রং যেন মোর মর্মে লাগে

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

বিবিসি

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে কখনো কখনো সূর্যের রং হয় লাল তখন আকাশে আবিরের রং ছড়িয়ে যায়। আবহমান কাল ধরে এটা দেখে আসছি, ওই লাল সূর্যের আভায় আকাশেও তখন অপূর্ব রক্তিম বা কমলা রং ধরে, কখনো বা তার মধ্যে বেগুনি আভায় দেখা যায়। গোধূলি বেলার এই রঙের খেলা নিয়ে কত গান হয়েছে, কত কবিতা লেখা হয়েছে, এ নিয়ে রোমান্টিকতার শেষ নেই। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে শুদ্ধ ও শুষ্ক বিজ্ঞান। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন, আকাশে এখন লাল সূর্য আর রঙের খেলা দেখা যাচ্ছে আগের তুলনায় বেশি। আকাশে এমন অপরূপ দৃশ্যের একটা ব্যাখ্যা হলো র‌্যালে স্ক্যাটারিং বা পদার্থবিদ র‌্যালের নীতি অনুযায়ী বিচ্ছুরিত আলো ভেঙে ছড়িয়ে পড়া। গ্রিনিচের রয়াল মিউজিয়ামের জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাডওয়ার্ড ব্লুমার বলেন, এটা হলো পৃথিবীর বায়ুম-ল দিয়ে সূর্যের আলো যখন প্রবাহিত হয়, তখন সেটা যেভাবে আমাদের চোখে ধরা দেয়। বিষয়টা বুঝতে গেলে প্রথমে আলোর উপাদানটা জানতে হবে। আমরা চোখে যে আলো দেখি তাতে আমরা জানি সাতটা রং আছে লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, গাঢ় নীল এবং বেগুনি।

ব্লুমার বলছেন, ‘সূর্যের রঙের ক্ষেত্রে এই হেরফের ঘটে যখন সূর্যালোক ভেঙে ছড়িয়ে যায়। যখন আলোর কণাগুলো ভাঙে সেগুলো সমানভাবে ভাঙে না ভাঙে এলোমেলোভাবে। আলোর মধ্যে প্রত্যেকটা রঙের ওয়েভলেংথ বা তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আলাদা। আর সে কারণেই তাদের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য অনুযায়ী তাদের রঙের তীব্রতায় কমবেশি হয়।’

যেমন বেগুনি রঙের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম, আর লালের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি। ফলে কোন রং কোন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে প্রবাহিত হচ্ছে তা নির্ধারণ করবে আমরা কীভাবে সেই রংগুলোর বিচ্ছুরণ প্রত্যক্ষ করব। এরপর আমাদের আবহাওয়া ম-লের বিষয়টা বুঝতে হবে। যে আবহাওয়া ম-ল বা বায়ুম-লে রয়েছে নানা ধরনের গ্যাসের স্তর, যার মধ্যে রয়েছে অক্সিজেনও। সূর্যের আলো যখন বায়ুম-লের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন তা বেঁকেচুরে এবং ভেঙে যায় যেন একটা প্রিজম বা ত্রিভুজাকৃতি স্ফটিকের মধ্যে দিয়ে সেটা যাচ্ছে। এর কারণ বায়ুম-লে যেসব গ্যাস রয়েছে তার প্রতিটার ঘনত্ব আলাদা। এছাড়াও বায়ুম-লে অন্যান্য যেসব কণা রয়েছে সেগুলোর কারণে ভেঙে যাওয়া আলোর কণাগুলোর প্রতিফলন তৈরি হয়। সূর্য যখন অস্ত যায় বা ওঠে তখন সূর্য রশ্মি আবহাওয়া ম-লের সবচেয়ে ওপরের স্তরে একটা বিশেষ কোণ থেকে ধাক্কা মারে এবং সেখান থেকেই শুরু হয় সূর্যের আলোর ‘ম্যাজিক’।

সূর্যরশ্মি এরপর যখন ওপরের স্তর ভেদ করে ভেতরে ঢোকে তখন সেই স্তর নীল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যকে শুষে নেয় না বরং সেটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে প্রতিফলিত হয়। ‘সূর্য যখন দিগন্তের নিচের দিকে অবস্থান করে তখন নীল আর সবুজ রং ভেঙে যায় এবং আমরা কমলা এবং লাল রঙের আভা দেখতে পাই,’ বলেন ব্লুমার। এর কারণ আলোর যে রংগুলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ছোট (যেমন বেগুনি এবং নীল) সেগুলো বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে আলো যেমন কমলা এবং লালের চেয়ে বেশি ভেঙে যায় এবং এর ফলে আকাশে নানা রঙের আলোর অসাধারণ বিচ্ছুরণ আমরা দেখি।

ব্লুমার বলেন, পৃথিবীর কোথায় আপনি আছেন তার ওপর নির্ভর করবে সূর্যের কী রং আপনি কীভাবে আকাশে দেখবেন। যেখানে আপনি আছেন সেখানে বায়ুস্তরের অবস্থা অনুযায়ী সূর্যের আলো আকাশকে আলোকিত করবে। ধুলোর মেঘ, ধোঁয়া এগুলোও আকাশের আলোর বিচ্ছুরণের ওপর প্রভাব ফেলে।

আপনি এমনকী যদি মরুভূমি থেকে অনেক দূরেও থাকেন তাহলেও আকাশের এই নাটকীয় রং আপনি দেখতে পাবেন। বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রায়ই সাহারা মরুভূমির বালুকণা আবহাওয়া ম-লের উপরদিকের স্তরে উঠে সেখানে অবস্থান করে। সেখান থেকে ওই বালুকণার স্তর ইউরোপ এমনকী সাইবেরিয়া বা আমেরিকা পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারে।

আমরা দেখেছি, লকডাউনের পুরো সময়টাতে মানুষ প্রকৃতির দিকে, আকাশের দিকে বেশি নজর দিয়েছে, কারণ মানুষের করার জিনিস এ সময় অনেক কম ছিল, বলেন মি. ব্লুমার। সিনেমা, থিয়েটার, বিনোদনের বেশিরভাগ পথ বন্ধ থাকায় আমরা বাসায় থেকেছি বেশি, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছি বেশি, বলেন তিনি। তিনি আরো বলেন, এছাড়াও আকাশে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় এবং দূষণের মাত্রা কম থাকায় মানুষ আকাশে তারা দেখার চেষ্টা করেছে বেশি অর্থাৎ আকাশের দিকে নজর দিয়েছে আগের তুলনায় বেশি। সূর্য যখন আকাশে মাথার ওপরে থাকে তখন তার রশ্মি আবহাওয়া ম-লের একটা অখ- স্তর দিয়ে প্রবাহিত হয় সেখানে বিভিন্ন স্তরের মধ্যে প্রভেদ না থাকায় এই আলো ভেঙে যায় না। আবহাওয়া ম-ল এই রশ্মিকে শুষে নেয়, ফলে আমরা আলোর যে রং দেখি তা মূলত নীল। কিন্তু আবহাওয়া ম-লে বদল ঘটলে সেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। উনবিংশ শতাব্দীতে পদার্থবিদ লর্ড র‌্যালে সূর্যকিরণ এবং বায়ুম-ল নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছিলেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আকাশের রং কেন নীল তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন।

 

"