এম কবির, টাঙ্গাইল

  ১৩ অক্টোবর, ২০২১

ধানের পোকা দমনে আলোক-ফাঁদ

চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, দূর থেকে দেখা যাচ্ছে একটি ধানখেতের পাশে আলো জ¦লছে। কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছেন আলো ঘিরে। কৌতূহলের কারণে আলোর কাছে গিয়ে দেখা গেল, কৃষি কর্মকর্তা ১৫ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলছেন। কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে আলোক-ফাঁদ করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলায় আলোক-ফাঁদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধানের ক্ষতিকর পোকামাকড়ের উপস্থিতি ও দমন করার খবরটি আশান্বিত হওয়ার মতোই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় দেলদুয়ার উপজেলার কৃষকরা আমন ধান লাগানোর কিছুদিন পর থেকেই আলোক-ফাঁদ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছেন। আলোক ফাঁদ প্রযুক্তিটি হচ্ছে রাতের বেলায় খেতের পাশে বৈদ্যুতিক বাল্ব বা চার্জার বাল্ব টাঙানো হয়। বাল্বের নিচে পানিভর্তি পাত্র রাখা হয়। ওই পাত্রের মধ্যে পানির সঙ্গে ডিটারজেন্ট বা কেরোসিন মিশ্রিত করা হয়।

আলোয় আকৃষ্ট হয়ে পোকামাকড় বাল্বের কাছে আসে এবং পাত্রের পানির মধ্যে পড়ে মারা যায়। ওই পোকামাকড় দেখে ক্ষতিকর ও উপকারী পোকামাকড়ের উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। দেলদুয়ার উপজেলার কৃষকরা এরই মধ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল পেতে শুরু করেছেন।

ধানখেতে পোকামাকড়ের আক্রমণ স্বাভাবিক হলেও ফলনের জন্য তা খুবই ক্ষতিকর। ধানগাছে সবুজ ঘাসফড়িং, মাঝরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, বাদামি ঘাসফড়িং, গান্ধী পোকাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা আক্রমণ করে। এরমধ্যে বাদামি ঘাসফড়িং বা কারেন্ট পোকা সবচেয়ে ক্ষতিকর। এ পোকা যে গাছে আক্রমণ করে, সেই গাছের শিষ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে ফলন কমে যায়। অনেক সময় ফলন নেমে আসতে পারে শূন্যের কোঠায়।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ধান চাষে কীটনাশক ব্যবহার করে কৃষকরা কোনো সুবিধা পান না। উৎপাদন তো বাড়েই না, বরং উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। আর এর পাশাপাশি পরিবেশও দূষিত হয়। এ ক্ষেত্রে আলোক ফাঁদ প্রযুক্তি ভালো বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কেননা, এতে খরচ কম হয় এবং পরিবেশবান্ধবও বটে।

দেলদুয়ার উপজেলার কৃষকদের অনুসরণে দেশের অন্যান্য স্থানের ধানচাষিরা ধানগাছের পোকামাকড় দমনে ও পোকার উপস্থিতি জানতে আলোক ফাঁদ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন। এজন্য এই প্রযুক্তির ব্যবহার ও উপকারিতা সম্পর্কে কৃষকদের মাঝে প্রচারণা চালাতে হবে।

দেলদুয়ার উপজেলার দেউলি ইউনিয়নের আগদেউলী গ্রামের কৃষক তৈবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এখানকার কৃষি কর্মকর্তা আলোক ফাঁদ করে ধানের ক্ষতিকর ও উপকারী পোকা চিনিয়ে দিচ্ছেন। সঙ্গে কী ব্যবস্থা নিতে হবে, তা বলে দিচ্ছেন।’

উপজেলার পাথরাইল ইউনিয়নের চন্ডী গ্রামের কৃষক বাবলু মিয়া বলেন, ‘আলোক ফাঁদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারছি জমিতে কী ধরনের পোকা আছে। এ ছাড়া পানিতে পড়ে পোকাগুলো মারাও যাচ্ছে। আমি এখন থেকে সবসময় এই ফাঁদ ব্যবহার করব।’

দেলদুয়ার উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মনজুরুল ইসলাম ও সুফিয়া আক্তার বলেন, ‘আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে উপজেলার সব কৃষকের মধ্যে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করছি। প্রতি রবিবার নিজেরা মাঠে গিয়ে কৃষকের সঙ্গে আলোক ফাঁদ করছি এবং কৃষক যেন নিজেরাই এই আলোক ফাঁদ ব্যবহার করেন, সেজন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করছি।’

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শোয়েব মাহমুদ বলেন, ‘আলোক ফাঁদ পোকার উপস্থিতি ও দমনের একটি কার্যকরী পদ্ধতি। উপজেলার ২৪টি ব্লকে প্রতি রবিবার একযোগে সন্ধ্যার পর আলোক ফাঁদ করা হয়। এতে করে উপজেলায় ধানে কী কী পোকা রয়েছে, তা আমরা আগাম জানতে পারি। ফলে পোকা ক্ষতি করার আগেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।’

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close