reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১৩ অক্টোবর, ২০২১

সাক্ষাৎকারে জেনারেল ম্যানেজার ডা. ই এইচ আরেফিন

ইনসেপ্টার ওষুধ যাচ্ছে বিশ্বের ৭৬ দেশে

বিদেশে ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করায় দিন দিন বহির্বিশ্বে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম বাড়ছে। ফলে ইনসেপ্টার ওষুধের বাজারে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন দেশ।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০টি দেশে যাচ্ছে তাদের উৎপাদিত পণ্য। এসব ওষুধ থেকে গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আয় হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। গুণগতমান ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ইনসেপ্টা।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কৌশল ও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের সুনাম যেমন ধরে রেখেছে আবার একইভাবে ওষুধের বাজারে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। কোম্পানির ব্যবসায়িক উন্নতি, কৌশল এবং সফলতা নিয়ে প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে এসব কথা বলেন প্রতিষ্ঠানটির মার্কেটিং জেনারেল ম্যানেজার ডা. ই এইচ আরেফিন। দেশের ওষুধ শিল্প ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল সম্পর্কে এই বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রতিদিনের সংবাদের প্রতিবেদক মারুফ মালেক।

দেশের ওষুধ শিল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ডা. ই এইচ আরেফিন বলেন, ‘ওষুধ শিল্পে বিশ্ব মানের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সনদ নিয়ে ইনসেপ্টা দীর্ঘদিন থেকে উৎপাদনে আছে। বিশ্বের বড় বড় মান নিয়ন্ত্রকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- মার্কিন যুক্তরাষ্টের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ), যুক্তরাজ্যের মেডিসিন অ্যান্ড হেলথকেয়ার রেগুলেটরি এজেন্সি (এমএইচআরএ), ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি (ইএমএ), অস্ট্রেলিয়ার থেরাপিউটিকস গুডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টিজিএ), জার্মানির ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর ড্রাগস অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইসেস। আমাদের দেশের প্রথম সারির কোম্পানিগুলো এ ধরনের কোনো না কোনো গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড ওষুধ নিয়ন্ত্রক প্রশাসন স্বীকৃত। মার্কেট রিসার্চ অর্গানাইজেশন আইকিউভিআইএর রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের বার্ষিক ওষুধের বাজার এখন ২৭ হাজার ২৬২ কোটি টাকার। বর্তমানে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ১৭ শতাংশের ওপর। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানিতে আয় প্রায় ১৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমাদের ওষুধ উৎপাদন কোম্পানিগুলো অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায় প্রযুক্তিগতভাবে অনেক বেশি উন্নত। উৎপাদন ও মানের দিক থেকে ওষুধ শিল্প বিশ্বাসযোগ্যতার যথেষ্ট প্রমাণ রেখে চলছে।’

দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ ওষুধের প্রয়োজনের ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত মেটাতে সক্ষম উল্লেখ করে ডা. ই এইচ আরেফিন বলেন, ‘আমাদের সব ধরনের ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। কম উৎপাদন খরচ, সহজলভ্য যুগোপযোগী উৎপাদন প্রযুক্তি এবং শিল্পোদ্যোগ দেশের ওষুধ শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল চালিকাশক্তি। ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশের এ সাফল্যের পিছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে এদেশের সুশিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবেই ওষুধ সামগ্রীর অন্যতম প্রস্তুতকারক হয়ে উঠেছে। সামগ্রিকভাবে ওষুধের কাঁচামাল ও উৎপাদনে যথাযোগ্য সমন্বয় সাধন করতে পারলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসতে পারে।’

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল সম্পর্কে ডা. ই এইচ আরেফিন বলেন, ‘আমাদের যাত্রা শুরু ১৯৯৯ সালে। আমরা মুষ্টিমেয় অত্যন্ত দক্ষ ও নিবেদিত পেশাজীবীদের নিয়ে কার্যক্রম শুরু করি। যথাযথ কৌশলগত পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, দ্রুত এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করেছে। আমরা বাংলাদেশের একমাত্র ফার্মাসিউটিক্যাল যার জেনেরিক ওষুধ ছাড়াও রয়েছে স্বয়ং সম্পূর্ণ বায়োটেক, ভ্যাকসিন, হরমোনাল ওষুধ, ভেষজ ওষুধ উৎপাদন করার সক্ষমতা। অভ্যন্তরীণ বাজারে আমাদের মার্কেট শেয়ার ১২ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধি ১৮ শতাংশ। আমরা গত অর্থবছরে ৭৬টি দেশে ২০০ কোটি টাকার উপর রপ্তানি করেছি, প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ শতাংশ।

শিল্প বিকাশে বিশেষ করে রপ্তানি বাড়াতে সরকারের কোনো সহযোগিতা দরকার আছে কি? এমন প্রশ্নে ডা. ই এইচ আরেফিন বলেন, ওষুধ উৎপাদনে আমাদের বিদেশি কাঁচামালের উপর নির্ভর করতে হয়। অনেক সময় কাঁচামালের স্বল্পতার কারণে অনেক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ঘাটতি দেখা যায়। এজন্য রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারলে ওষুধের ঘাটতি কমে আসবে। বিশ্ববাজারেও আমরা অনেক ওষুধ প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে দাম এবং সম্মতির শর্তাবলীর ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হই। ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারলেই আমরা বিশ্ববাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতা মোকাবিলা করতে পারব। বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে বিসিক (বাংলাদেশ স্মল অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বাপি) সমন্বয়ে মুন্সীগঞ্জে ঢাকাণ্ডচট্টগ্রাম হাইওয়ে সংলগ্ন ২০০ একর জমিতে এপিআই পার্ক নির্মাণের কাজ অনেকটা এগিয়েছে। যখন এপিআই পার্কের কার্যক্রম শুরু করবে, তখন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো প্রচুর পরিমাণে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল উৎপাদনে সক্ষম হবে।

পাশাপাশি ওষুধ রপ্তানির সব থেকে বড় বাধা হচ্ছে বিদেশে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং দেশে বায়োইকুভেলেন্স টেস্টিং ফ্যাসিলিটির অনুপস্থিতি। বিদেশে ওষুধ রেজিস্ট্রেশন, অফিস প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিপণন ব্যয় ও অন্যান্য খরচ বাংলাদেশ ব্যাংকের আরোপিত বিদেশে বিনিয়োগের আর্থিক সীমাবদ্ধতার তুলনায় অনেক বেশি। এসব প্রতিবন্ধকতা নিরসনে আমরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। বিদেশে বিনিয়োগ, নিবন্ধন ও বাজারজাতকরণে পর্যাপ্ত তহবিলের জোগান দিতে পারলে ওষুধ রপ্তানি বাড়বে। নতুন বাজার সৃষ্টির বিষয়ে দূতাবাসগুলোর তৎপরতাও বাড়ানো প্রয়োজন।

ওষুধ শিল্পের অগ্রগতিতে কি ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে? এ বিষয়ে ডা. ই এইচ আরেফিন বলেন, গবেষণা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এর উপর ভিত্তি করেই নতুন উৎপাদিত ওষুধের মান নির্ভর করে। বাংলাদেশ এখন সব রকমের ডসেজ ফার্ম উৎপাদনে সক্ষম। এর মধ্যে রয়েছে- ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, লায়ফিলাইজড পাউডার, ইঞ্জেকটেবেলস, ড্রাই পাউডার ইনহেলারস, পেন কারত্রিজেস ইত্যাদি। এছাড়া বর্তমানে অ্যান্টিক্যান্সার ড্রাগ, বায়োসিমিলারস এবং ভ্যাকসিন উৎপাদনেও সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি সম্ভব রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের ব্যাপক ও কার্যকর উন্নয়নের মাধ্যমে। ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের এখন নিজস্ব ভ্যাক্সিন প্ল্যান্ট রয়েছে। আমরা বর্তমানে আটটি ভ্যাক্সিন এবং পাঁচটি ইম্যুনোগ্লোবিউলিন তৈরি করছি। এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার এপিআই উৎপাদনে উন্নতি এবং আমাদের তৈরি ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা। কিছু কন্ট্রাক্ট রিসার্চ অরগানাইজেশন (সিআরও) আমাদের দেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নিয়ে কাজ করছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ছয়টি অনুমোদিত সিআরও রয়েছে। সুতরাং গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে কথাটি যেমন সত্যি, তেমনি এ থেকে উত্তরণের পথ আমাদের নিজেদেরই বের করতে হবে।’

অন্যান্য শিল্পের মতো ওষুধ শিল্পেও করোনার প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে মনে করেন ডা. ই এইচ আরেফিন। তিনি বলেন, কোম্পানির ক্রমশ উন্নতির জন্য যে লক্ষ্য আমরা নির্ধারণ করেছি তা অর্জন করা কষ্টসাধ্য হবে। কোভিড সংক্রমণের শুরুর দিকেই আমরা ওষুধের সুষ্ঠু উৎপাদন এবং বিতরণ নিয়ে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। লকডাউনের কারণে তখন বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। অপরদিকে কোভিড সংক্রমণের আশঙ্কায় হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোতেও নন কোভিড রোগীদের উপস্থিতি কমে যায়। ছোটখাটো সার্জারি, মেডিকেল সমস্যা যা কিনা হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন ছিল। এমন অনেক কিছুই সেই মুহূর্তে স্থগিত রাখা হয়। এসব বিষয়ের কারণে সে সময়ে ওষুধের চাহিদা অনেকাংশে কমে যায়, বিশেষ করে একিউট কেয়ার মেডিসিনের। ক্রনিককেয়ার মেডিসিনের চাহিদা সেসময় থাকলেও মার্কেট ছিল স্থিতিশীল এবং আমরা তেমন কোনো প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারিনি।

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close