মো. শাহ আলম, খুলনা

  ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল বন্ধ, তবু ব্যয় মাসে ১৪ লাখ টাকা

একটা সময় ছিল তখন নিউজপ্রিন্ট মিলের সাইরেনে ঘুম ভাঙত শিল্পাঞ্চল খালিশপুরের কয়েক লাখ মানুষের। ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর নিউজপ্রিন্ট মিলটি সর্বশেষ সাইরেন বাজিয়ে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তারপর গত ১৫ বছরেও আর সাইরেন বাজেনি এশিয়ার বিখ্যাত খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলছে মিলটি চালুর প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি। মিলটি চালুর প্রত্যাশার মধ্য দিয়েই দিন কাটছে এখানকার শ্রমিক-কর্মচারীদের। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো আশার খবর নেই। এদিকে, অযতœ-অবহেলায় মিলের মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া মিলটি বন্ধ থাকলেও বিদ্যুৎ বিল এবং নিরাপত্তাসহ অন্যান্য ব্যয় মিলে প্রতি মাসে ১৪ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে।

৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিউজপ্রিন্ট মিলের স্থানে ৪৫-৪৮ হাজার টন উৎপাদন ক্ষমতার নতুন আরেকটি কাগজ কল তৈরির কাজ দীর্ঘদিন ধরে প্রক্রিয়াধীন। এর উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। এ ছাড়া মিলের জমিতে নতুন করে একটি কাগজকল স্থাপন এবং অব্যবহৃত ৫০ একর জমিতে (৭৫০-৮০০) মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, গত ৪ সেপ্টেম্বর বিসিআইসি নিউজপ্রিন্ট মিল অভ্যন্তরের ৫০ একর জমি, স্থাপনা ও গাছের মূল্য ৮৬৪ কোটি ২৪ লাখ ১৩ হাজার ৬২০ টাকা নির্ধারণ করে একটি চিঠিতে প্রস্তাবনা দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতে ৫০ একর জমি নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির কাছে বিক্রির পরিবর্তে সমমূল্যের টাকার শেয়ার খুলনা নিউজপ্রিট মিলকে প্রদানের জন্য প্রস্তাব দেয় বিসিআইসি।

মিলের শ্রমিক মো. আবদুর রফিক বলেন, মিল চালাকালে শ্রমিক-কর্মচারীদের ব্যাপক সমাগমে এলাকা জাঁকজমপূর্ণ ছিল। কিন্তু এখন খাঁ-খাঁ করে। সেই জৌলুস আর নেই। সাইরেনও বাজে না। শুনেছি মিল চালু করা হবে। অনেক শ্রমিক আশায় বুক বেঁধে রয়েছে। অনেকে ভিন্নকর্মে চলে গেছে। অনেকে কাজ করতে না পেরে বেকার পড়ে রয়েছে। তিনি অবিলম্বে মিলটি চালুর দাবি জানান।

মিলের ভারপ্রাপ্ত প্রকল্পপ্রধান মো. নুরুল্লাহ বাহার বলেন, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের স্থানে ৪৫ হাজার টন উৎপাদন ক্ষমতার একটি কাগজ কল তৈরির প্রস্তাবনা শিল্প মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। বন্ধ মিলে চারজন কর্মকর্তা ও ১২ জন কর্মচারী এবং নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী, আনসারসহ প্রায় ৫০ জন মিলের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, মিলটি বন্ধ থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে ১৪ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে।

মিল সূত্রে জানা গেছে, নগরীর খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের ভৈরব নদীর তীরে ৮৭ দশমিক ৬১ একর জমির ওপর ১৯৫৯ সালে স্থাপিত হয় খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল। এর মধ্যে ৩৪ দশমিক ৪৩ একর জমিতে মূল মিল অবস্থিত। বাকি প্রায় ৫৩ একর জমিতে খুলনা নিউজপ্রিন্ট স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা, কর্মচারী ও শ্রমিকদের কোয়ার্টার, খেলার মাঠ, বিনোদনকেন্দ্রসহ অন্যান্য স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ একর জমি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিক্রি করে দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিউজপ্রিন্ট মিলের অব্যবহৃত জায়গা বেছে নেওয়া হয়।

২০১৫ সালের ২২ মার্চ বোর্ডের সভায় এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী গেল বছর বিসিআইসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সোবহান তালুকদারের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল জমি পরিমাপ শেষে করে। পরিমাপকৃত জমির মধ্যে রয়েছে আবাসিক এলাকা, নিউজপ্রিন্ট স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, বিনোদনকেন্দ্র, খেলার মাঠ, ফরেস্ট অফিস, স্টোর ও জেটি, গাড়ির গ্যারেজ এবং খেলার মাঠ। এই ৫০ একর জমি এবং জমিতে বিদ্যমান গাছ ও স্থাপনা ৮৬৪ কোটি ২৪ লাখ ১৩ হাজার ৬২০ টাকা মূল্যে নির্ধারণ করা হয়। এই জমিতে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (৭৫০-৮০০) মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে। এর জ্বালানি হিসেবে ভারত থেকে আমদানি করা এলএনজি গ্যাস (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ব্যবহার করা হবে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০১৪ সালের জুলাই মাসে ভারত থেকে আমদানি করা এলএনজি গ্যাস দিয়ে খুলনায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। ওই বছরের জুন মাসে ভারতের গ্যাস কর্তৃপক্ষ লিমিটেডের (জিএআইএল) সঙ্গে সরকারের সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ভারতের গ্যাস পাইপলাইন কলকাতার আড়ংঘাটা পাইপলাইন স্টেশন থেকে ৮০ কিলোমিটার পেট্রাপোল হয়ে বেনাপোল দিয়ে যশোর পর্যন্ত ৪৬ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। সেখান থেকে গ্যাস আনা হবে খুলনায়। এ জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।

"পিডিএসও/তাজ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
খুলনা নিউজ প্রিন্ট,নিউজপ্রিন্ট,খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল,থুলনা
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist