reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১১ এপ্রিল, ২০২৬

অর্থনীতি প্রসারে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রনীতি প্রয়োগের সুফলতা

সামষ্টিক অর্থনীতিতে পরিবর্তন ও সম্ভাবনা বিদ্যমান, দেশের অগ্রগতিতে মৃদু হাওয়া প্রবাহমান এরপরেও অনিয়ম,অত্যাচার,শোষণ ও বৈষম্যে, সমাজবিরোধী অপসংস্কৃতি অর্থনীতিতে আশানুরূপ সুফলতা বয়ে আনতে পারছে না। দেশে অনিয়ম এবং দুষ্কৃতিকারীর দুষ্ট চক্র শ্রেণি বৈষম্য সৃষ্টি করছে, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় অন্তরায় এই ধরনের কুচক্রি মহল সম্পদ কুক্ষিগতকরণের লালসার লিপ্ত রয়েছে। এদেশের অর্থনীতি নির্দিষ্ট কিছু সূচকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে সাথে পরিবর্তন হলেও অর্থনীতির চাকা ধীরগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতি শুধুমাত্র কিছু কুক্ষিগত দুষ্কৃতিকারীর কাছে জিম্মি থাকবে তা দেশের জনগণ মেনে নিতে পারছে না। দেশে কালোবাজারি ও দুর্নীতি দিন দিন বাড়ছে, সিন্ডিকেট ভাঙতে পলিসি বাস্তবায়ন করা দরকার; ন্যায়, নীতি ও আদর্শগত পলিসি গঠন এখনও সম্ভব হয়নি, যার দরুন সিন্ডিকেট পর্যায়ক্রমে তাঁদের ডালপালার বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে।

দেশের সাধারণ মানুষ, যারা দেশকে রিপ্রেজেন্ট করেন, তাঁরা সমাজের এ ধরনের আগাছাদের কাছ থেকে নিজেদের অধিকার আদায়ে সমাজের সকল স্তরে মেধা,মননশীলতা ও দক্ষতার মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ রেখে চলেছেন। শ্রদ্ধা জানাই তাঁদের, যাদের সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও বিসর্জন স্বাধীন রাষ্ট্রের মুক্তিকামী মানুষদের মুক্তির অন্বেষণ আজও খুঁজে ফিরে বেড়াচ্ছে। কুচক্রের অবৈধ সম্পদশালী হওয়ার বিরুদ্ধে ৯০ এর স্বৈরাচার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান সবকিছুই যেন তাদের কৌশলের কাছে শুধুই তামাশা, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত দোসরা আবার যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এদের দুর্নীতির কালো থাবা গ্রাস করেছে দেশের অর্থনীতি, আমাদের সমাজের খেটে খাওয়া, কর্মজীবী ও শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানেও প্রভাব ফেলছে। শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে কালোবাজারি, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিবাজদের অর্থের কু-প্রভাব সুস্পষ্টভাবে বাধা সৃষ্টি করছে। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো- অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, সম্পদের সুষম বন্টন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষার উপর জোর দেয়া, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, অবহেলিত মানুষদের আয়ের উৎস তৈরি, উৎপাদশীল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যবস্থা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনমুখী অর্থনীতির দিকে নিয়ে যেতে প্রনোদনা, সমাজের অবহেলিত মানুষদের বিনা সুদে ঋণ সুবিধা প্রদান এবং কৃষি ও শিল্প কারখানায় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের উপযোগী কর্মমুখী ও গণশিক্ষা গ্রহণে অনুপ্রাণিত করা, বয়স্ক ও সুবিধাবঞ্চিতদের ভাতা প্রদান করা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল যোগানে বিনে সুদে ঋণ ব্যবস্থা, টেকসই উন্নয়ন কৌশল প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা ও নীতি প্রয়োগ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক প্রতিবছর মোট সাধারণত জিডিপির (GDP) ১০ শতাংশের নিচে কর ও রাজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আসে, তা জিডিপির(GDP) রেশিও অনুপাতে বহুলাংশ‌ে কম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন এবং বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ভয়াবহ কম। রাজস্ব আরহণ রাষ্ট্রের সরকারের সর্বোচ্চ নিয়ামক, যা রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরির সকল ধরনের পথকে প্রশস্ত করতে পারে, যদি দেশে করদাতার পরিমাণ বৃদ্ধি প্রক্রিয়া আরও উন্নতিকরণ সম্ভব হয়। বৈষম্য কিন্তু সাধারণ মানুষ সৃষ্টি করছে না, সৃষ্টি করছে যে সকল মানুষের আয়ের উৎস অধরা রয়ে গেছে, যাদের আয়ের উৎস অগোচর- রাষ্ট্রের নিয়ম বহির্ভূত অযাচিত আগাছাদের আয়ের উৎসে রাষ্ট্র ও সরকারের রাজস্ব আয় নীতির প্রয়োগ না হওয়ায় সাধারণ জনগণকে রাজস্ব খাত থেকে নীতি সহায়তা প্রদান ও জিডিপি উন্নতকরণ ধীরগতির সম্মুখীন হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি ৫৫ বছর পরেও ৬০০ বিলিয়নের কাছাকাছি। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৪.৬ শতাংশের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে কমে ৩.৯ শংতাশ হতে পারে।

সরকারের বৈষম্যহীন নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ খাত, পরিষেবার খাত, কৃষি ও শিল্পখাতে সুষমনীতিতে বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগ পরিবেশে অপসংস্কৃতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার, বিনিয়োগকৃত অর্থ সঠিক খাতে ব্যবহার করে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অতি দ্রুত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলে এদেশের জিডিপি (GDP) ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নতিকরণে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনাই যথেষ্ট। দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনায় দেশের অবকাঠামোকে আরও মজবুত ও টেকসই করে পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার বাস্তব রূপ দিতে অঞ্চল ভিত্তিক ওয়েটেজ পদ্ধতি ব্যবহার হতে পারে পরিকল্পনার সঠিক প্রয়োগ।

অর্থনৈতিক চক্র সাধারণত চারটি পর্যায় নিয়ে গঠিত: সম্প্রসারণ, সর্বোচ্চ, সংকোচন এবং পুনরুদ্ধার। অর্থনৈতিক চক্রের পর্যায়গুলোর সময় নির্ধারণ পরিকল্পনার সুফল পেতে গুরুত্ব বহন করে। যদি দেশের অর্থনীতি প্রসার করতে সরকার গুরুত্ব দেয় তাহলে সম্প্রসারণ নীতি অবলম্বন করতে হয়। সেক্ষেত্রে সুদের হার কম থাকে, ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ নিয়ে তাদের ব্যবসার সম্প্রসারণ করতে পারে। উৎপাদনশীল অর্থনীতির দিকে ধাবিত হওয়া সম্ভবপর হয়। ভোক্তার কাছে পন্য কম মূল্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়। ভোক্তার পন্য ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। অবকাঠামো উন্নয়ন ও কার্যক্রম সম্প্রসারণে আরও কর্মী নিয়োগ করে ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। বেকারত্ব দূরীকরণের সাথে সাথে মানব সম্পদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। দেশীয় উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধি পায়। রপ্তানিমুখী বানিজ্যের প্রসার ঘটে। এদেশে অর্থনীতির সুফলতা পেতে সম্প্রসারণনীতির দিকে অগ্রসর হতে বর্তমানে সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যদিও নীতি সুদের হার ১০ শতাংশ রাখায় সম্প্রসারণ নীতি হতে সংকোচননীতির প্রয়োগ ঘটছে। মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণে সংকোচন নীতির সময় নির্ধারণ না করে সময়ক্ষেপন করলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। সুদের হার বৃদ্ধির ফলেই যে মূল্যস্ফীতি কমে এই পলিসি আমাদের দেশের মত অর্থনীতির দেশে প্রয়োগ হচ্ছে। যদি মূল্যস্ফীতি কমাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের উৎপাদন ও ভোক্তার চাহিদা, পণ্য সরবরাহকরণ, প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষক, শ্রমিকের মজুরি, নায্যতা ও পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিতকরণের কাজগুলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কর্তৃক তদারকির মাধ্যমে করা সম্ভব হলে নীতি সুদের হার দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয় না। নীতি সুদের হার বিনিয়োগ ভারসাম্য রক্ষায় উপযোগী পলিসি হলেও বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ ও বিনিয়োগের সুষম ব্যবহার নিশ্চিতকরণ সম্ভবপর না হলে দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। ফলে চাহিদা মোতাবেক পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকরণ হুম্মকির মুখে পড়ে। অর্থনৈতিক চক্রের প্রতিটি পর্যায় পোর্টফোলিওকে পুনঃভারসাম্য করার একটি উপায় হলো সেক্টর-ভিত্তিক এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ETF) এ বিনিয়োগ করা। এইভাবে, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি এক্সপোজার পেতে হলে চক্রের প্রবাদপ্রতিম ঋতু জুড়ে সক্রিয়ভাবে আপনার পোর্টফোলিও বৃদ্ধির উপায় খুঁজতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে বৈষম্যহীনভাবে উন্নতিকরণের আবশ্যকতা রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে পুনঃরুদ্ধার পর্যায়ে খেলাপি ঋণ সহজ শর্ত দিয়ে হলেও তফসিলিকরণের দিকে নজর দিতে হবে। এদেশের অর্থনীতি পুনঃরুদ্ধার পর্যায়ে রয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমান যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসতে যত ধরণের প্রশাসনিক ব্যবস্থা দরকার তা নিশ্চিতকরণ সম্ভব হলে নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথ আরও সুপ্রশস্ত হবে। সংকোচন নীতির ফলে অনুৎসাহিত হওয়া ব্যবসাগুলি আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। ফলে বৈষম্যহীন নীতি ও আদর্শ পুনর্জীবিতকরণ প্রক্রিয়া লক্ষ্যে কাজ করার পথ খুঁজে পাওয়া যায়। অর্থনীতি পুনঃরুদ্ধারে চাহিদা, জোগান, উপযোগ, উৎপাদন, বাজার, আয় ও ব্যয়ের সংকোচন, রপ্তানি, বাজার নিয়ন্ত্রণ, অর্থ ও ব্যাংক ব্যবস্থায় মনিটরিং জোরদার সম্ভব হলে সুশাসনের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত অর্জন দেশি ও জাতিকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে পারে।

দেশের শ্রমবাজার বড় পরিসরে বিদেশি নেটওয়ার্ক এ সংযুক্ত হওয়া জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে ইউনাইটেড আরব আমিরাত (ইউএই), মধ্য প্রাচ্য ও সৌদি নির্ভরশীলতা থাকায় বৈদেশিক মুদ্রা মুসলিম দেশগুলো হতে রেমিটেন্স বেশি আসছে। দেশের শ্রম বাজার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিদেশি নেটওয়ার্ক প্রসারিত করে ইউরোপ, রাশিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুর, ইউনাইটেড কিংডম (ইউকে) ও ইউনাইটেড স্টেড অব আমেরিকা (ইউএসএ) দিকে ঝুঁকতে হবে। দক্ষ জনশক্তি গঠনে উন্নত রাষ্ট্রের চাহিদা অনুসারে জনশক্তিকে প্রশিক্ষিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি জোরদার করা দরকার। বিদেশি ভাষায় পারদর্শীতা অর্জনে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম ইন্সটিউটট চালু করা প্রয়োজন। বিদেশমুখী জনশক্তির কর্মসংস্থান তৈরি ও উৎসাহ প্রদান করলে এদেশের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন সম্ভব। জনশক্তি রপ্তানির ফলে এদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবাধ প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে। প্রবাসীদের কল্যাণে প্রতি বছর এদেশে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্থনীতিতে যুক্ত করতে পারলে অর্থনীতির চাঁকা ঘুরে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে সময়ক্ষেপন করতে হবে না। সুষ্ঠু নীতি প্রবাসীদের আয়ের উপযুক্ত ব্যবহার আমদানি নির্ভরশীলতা কমাতে পারে। বিদেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর চাহিদা মোতাবেক জনশক্তিকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোতে জনশক্তি অতি সহজে প্রেরণ করা সম্ভব। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনতে আমদানি নির্ভর পণ্যগুলো দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরির জন্য চীনের প্রযুক্তিকে আত্মস্থ করতে প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জয়েন্ট পার্টনারশীপ ফোরাম গঠন করে দেশে অর্থনীতির স্বনির্ভরতা অতি দ্রুত আনায়ন সম্ভব। যদিও বাংলাদেশ চীনের নেতৃত্বাধীন বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (RCEP)-এ যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে। চীনের মুক্তদ্বার নীতি (Open Door Policy) বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সাথে সমান সুযোগ দিয়ে ব্যবসা করতে আগ্রহ এখনও বিদ্যমান। চীনে মাও সে তুং-এর নীতি ফলে ভূমি সংস্কার, দ্রুত শিল্পায়ন, বৈষম্যহীন ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করে চীনকে আধুনিক উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছেন তেমনি আব্রাহাম লিংকনের নীতির ফলে দাসপ্রথা ও পুজিঁবাদী সমাজ ব্যবস্থার লাগাম টেনে মানবতার কলঙ্ককে চিরতরে বিদায় দিয়ে ফেডারেল ক্ষমতায় মজবুত হয়েছিল আমেরিকা। একইভাবে রাশিয়ার জারতন্ত্রের শাসক পিটার দ্য গ্রেট আধুনিক সামাজ্যবাদী বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে ক্ষমতায় ভারসাম্য বজায় রেখে বন্দরভিত্তিক রপ্তানিমুখী অর্থনীতি, বিদেশির পণ্যের উপর অধিক শুল্কায়ন ও শিল্পায়নের মাধ্যমে ইউরোপের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিনত করেন।

সিস্টেম বা পলিসি কোন বিধিবদ্ধ লিপিধারা আবদ্ধ রাখা ঠিক নয়। রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় সঠিক সময়ে সঠিক নীতি অবলম্বন রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। বিশ্বের উন্নত সুপার পাওয়ার রাষ্ট্রগুলোর শক্তিশালী হয়ে ওঠার পেছনে নেতৃত্ব ও নীতি আর্দশ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। আমাদের দেশের নীতি আর্দশ ও মূলনীতিগুলো শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে ধার করা, একই ধরণের ফ্রেমওয়ার্ক বা সিস্টেম ফলো করলেও কেন রাষ্ট্র ও সরকার একই ফল পাচ্ছে না তা সুস্পষ্ট কারণ হলো-পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে হঠকারিতা ও নিয়ন্ত্রণের চাবি অদক্ষ, অযোগ্য, অসৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের নীতিনির্ধারকের হাতে তুলে দেওয়ার অপসংস্কৃতি যেন বহমান নদীর স্রোতের গ্রাসে বিলীন কুল-কিনারাহীন দুর্নীতি,ঘুষ, সম্পদ লুণ্ঠন, অতি মুনাফা লোভী আগন্তুক অপরাধীদের কারসাাজি।

অবৈধ অর্থ উপার্জনের প্রভাব সমাজে কতটা শ্রেণি বৈষম্য সৃষ্টি করছে তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে স্বল্প উপার্জনক্ষম পেশাজীবি, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুড়ায়। আয় দারিদ্র (Income Poverty) ও মানব দারিদ্র (Human Poverty) কমাতে আয় বৈষম্য দূরীকরণ যেমন প্রয়োজন তেমনি উৎপাদনশীল চাকুরির সুযোগ তৈরি এবং গ্রামীণ ও শহুরে মানুষের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার সমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ প্রতি বছর ৬ শতাংশ করে বৃদ্ধি পেলেও সুবিধাবঞ্চিত গবিরের কাছে বিনিয়োগের সুবিধা অধরাই রয়ে গেছে। প্রতি বছর ৩ লক্ষাধিক কোটি টাকার বেশি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা প্রদান করা হলেও পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটছে না, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে, কৃষি ও কৃষিজাত পন্য উৎপাদন স্থবির অবস্থায় রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি সবার জীবনে সমানভাবে সুফল না আনে, সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি টেকসই হয়না। দারিদ্রতা মানে যদি হয় পছন্দ ও সুযোগের অভাব তাহলে দারিদ্রতা কমিয়ে আনতে গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাসরত ৭৫ শতাংশ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোর বিনিয়োগ প্রান্তিক ও গ্রামীণ কেন্দ্রিক হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করা প্রয়োজন।

আয় বৈষম্য ও ভোগ বৈষম্য যত বাড়ছে, দেশের দারিদ্রতার হার তত বাড়ছে। দেশের দারিদ্রতার হার ২০২৬ সালে ২১.২ শতাংশ উপরে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৯.৩ শতাংশ যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৬ সালে গিনি সহগ ০.৫০০-এর কাছাকাছি (আনুমানিক ০.৪৯৯ বা তার বেশি) পৌঁছেছে। গ্রামীণ এলাকার গিনি সহগ ০.৪৪৬ এবং শহরাঞ্চলে গিনি সহগ ০.৫৩৯ এর কাছাকাছি হওয়ায় উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশে আয় ও ভোগ বৈষম্য, সুযোগের সমতায় গিনি সহগ সুবিধাবঞ্চিত অসহায় হতদরিদ্র,গরীবদের ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। দুর্নীতি, লুটপাট ও দখলদারিত্বের মাধ্যমে সম্পদশালী ও ধনী হওয়ার প্রবনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় গিনি সহগের বৈষম্য সূচকে বাংলাদেশ উচ্চ ঝুঁকির দেশে পরিনত হয়েছে। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সম্পদ ও আয় বৃদ্ধিতে বৈষম্য স্পষ্ট পরিলক্ষিত হওয়ায় উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত করতে বৈষম্যহীন নীতি-নির্ধারণ, আর্দশগত পরিবর্তন এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

লেখক ও গবেষক: মোহাম্মদ আল-এমরান, ব্যাংকার, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

ই-মেইল: [email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়