এম এ মাসুদ

  ০১ ডিসেম্বর, ২০২১

বসতবাড়ির দেড় শতকেই মিলবে স্বাদ ও পুষ্টি

দেহের পুষ্টি ও শরীরকে সুস্থ, সবল রেখে কর্মক্ষম জীবনযাপনে পুষ্টির গুরুত্ব অপরিসীম। আর পুষ্টির চাহিদা পূরণে সেই ভূমিকা পালন করে শাকসবজি। বিশেষ করে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ লবণের উৎস হিসেবে তা বিবেচিত। এসব খাদ্য উপাদানের প্রয়োজন অল্প হলেও তা শরীর গঠন এবং বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে অত্যাবশ্যকীয়। এ কারণেই আমাদের খাদ্য তালিকায় দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে সবজির গুরুত্ব।

আমরা প্রায়শই বলে থাকি, শাকসবজিসহ বিভিন্ন খাদ্যে আগের মতো আর স্বাদ নেই। সত্যিই কী তাই? আসলে ব্যাপারটি ঠিক তা নয়। মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার খাদ্যের প্রাকৃতিক স্বাদ নষ্টের মূল কারণ। আজকাল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হচ্ছে বিভিন্ন শাকসবজির চাষ। অধিক ফলনের আশায় কৃষকরা শাকসবজি ক্ষেতে প্রয়োগ করছেন মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। এতে করে বিভিন্ন শাকসবজি হারাচ্ছে তার নিজস্ব স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিগুণ। ফলে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ছে বটে কিন্তু অনিরাপদ হয়ে উঠছে আমাদের খাদ্য। অথচ প্রাণ-উচ্ছ্বল, সুখি জীবনযাপন ও কাজে শক্তি বা মনোনিবেশ করার জন্য চাই সুস্বাস্থ্য। আর সুসাস্ব্যের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ খাদ্যের।

মানুষ কেবল মাত্র বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য গ্রহণ করে না, বরং খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে কিভাবে সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকা যায় সেটিই মূল লক্ষ্য। কেননা, নির্ভেজাল খাদ্য মানুষকে সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখার মাধ্যমে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করে, কমে মৃত্যুহার। শুধু তাই নয়, পুষ্টিকর খাবার বাড়িয়ে দেয় মানুষের কর্মক্ষমতা যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক। ফলে মানবসম্পদের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হয়, আসে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা।

সাম্প্রতিককালে দেশে খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের অনুকূল কৃষিনীতি ও প্রণোদনায় কৃষক ও কৃষিবিদদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আমাদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে অবদান রাখছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে তৃতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম, আলু উৎপাদনে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে থেকে বিশ্বে প্রশংসিত। কিন্তু নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। এর কারণ আমাদের সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে।

সমাজে এক শ্রেণির অসাধু এবং অতি মুনাফালোভী মানুষের স্বাস্থ্যের ভালোমন্দ দিক বিবেচনা না করেই অতি মুনাফার আশায় বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বিশেষ করে খাদ্যশস্যে ভেজাল দিচ্ছে। নকল বা নিম্নমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন করছে। দ্রুত পচনশীল খাদ্যপণ্য টাটকা রাখার জন্য তাতে বিষাক্ত ফরমালিন ও ক্ষতিকর কেমিক্যালস ব্যবহার করে বাজারজাত করছে। আবার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদ করা সবজি ক্ষেতে প্রয়োগ করছে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক।

কৃষি বিভাগ বলছে, কীটনাশক প্রয়োগের অন্তত দু'সপ্তাহ আগে ওই সবজি খাওয়া নিরাপদ নয়। অথচ কীটনাশক প্রয়োগের পর সপ্তাহ যেতে না যেতেই শাকসবজি বাজারজাতকরণ করা হচ্ছে। নিরাপদ নয় মাছ, মাংস, আম, জাম, লিচু, তরমুজ, কাঠালসহ বিভিন্ন ফল, সেগুলোও ফরমালিন মিশিয়ে বিক্রি হচ্ছে। কীটনাশকযুক্ত সবজি আর ফরমালিনযুক্ত ফলমুল কিনে ভোক্তারা শুধু প্রতারিতই নয়, বরং খেয়ে ক্রমান্বয়ে অসুস্থ এবং রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। কেবল খাদ্য নিরাপত্তাই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়, বরং সে খাদ্য হতে হবে নির্ভেজাল, নিরাপদ ও পুষ্টিগুণ সম্পন্ন। যে খাদ্য গ্রহণ করে শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়, বিভিন্ন অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগে, মহিলা এবং শিশুরা রক্তশূন্যতায় ভোগে, ভিটামিন 'এ'র অভাবজনিত রোগে ভোগে, শিশুরা অন্ধত্ব বরণ করে, স্বাস্থ্যহানি ঘটে, কর্মদ্যোম ও কর্মক্ষমতা কমে যায় সে খাদ্য গ্রহণ কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়।

তবে, আশার কথা হলো শুধু খাদ্য উৎপাদনে নয়, পুষ্টির ক্ষেত্রেও প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। গত জুৃলাই প্রকাশিত জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খর্বাকৃতির (স্টান্টিং) প্রবণতা ২০১২-১৩ সালের ৩৬ শতাংশ থেকে ২০১৯-এ ২৮ শতাংশে নেমেছে। তবে বাংলাদেশে এখনো পুষ্টির পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল বা অনিরাপদ খাদ্য খেয়ে রক্তচাপ, লিভার, কিডনি, হৃদরোগ ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে মানুষ, বাড়ছে অকাল মৃত্যুর হার।

যা হোক, চার কিংবা পাঁচ সদস্যের পরিবারের বছরব্যাপী পুষ্টির চাহিদা পুরণ করতে পারে অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙ্গিনার মাত্র দেড় শতক জমি। চাষ করা যেতে পারে লালশাক, পুঁইশাক, পালংশাক, পাটশাক, গীমা কলমি, ডাঁটা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মূলা, গাজর, ঢেঁড়স, পেঁয়াজ, রসুন, টমেটো ইত্যাদি। এক্ষেত্রে কালিকাপুর মডেলটি অনুসরণ করা যেতে পারে। মডেলটি অনুসারে সারাবছর ৮ থেকে ১৪ রকমের শাকসবজি অনায়াসে চাষ করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্য বেশি হলে প্রয়োজনে বেড বা সবজির সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। প্রতিটি বেডে—প্রথম বেড বা খণ্ডে : মুলা বা টমেটো উঠানোর পর পর্যায়ক্রমে লালশাক, পুঁইশাক চাষ করা যেতে পারে। দ্বিতীয় খণ্ডে : বেগুণ, ঢেঁড়স। তৃতীয় খণ্ডে : পর্যায়ক্রমে পেঁয়াজ, গাজর, কলমিশাক ও লালশাক। চতুর্থ খণ্ডে : পর্যায়ক্রমে রসুন, গাজর, লালশাক, কলমিশাক এবং পঞ্চম খণ্ডে : ফুলকপি বা বাঁধাকপি, লালশাক, করলা পর্যায়ক্রমে চাষ করতে হবে।

এ ছাড়া আমরা আমাদের ইচ্ছে বা পদন্দমতো বিভিন্ন বেডে বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করতে পারি। দেখেছি উপজেলা কৃষি বিভাগে প্রশিক্ষণ নিয়ে এক দম্পতিকে কালিকাপুর মডেল অনুযায়ী রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত শাকসবজির চাষ করে চার সদস্যের পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে। দেখেছি স্বাদ,গন্ধ ফিরে পেয়ে ওই দম্পতি ও তার দুই সন্তানের উচ্ছ্বাস।

মনে রাখতে হবে, বিষমুক্ত সবজি খাদ্য তালিকায় রাখতে চাইলে, হারানো স্বাদগন্ধযুক্ত খাদ্য ফিরে পেতে চাইলে, নিজের পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে চাইলে এবং সর্বোপরি নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে চাইলে নিজেকেই শাকসবজি উৎপাদন করতে হবে। তবেই গড়ে উঠবে আমাদের সুস্থ জীবন।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী [email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কৃষি,আমার আমি,খাদ্য,শাকসবজি
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close