মেহেদী হাসান

  ০৪ জুন, ২০২২

পৃথিবীর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক ও শয়তানি সংগঠন ‘ফ্রিম্যাসনারি’!

ছবি: ফ্রিম্যাসনারি হল

ফ্রিম্যাসনারি বিশ্বের প্রাচীনতম গুপ্ত সংগঠন। যার উদ্ভব হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার অব্দে, জেরুজালেমের টেম্পল অভ সলোমন-এর কারিগরদের হাত ধরে।

যারা ধারণ করেন বিশ্বের প্রাচীনতম রহস্যময় জ্ঞান। যাদের সঙ্গে জড়িত মধ্যযুগের কুখ্যাত নাইট টেম্পলারদের বিচিত্র অনৈক কর্মকান্ড, ষোড়শ শতকের ইউরোপের জ্ঞানদীপ্তির যুগ বা ‘এজ অব এনলাইটমেন্ট’ এবং সপ্তদশ শতকের ‘ম্যাসনিক গিল্ড’ বা রাজমিস্ত্রিদের সংঘ।

ছবি: মধ্যযুগীয় ফ্রিম্যাসনারি

অতঃপর সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সমাজবিপ্লবের পেছনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল এই সংগঠনটি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণকারী বলে মনে করা হয় এ ফ্রিম্যাসনারিকে। এর সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রখ্যাত ফরাসি লেখক ভলতেয়াল, জার্মান সঙ্গীতবিদ মোজার্ট, মার্কিন বৈজ্ঞানিক বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে বর্তমান কালে প্রাক্তন ‘যুদ্ধাপরাধী’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশসহ বহু নামিদামি ব্যবসায়ী ও আভিনয় শিল্পীরা।

মূলত ইহুদীদের হাত ধরে সংগঠনটির উতপত্তি হলেও এটা এখন আর তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এদের মূল কাজ হলো ইশ্বরের বিরুদ্ধে শয়তানকে সহায়তা করা এবং সারা পৃথিবীর ধর্মীয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনে পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করা। বলা হয়ে থাকে সারা পৃথিবীর রাজনৈতিতে একক আধিপত্য করে থাকে এই সংগঠনটি। উপাসক হিসেবে তারা শয়তানকে স্মরণ করে থাকে।

কিন্তু এমন একটি রহস্যময় গুপ্ত গোষ্ঠীর উদ্ভব এবং ইতিহাস সম্বন্ধে আমাদের অনেকেরই অজানা।

পৃথিবীর সকল ধর্মের শয়তান বা অপদেবতার কথা উল্লেখ আছে। যারা কিনা মানুষকে খারাপ পথের দিকে প্রলুব্ধ করে। প্রশ্ন আসতেই পারে, শয়তানের উপসনা আবার কেউ করে নাকি। উত্তর হ্যাঁ, শয়তান এর উপসনার গ্রন্থ ‘কোডেক্স জিগাস’ যা কিনা শয়তান নিজে লিখেছিল এমনটাও উল্লেখ আছে।

বর্তমান ফ্রিম্যাসনারিরা নিজেদের সমাজ গড়ার কারিগর মনে করে। সারা পৃথিবী জুরে এদের রয়েছে অসংখ্য গুপ্ত অফিস। সেসব স্থান থেকে তারা তাদের কর্য পরিচালনা করে থাকে। ধারণা করা হয়ে থাকে, পৃথিবীতে এমন কোন দেশ নেই যেখানে তাদের কার্যক্রম হয় না।

১৬-১৭ শতকের কোনো একটা সময় থেকে লন্ডনের কয়েকটি লজে নিয়মিত কৃত্যানুষ্ঠান শুরু করেছিল ফ্রিম্যাসনারিরা। তবে অজ্ঞাত কারণে তাদের এই অনুষ্ঠান স্থগিত হয়ে গিয়েছিল মাত্র অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে। এরপর ১৭১৭ সালের দিকে লন্ডনের চারটি পুরাতন ফ্রিম্যাসন লজ একত্রিত হয়ে একটি গ্র্যান্ড লজ গঠন করলে তাদের তত্ত্বাবধানে ব্রিটেনের নানা স্থানে সংগঠনটি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে দেখা যায়। তখন দেশের নানা প্রান্তের মানুষ এই সংগঠনটিতে যুক্ত হতে শুরু করে।

প্রাথমিক দিকে ধর্মীয় মতাদর্শের মানুষ এই সংগঠনটির সঙ্গে সেভাবে যুক্ত হতেন না। পক্ষান্তরে বিজ্ঞানচিন্তার পাশাপাশি মুক্তমনের অধিকারী ব্যক্তিদের বেশিরভাগ লজমুখী হতে দেখা যেতো। সেখানে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ অনুষ্ঠান এবং ভোজের আয়োজন করা হতো।

একেবারে শুরুর দিক থেকেই বিশ্বের নানা প্রান্তে এই সংগঠনটি জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্রিম্যাশনারিদের মধ্য বিভিন্ন পদবি বা ডিগ্র রয়েছে। যেমন ১১ ডিগ্রি, ২২ ডিগ্রি ও ৩৩ ডিগ্রি। মূলত তাদের এ পদবি প্রদান করা হয় শয়তানি বিদ্যার চর্চার উপর। যে যত বেশি এ বিদ্যা চর্চা করতে পারে তাকে তত বড় উপাধি দেয়া হয়। ৩৩ ডিগ্রি হলো তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ উপাধি। তাদের এই নাম্বারগুলো ব্যবহার করার কিছু কারণ রয়েছে। মূলত এই নাম্বারগুলো জাদুবিদ্যা ও জ্যোতিষী বিদ্যায় ব্যবহার করা হয়। তাছাড়াও মুসলিম ধর্মের অন্যতম শিক্ষাবিদ ইমাম গাজ্জালী (র.) বলেছিলেন যে, জাদুবিদ্যাতে নিম্নলোজি নাম্বারগুলো ব্যবহার করা হয়।

অতিতে অধিকাংশ বিজ্ঞানীরাই ছিল ফ্রিম্যাসনারি। তারা কাবাল্লাহ জাদুর মাধ্যমে অনেক তত্ব ও প্রযুক্তির আবিষ্কার করেছিল, যাকে অকাল বিজ্ঞান বলা হয়। বর্তমান যুগের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেটাফিজিক্স, কস্মোলজি এসবই কাবাল্লা যাদুর বিবর্তিত রূপ।

বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইনকে আমরা সবাই চিনি। যিনি বলেছিলেন বানর থেকে মানুষের সৃষ্টি হয়েছে। তার এই বিবর্তনের জন্য পৃথিবীতে কিছু বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছিল। যেমন নাস্তিক্যবাদ, বিবর্তনবাদ ইত্যাদি।

তার এই বিবর্তনবাদের মাধ্যমে প্রকাশ পায় যে, পৃথিবীতে খোদা বলতে কিছুই নেই। অথচ তিনি নিজেই একজন খোদার উপাসক ছিলেন। আর তার খোদা ছিল শয়তান। কেননা তিনি একজন ৩৩ ডিগ্রি ফ্রিম্যাশনারি ছিল। বলা হয় ৩৩ ডিগ্রি ফ্রিম্যাসনরা সরাসরি শয়তানের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। সুতবাং, বোঝাই যায় সয়ং শয়তান নিজেই তাকে এমন মতোবাদ দিতে আদেশ করেছিল।

কিন্তু বর্তমানে এই মতোবাদ সারা পৃথিবীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাইগুলোতে পড়ানো হয়।

৩৩ ডিগ্রি প্রাপ্ত আরেকজন ফ্রিম্যাসনারি আলবার্ড পাইক তিনটি বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন তার প্রথম দু’টি অনেকটাই মিলে গেছে। একটা নির্দিষ্ট ডিগ্রি অর্জন না করা পর্যন্ত সদ্স্যদের কোন তথ্যই দেয়া হয় না। বেশিরভাগ সদস্যরাই ৩০ ডিগ্রি পেরোতে পারে না। খুব কম সংখ্যকই ৩৩ডিগ্রির তকমা পায়।

ইলুমিনাতি সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি। মূলত ইলুমিনাতি ও ফ্রিম্যাশন সংঠন দুটি একই কার্য সম্পাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। যা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন করে পৃথিবীতে শয়তানের আইন প্রতিষ্ঠা করা।

রযার মর্নীও, একজন সাবেক ফ্রিম্যাশনারি। যিনি ১৯৮২ সালে ‘এ ট্রিপ ইন্টু দ্য সুপার ন্যাচারাল’ নামে একটি বই লিখেছিলেন এবং সেসময় তিনি মিডিয়াতে একটি তিন ঘন্টার সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। যেখানে তিনি বলেছিলেন, তার এক বন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করেছিল তিনি তার মৃত বাবা- মায়ের সাথে কথা বলতে চান কিনা! বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি এক গুপ্তস্থানে যান। সেখানে তিনি তার মৃত পিতা-মাতার সঙ্গে দুই ঘন্টা সময় কথা বলেছিলেন। অতঃপর তিনি এক ব্যক্তিকে দেখতে পান, যিনি নিজেকে দাজ্জাল দাবি করছিলেন এবং সবাই তার প্রশংসা করছিলেন।

এ বিষয়ে বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছিলেন যে, একটা সময় আসবে যখন ইবলিশ তোমাদের বলবে তাকে খোদা হিসেবে বরণ করতে। তিনি তোমাদের বলবে যদি আমি তোমার মৃত পিতামাতার সাথে তোমার দেখা করিয়ে দেই তাহলে তুমি আমাকে খোদা মানবে? অতঃপর সে তোমার পিতা-মাতার রূপ নিয়ে তোমার সামনে আসবে।

বর্তমানে এই সংঠগুলো তাদের লক্ষ্য অর্জনে প্রতিনিয়ত আগিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত তাদের ফেলে রাখা ফাদে পা দিচ্ছি, পরোক্ষভাবে তাদের সাহায্যও করছি। যার পুরোটাই হচ্ছে আমাদের অজান্তে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ফ্রিম্যাসনারি,পৃথিবী,শয়তান,চার্লস ডারউইন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close