ নওগাঁ প্রতিনিধি মো. সবুজ হোসেন এর কাছে।

মুক্তিযোদ্ধা এবিএম রফিকুল ইসলাম ভাবলেন, আর বসে থাকার সময় নেই। বাবা মরহুম ডা: হাসান আলী ও মা মরহুমা জহুরা খাতুন। ২ বোন ৫ ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। 

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তার বয়স ছিল ১৮ বছর। পরিবারে কাছে থেকে বিদায় নিয়ে তিনিসহ কয়েকজন বন্ধু চলে গেলেন ভারতের বালুরঘাটে ট্রেনিং নিতে। এর এক মাস ট্রেনিং নিয়ে দেশে এসে ৭নং সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হকের নেতৃত্বে দেশ ও জাতিকে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করতে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। 

এদেশ যদি পরাধীন থাকে তবে সে জমি বা সম্পদের মূল্য কী থাকে? সবার আগে দেশকে মুক্ত করতে হবে। বাঁচাতে হবে মাতৃভূমিকে। এমন চিন্তা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অনুধাবন করে মুক্তিযোদ্ধা এবিএম রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন বন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। দেশজুড়ে চলা পাকিস্তানীদের সহিংসতা, প্রতিদিন নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালানো দেখে তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন। 

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধা এবিএম রফিকুল ইসলাম। পাকিস্তানীদের বাঙালি বিদ্বেষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তার প্রকাশও ঘটছিল বন্দুকের ভাষায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে গিয়েছিল, সমঝোতার কোনো পথ খোলা ছিল না। তখন আমরা বুঝলাম মুক্তিযুদ্ধে যাবার সময় হয়ে গেছে। ৭ মার্চ আমাদের জীবনের একটি মহা গুরুত্বপূর্ণ দিন। খুব কাছে জাতির জনকের ভাষণ শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। এদিন থেকে আমরা পরিষ্কার দিক-নির্দেশনা পাই। 

মুক্তিযোদ্ধা এবিএম রফিকুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পরিবারে কাছে থেকে বিদায় বেলায় মা-বাবাকে বলি- যুদ্ধে যাচ্ছি আমার জন্য দোয়া করবেন; যদি বেঁচে থাকি তবে আপনাদের কোলে ফিরে আসবো। তখন বাবা আর মা বলেছিল সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া সব সময় কিন্তু বাবা-মায়ের মন যে কাঁদে । তার পর বাবা শুধু বলেছিল যদি মরতে হয় তবে বীরের মত যুদ্ধ কর মরিস বাবা রফিক।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক নওগাঁর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সফল সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সফল বানিজ্যমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আব্দুল জলিল ভাই যুদ্ধ চলাকালীন সময় আমাদের নানা ভাবে উৎসাহ, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন যার কারণে আমরা আরও অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম মহান মুক্তিযুদ্ধে। আমি ৭নং সেক্টরের অধীনে জয়পুরহাট সদর, আক্কেলপুর উপজেলা ও নওগাঁর তিলকপুরে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনার স্মতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ১৭ ডিসেম্বর আমরা যখন নওগাঁতে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমন শুরু করলাম সেদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। এমন সময় আমার পাশেই অবস্থান করছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বছির উদ্দিন। ঠিক সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীদের ছোঁড়া সেল্টার বছিরের পীঠে চার্জ হলো ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই তার দেহ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেল। তার ডেড বডি বলতে শুধু তার মাথা  অক্ষত ছিল।

বছিরের এমন মর্মান্তিক চলে যাওয়ার স্মৃতি আজও আমাকে প্রচণ্ড ব্যাথা দেয়। এর পর ১৮ ডিসেম্বর নওগাঁ পাক-হানাদার মুক্ত হয়। তার পর প্রিয় মা-বাবা ও ভাই বোনদের কাছে ফিরে আসি। মা আমাকে বুকে নিয়ে খুব কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, রফিক তুই যে ফিরে আসবি নাকি আর কোন দিন ফিরবি না সেটা ভেবে ভেবে যে রাত-দিন পার করেছি বাবা। তখন মা-বাবাকে বলেছিলাম, পাকিস্তানি নর-পশুরা অনেক মায়ের বুক খালি করে দিয়েছে তাদের পরিবারের জানিনা আজ কী অবস্থা।

তিনি আরও বলেন, আমার এক ছেলে, এক মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে বাবার পৈত্রিক নিবাস নওগাঁ শহরের ৭নং ওয়ার্ডের মধ্যপাড়ায় বসবাস করছি। বই পড়ে, সাংবাদিকতা, কলাম লিখা ও সামাজিক কিছু কাজের সাথে যুক্ত থেকেই সময় কেটে যায়। আমার শুধু একটিই চাওয়া- জাতির জনকের কন্যা মাননীয় প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এ জন্য যে যার প্রর্যায় থেকে দেশের জন্য ও দেশের মানুষের জন্য সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে। তবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ আরও উন্নতির শিখরে পৌঁছে যাবে।
ভিডিওতে দেখুন :