মাওলানা মোহাম্মদ আজিজুল হক

  ০৭ নভেম্বর, ২০২৫

ঋণ দেওয়া সদকা

জীবনে চলার পথে ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। বর্তমানে নিঃস্বার্থ ও সুদমুক্ত কর্জ বা ঋণ পাওয়া জটিল ব্যাপার। অথচ ইসলামি আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় ‘ করজে হাসানা’ তথা উত্তম ঋণের গুরুত্ব অপরিসীম। বাস্তবতা হচ্ছে মানুষের একার পক্ষে সবসময় সব প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব না। অনেক ক্ষেত্রে অপরের সাহায্য নিতে হয়। ইদানীং সুদভিত্তিক ঋণের সয়লাব হলেও সুদবিহীন ঋণের চরম সংকট। একদিকে সামান্য প্রয়োজনেই ঋণ গ্রহণ করা হয়। এমনকি বিনা প্রয়োজনে ও গুনাহের কাজেও ঋণগ্রহণ করা হয়। অন্যদিকে সাধারণ জীবন চলার পথে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ইত্যাদির প্রয়োজনে ঋণ পাওয়া বিরল। কঠিনতর বিপদেও তা কমই পাওয়া যায়। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের আশায়, সওয়াবের নিয়তে বিনা শর্তে কাউকে কোনো কিছু ঋণ দেওয়াকে ‘ করজে হাসানা’ বা উত্তম ঋণ বলে। পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতে করজে হাসানার কথা উল্লেখ আছে। প্রয়োজনের তাগিদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে অমুসলিম থেকেও ঋণগ্রহণ করেছিলেন। ঋণগ্রহীতার দায়িত্ব হচ্ছে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া। বিশেষ প্রয়োজন এবং সময়মতো তা পরিশোধ করার প্রবল ইচ্ছে ছাড়া ঋণগ্রহণ জায়েজ নেই। সাহায্যপ্রার্থীকে সাহায্য করা এবং অসহায়কে সহায়তা করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় মহৎ কাজ। আর মহৎ কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করা আল্লাহরই নির্দেশ বটে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে তোমরা একে অন্যকে সাহায্য করো ( সুরা : মায়েদা, আয়াত : ২)।

অন্যত্র বলেন, নিশ্চয়ই দানশীল নর-নারী, যারা আল্লাহকে উত্তমরূপে ধার দেয়,তাদেরকে দেওয়া হবে বহুগুণ। তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ১৮)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, তোমরা নামাজ কায়েম করো, জাকাত দাও আর আল্লাহকে করজে হাসানা দাও। তোমাদের আত্মার মঙ্গলের জন্য তোমরা যা কিছু ভালো আগে পাঠাবে, পরিবর্তে তোমরা তার চেয়ে আরো ভালো ও বড় পুরস্কার পাবে আল্লাহর কাছ থেকে। আর তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো আল্লাহর কাছে। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু (সুরা : মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ২০)। অপর আয়াতে বলেন, এমন কে আছে? যে আল্লাহকে করজ দিবে উত্তম করজ। অতঃপর আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ - বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিবেন (সুরা: বাকারা, আয়াত: ২৪৫)। মানুষকে নিঃশর্ত ঋণ দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সহযোগিতা করা দান- সদকার চেয়েও উত্তম। রাসুলুল্লাহ( সাঃ) বলেছেন, ‘ মিরাজের রজনীতে জান্নাতের একটি দরজা দেখলাম, তাতে লেখা রয়েছে যে সদকার পুরস্কার ১০গুণ আর করজে হাসানার পুরস্কার ১৮ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে’। লেখাটি পড়ে রাসুল (সাঃ) তাঁর খেদমতে নিয়োজিত ফিরিশতাকে জিজ্ঞেস করলেন, এর কারণ কী? ফিরিশতা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! ভিক্ষুক তার কাছে কিছু অবলম্বন থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষা চায়, কিন্তু কোনো প্রকৃত অভাবী বিপদে না পড়লে ঋণ চায় না ( ইবনে মাজাহ, হাদিস নং:২৪৩১)।

আবার কেউ ঋণ নেওয়ার পর যদি সংকটে পড়ে যায়, তাকে চাপ না দিয়ে অবকাশ দেওয়ার মধ্যেও দান-খয়রাতের সওয়াব রয়েছে। রাসুল ( সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ( ঋণগ্রস্ত) অভাবী ব্যক্তিকে অবকাশ দিবে, সে দান-খয়রাত করার সওয়াব পাবে (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং:২৪১৮)।

আর যদি সামর্থ্য থাকে তাহলে অভাবী ঋণগ্রস্তের ঋণ মাফ করে দেওয়ার মধ্যে রয়েছে অফুরন্ত সওয়াব। হজরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি অভাবী ও ঋণগ্রস্ত লোককে সুযোগ প্রদান করে, অথবা ঋণ মাফ করে দেয়, কিয়ামতের দিবসে আল্লাহ তাকে আরশের ছায়ায় আশ্রয় প্রদান করবেন, যেদিন তার আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং:১৩০৬)। অন্য হাদিসে এসেছে, তোমাদের পূর্ববর্তী এক লোকের হিসাব নেওয়া হলে তার কোনো নেক আমল পাওয়া যায়নি। তবে সে মানুষের সাথে লেনদেন করতো এবং বিত্তবান ছিল। কর্মচারীদের প্রতি তার এ নির্দেশ ছিল যে, অক্ষমদের যেন তারা মাফ করে দেয়।আল্লাহপাক বললেন, মাফ করার সক্ষমতা তো ওর চেয়ে আমার বেশি। এরপর তিনি ফিরিশতাদেরকে আদেশ দিলেন তাকে মাফ করে দেওয়ার (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৫৬১)। অন্যত্র আছে, যে ব্যক্তি একটি স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রা দু’বার করজ দিবে, সে তা একবার দান করার সমপরিমান সওয়াব পাবে (আলমুহাজ্জাব ৪:৮৯৩৫)।

অন্য হাদিসে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ঋণ মুক্তির জন্য দু’বার করজ দেওয়া একবার সদকা করার চেয়েও উত্তম (জামেউস সগীর, হাদিস নং: ৬১০০)। তাই সামর্থ্য থাকলে করজে হাসানা প্রদানে কৃপণতা ও সংকোচ করা উচিত নয়। আমাদের সমাজে করজে হাসানা তথা বিনিময়হীন ঋণের প্রচলন শূন্যের কোঠায়। এর অন্যতম কারণ, করজ দেওয়ার পর তা যথাসময়ে ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা। এজন্য রাসুল (সাঃ) ঋণ পরিশোধের ব্যাপারেও কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। ঋণগ্রহীতাকে মনে রাখতে হবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ঋণ ছাড়া শহিদের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হয়( সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮৮৬)। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন । শহিদের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হয়, শুধুমাত্র ঋণ ব্যতীত।

লেখক : তরুণ আলেম ও গবেষক

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়