মানবতার অপমৃত্যু

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৩:৩৭

সম্পাদকীয়

একে আমরা কী বলতে পারি। দুর্ঘটনাকবলিত মৃত্যু, না হত্যা! যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, কোনো সমীকরণে এর কোনো ফলাফল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বলা হচ্ছে, ঘাতক বাসের ধাক্কায় মায়ের কোল থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়ে আট মাসের শিশু আকিফার মৃত্যু হয়েছে। কিংবা বলা হয়েছে বেপরোয়া বাসের ধাক্কায়।

ঘাতক চিহ্নিত করতে বরাবরই আমরা ভুল করছি। অথবা বলা যায়, আমাদের ভুল হচ্ছে। বাস একটি জড়বস্তু। জড়রা কখনোই পরিকল্পনা অথবা সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়। অ্যাকশনে যেতেও সক্ষম নয়। জড়দের পেছনে এমন একজনকে থাকতে হয় যে বা যিনি জড়কে পরিচালনা করতে পারে অথবা পারেন। যার বা যাদের পরিকল্পনা অথবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে।

কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হার মোড়। মা রিনা বেগম শিশুসন্তান আকিফাকে কোলে নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। রাস্তা পার হওয়ার সময় বাসটি ছিল দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ করেই বাসটি চলতে শুরু করে পেছন থেকে মাকে ধাক্কা মারে। কোল থেকে ছিটকে রাস্তায় গিয়ে পড়ে আকিফা। তারপর আকিফার মৃত্যু। এ মৃত্যুকে আমরা আকিফার মৃত্যু বলতে পারি না। এই মৃত্যুকে অনেকে অপমৃত্যুও বলে থাকে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এখানে আকিফার মৃত্যু হয়নি। হয়েছে মানবতার অপমৃত্যু।

বাসতো নিজে চলতে পারে না। পেছনে একজন চালক অথবা পরিচালক থাকে। চালক সচল হলেই বাসও সচল হয়। এ ক্ষেত্রে ঘাতক যদি কাউকে বলতেই হয়, তাহলে চালকই হবে সেই ঘাতক। বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কে যে ঘাতক প্রতিদিন প্রায় দুই ডজন পথচারীকে হত্যা করছে। এদের থামানোর ক্ষমতা যেন কারো নেই। এরা অপ্রতিরোধ্য। মানবতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে এরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে, ভোগবাদী সমাজের এরাই যোগ্য প্রতিনিধি। মানবতার কফিনের ওপরে দাঁড়িয়ে উল্লাস করাই এদের ধর্ম।

লুটেরাপুঁজির ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে এদের বেড়ে ওঠা। একদিনে এরা এখানে এসে দাঁড়িয়েছে, স্বরূপে নিজেদের শক্তির বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে—তা নয়। দীর্ঘ অনুশীলনের ফসল আজ তারা ঘরে তুলছে। আজ তারা অপ্রতিরুদ্ধ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিপরীতে মানবতার পক্ষের শক্তি যেন এক অলৌকিক ঘুমের মধ্যে সময়কে পার করেছে।

আমরা মনে করি, সামাজিকভাবে আজ আমরা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মানবতার পক্ষের মানুষগুলোকে ঘুমের বিছানা ছেড়ে উঠে আসতে হবে। বলতে হবে, আমরা লুটেরাপুঁজির সব বন্ধন থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চাই।

পিডিএসও/তাজ