নওগাঁ প্রতিনিধি

  ০৯ ডিসেম্বর, ২০২১

স্কুলে নিয়োগ পেলেন প্রধান শিক্ষকের সেই প্রার্থী!

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কোলা বিজলী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়ম না মেনে প্রধান শিক্ষকের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন- বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি সদস্য দুলাল হোসেনের স্ত্রী এবং কোলা গ্রামের বাসিন্দা মুনিয়া আক্তার। পরীক্ষার পর জটিলতা তৈরি হওয়ায় নিয়োগ দিবে বলে জমি দাতা পরিবারের সদস্যের থেকেও কৌশলে পাঁচ লাখ টাকা নেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম।

জানা গেছে, কোলা বিজলী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৬৪ সালে অলিখিতিভাবে কোলা গ্রামের মরহুম রহমতুল্লাহ মন্ডলের ১৩ শতাংশ জমির ওপর বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া আরও দুই শতাংশ জমি বিদ্যালয়ের নামে লিখে দেওয়া হয়। সে সময় মরহুম রহমতুল্লাহের ছেলে দছির উদ্দিন মন্ডলের চাকরি দেওয়ার কথা থাকলেও কয়েকমাস তাকে হয়রানির পর অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সম্প্রতি বিদ্যালয় থেকে আবারও তিনটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে আয়া পদে ১০ জন প্রার্থী আবেদন করেন।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আয়া পদে দছির উদ্দিন মন্ডলের মেয়ে গোলাপি আক্তারকে চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য দুলাল হোসেনের স্ত্রী মুনিয়া আক্তারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

গত ২৯ নভেম্বর আয়া পদে ম্যানেজিং কমিটি সদস্য দুলাল হোসেনের স্ত্রী মুনিয়া আক্তার ও জমিদাতা পরিবারের সদস্য গোলাপী আক্তারসহ পাঁচজন পরীক্ষায় অংশ নেয়। পরীক্ষার আগেই প্রধান শিক্ষকের পছন্দের প্রার্থী মুনিয়া আক্তারকে চুড়ান্ত করা হয়েছে মর্মে বিদ্যালয়ের সামনে ঐদিন মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে কয়েকজন চাকরিপপ্রার্থীর পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। সেদিন নিয়োগ পরীক্ষা শেষ করে ফলাফল ঘোষণা না করেই চলে যায় নিয়োগ কমিটি।

পরীক্ষার পর জটিলতা তৈরি হলে গত বৃহস্পতিবার (২ ডিসেম্বর) দাতা পরিবারের সদস্য গোলাপি আক্তারকে আয়া পদে চাকুরি দেওয়া হবে মর্মে তার ভাই এসএম মাহাবুব জামানের সাথে প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম ১৫ লাখ টাকা চুক্তি করেন। সেদিন প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে তার হাতে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয়।

এ সময় কোলা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান শাহীনুর ইসলাম স্বপন, কোলা বাজার বণিক সমিতির সভাপিত সুজাউল ইসলাম কুদ্দুস সহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। প্রধান শিক্ষক টাকা নেওয়ার পরও তিনি পছন্দের প্রাথী ম্যানেজিং কমিটির সদস্যের স্ত্রী মুনিয়া আক্তারকে নিয়োগ দেন।

দাতা পরিবারের সদস্য এসএম মাহাবুব জামান বলেন, আমাদের সম্পত্তির ওপর বিদ্যালয়টি স্থাপিত। সে সময় আমার বাবাকে চাকরি দেওয়ার কথা থাকলেও কয়েকমাস ঘুরিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে আমার বোন গোলাপি আক্তারকে আয়া পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা। পরীক্ষার আগে জানতে পারি প্রধান শিক্ষক তার পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিচ্ছেন। বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে বলা হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। সেজন্য পরীক্ষার দিন কয়েকজন চাকরিপ্রার্থীর পরিবারের সদস্যসহ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়েছ। বোনকে চাকরি দেওয়ার জন্য পরে আমিসহ জনপ্রতিনিধি ও কয়েকজন গণ্যমান্যকে ডেকে প্রধান শিক্ষক ১৫ লাখ টাকা চুক্তি করে। সেদিনই নগদ পাঁচ লাখ টাকা প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলামের হাতে দিয়। কিন্তু তিনি তার পছন্দের প্রার্থীকেই নিয়োগ দিয়েছেন ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে।

কোলা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান শাহীনুর ইসলাম স্বপন বলেন, নিয়োগের বিষয় নিয়ে কত চুক্তি হয়েছে জানি না। তবে আমার সামনে প্রধান শিক্ষক পাঁচ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন।

কোলা বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সুজাউল ইসলাম কুদ্দুস বলেন, গোলাপী আক্তারের চাকরির বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে পাঁচ লাখ টাকা লেনদেন করা হয়েছে। ইতোপূবো আরো দুই পদে নিয়োগ হয়েছে। এ তিনপদে প্রায় ৫০ লাখ টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন প্রধান শিক্ষক।

দুলাল হোসেনের স্ত্রী মুনিয়া আক্তার বলেন, গত মঙ্গলবার আয়া পদে বিদ্যালয়ে যোগদান করেছি। টাকার বিষয়ে কোন লেনদেন হয়নি। মানুষ বিভিন্ন কথা বললে তো তাদের মুখ বন্ধ রাখা যাবে না। পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছেন এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন উত্তর দিতে পারেননি। বিষয়টি স্বামী বলতে পারবেন বলে জানান তিনি।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য দুলাল হোসেন বলেন, স্ত্রীর নিয়োগে কোন টাকা পয়সা লাগেনি। আন্তরিকতায় চাকরি হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিয়োগে টাকার কোন লেনদেন হয়নি। স্বচ্ছতার ভিত্তিত্বে পরীক্ষায় যে পাশ করেছে তাকেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বদলগাছী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এটিএম জিল্লুর রহমান বলেন, বিধি মোতাবেক পরীক্ষা হয়েছে। পাঁচজনের মধ্যে একজন টিকেছে এবং ফলাফল সেদিনই দিয়ে আমরা চলে আসছি। প্রকাশ্যে ফলাফল ঘোষণা করা হয় এবং সেদিনই রেজুলেশন করা হয়। তবে টাকার বিনিময়ে নিয়োগের বিষয়টি আমার জানা নেই।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close