শফিক শাহরিয়ার

  ০৪ ডিসেম্বর, ২০২১

চাষির স্বপ্ন

অনেক বছর আগের কথা। রাকিবের দাদা নাজিম উদ্দিনের সংসার ছিল সোনায় সোহাগা। তার সংসারে অর্থ-সম্পদের কোনো কমতি ছিল না। ভালোবাসার মায়াজালে বন্দি ছিল এই সংসার। দিনের পর দিন সেখানে ষড়যন্ত্র আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধে। নাজিম উদ্দিনের প্রথম স্ত্রী অসুখে ভুগে এক দিন হঠাৎ মারা যান। এরপর তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীকে প্রথম পক্ষের ছেলেমেয়েরা কেউই সহ্য করতে পারে না। কেউ মুখে মা বলে মেনে নিলেও অন্তরে মেনে নিতে পারে না। তখন থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কাজ করে। কয়েক বছর পর তার দাদাও মারা যান। প্রথম পক্ষের বড় ছেলে চাকরির সুবাদে শহরে থাকেন। বাবার মৃত্যুর পর এক দিন তিনি এলেন নিজ গ্রামে। অনেক বড় সংসার। রাকিবের চাচা-জেঠারা চার ভাই, চার বোন। বড় জেঠা তাহের আলী ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। তিনি সবার অজান্তেই জমির দলিল ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আবার শহরে ফেরেন। রাকিবের বাবা নাসের আলী দ্বিতীয় পক্ষের বড় ছেলে। নাসের আলী এক দিন আলমারিতে প্রয়োজনীয় বই খুঁজতে গিয়ে ভীষণ হতবাক। তার মায়ের কাছে সব ঘটনা জানতে পারলেন। তিনি বললেন, সমস্যা নেই বাবা। তোর বড় ভাই শিক্ষিত মানুষ। সে কাগজগুলো নিয়ে গিয়ে ভালোই সুবিধা করেছে। সবকিছু যতœসহকারে রাখবে। এক দিন তাহের আলী গ্রামে এসে ভাইদের মধ্যে সম্পত্তিগুলো বণ্টন করে দিলেন।

বোনদের যথাসময়ে উচ্চবংশে বিয়ে দেওয়া হলো। দুই পক্ষের ছেলেরা ভিটায় আলাদা আলাদা বাড়ি বানাতে চাইলেন। প্রথম পক্ষের ছেলেরা ঘর বানালেন পূর্ব ভিটায়। দ্বিতীয় পক্ষের ছেলেরা পশ্চিম ভিটায় ঘর বানাতে গিয়ে তাহের আলীর দ্বারস্থ হন। নাসের আলী ও নাদের আলী দুই ভাই বিলের জমি বিক্রি করতে চাইলেন। তাহের আলী নির্ধারিত মূল্যের বেশি মূল্য দিয়ে জমিটি কেরেন। জমির পরিমাণ ৫৪ শতক। ছোট ভাইয়েরা বড় ভাইকে গুরুর মতো সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন। জমির দলিল না পড়ে না বুঝে দলিলে স্বাক্ষর করেন। তারপর কেটে যায় ৩৬টি বছর। আজ থেকে ৭ বছর আগে তাহের আলী হঠাৎ ব্রেন স্ট্রোক করে মারা যান। তাহের আলীর দুই ছেলে আবুল ও বাবুল। শহরেই তাদের কর্মস্থল। এক দিন চাচাদের কাছে এসে বিলের জমির দলিলপত্র দেখায়। সঙ্গে ভিটেমাটির একটি দলিল ছিল। তারা বলল, আমার বাবা আপনাদের কাছে ৫৪ শতক জমি কিনেছিলেন। বিলের জমি ৩০ শতক ও ভিটেমাটি ২৪ শতক। নাসের আলী বিক্রি করেছিলেন বিলের জমি। ভিটেমাটি বিক্রি করেননি। তার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! তিনি বললেন, পানির দামে কি আমরা সোনা বিক্রি করেছিলাম আমরা কি এত বোকা তোমার বাবা আমাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করবে বুঝতে পারিনি। সে প্রখর মেধাবী ছাত্র ছিল। আমরা নিজে না পড়ে তাকে পড়ালেখার সুযোগ করে দিয়েছিলাম। সেটাই বড় ভুল করেছি। সে এই গ্রামের প্রথম গ্র্যাজুয়েট। তার অনেক গর্ব। অনেক বড় চাকরি করত। তার যথেষ্ট সম্মান ছিল। সরল ভাইদের বেকুব বানাল। তাহের আলীর ছেলেরা চাচার সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করে চলে যায়। তারা পরে ভিটের ২৪ শতক জমি অন্যত্র বিক্রি করে দেয়। নাসের আলীর চোখের সামনে ভাসে সেই ভিটেমাটি। যেখানে তিনি স্বপ্ন বুনেছেন ৩৬টি বছর।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close