নিজস্ব প্রতিবেদক

  ২৬ নভেম্বর, ২০২১

সংসদে মেনন

নীতিনির্ধারণে না থেকেও সরকারের দায় নিতে হচ্ছে

নীতিনির্ধারণে অংশ না নিয়েও সরকারের দায় বহন করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। ১৪ দলের শরিক দলটির সংসদ সদস্য মেনন গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ আলোচনায় অংশ নিয়ে এ অভিযোগ করেন।

রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘১৫ দল, তিন জোটের অঙ্গীকার, ১৪ দল গঠনের মধ্যদিয়ে আমরা বর্তমান পর্যায়ে এসেছি। নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এর ভিত্তি ছিল অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য। আমাদের জোট আছে, ১৪ দলে আছি। তবে কেবল দিবস পালনে। নীতিনির্ধারণে কোনো অংশ নয়। সরকারের দায় আমাদেরও বহন করতে হয়। আওয়ামী লীগের কাছে ১৪ দলের অথবা অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক ঐক্যের

প্রাসঙ্গিকতা আছে কিনা জানি না।’

গত বুধবার সংসদে সাধারণ আলোচনার জন্য প্রস্তাব তোলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে সংসদে স্মারক বক্তৃতা দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বিগত টার্মে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য মেনন বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে ধর্মীয় মৌলবাদের যে বিপদ বর্তমান, উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার যে বিপদ বিদ্যমান, দুর্নীতি-বৈষম্য-সাম্প্রদায়িকতা, সম্পদ আর ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন আর কর্তৃত্বে যে বিপদ বিদ্যমান, তার থেকে মুক্ত করতে আজকে অম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল শক্তির ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র নয়, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে হবে, সাম্প্রদায়িকতাকে রুখতে হবে।’

স্বাস্থ্য খাতের সমালোচনা করে মেনন বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাত অব্যবস্থাপনায় নিমজ্জিত। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কোভিড মোকাবিলা করে গেছেন। কিন্তু কোভিডের আরেকটি ঢেউ এলে কতখানি সামাল দেওয়া যাবে তা জানা নেই। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করতে হবে। কোভিডের কারণে শিক্ষা খাতে বেহাল অবস্থা। একমুখী শিক্ষার নামে বিএনপির আমলে যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে মনে হয়।’

রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ নিয়ে উষ্মা প্রকাশে করে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বলেন, ‘আমরা আজকে লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে এখন সামরিক-বেসামরিক আমলা-ক্ষুদ্র ধনী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু আমলাতন্ত্রকে জনপ্রতিনিধিদের অধীন করেছিলেন। এখন জনপ্রতিনিধিরা আমলাতন্ত্রের অধীন। তারা রাজনীতিকদের ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত’ বলতে দ্বিধা করে না। কেবল তাই নয়, তারা বলেন, তারাই দেশ পরিচালনা করবেন। ব্যবসায়ীদের রাজনীতি করতে বাধা নেই। কিন্তু রাজনীতি যখন ব্যবসা হয়ে দাঁড়ায়, তখন আপত্তি থাকবেই। এই সংসদে আমরা তার প্রমাণ পাচ্ছি। রাজনীতি আর রাজনীতিকদের হাতে নেই।’

মেনন বলেন, ‘বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের একটি গৌরববোধ আছে। সেই গৌরববোধ আমাদের যুবকদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল। সেটা শাহবাগ আন্দোলনে দেখেছিলাম। যার বিরুদ্ধে ধর্মবাদীরা আক্রমণ করে। আমরা এবার কী দেখলাম? সেই গৌরববোধ আর তরুণদের মধ্যে নেই। আমরা সঞ্চারিত করতে পারিনি। এ কারণের ক্রিকেট মাঠে পাকিস্তানের ধ্বনি উঠে। পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানো হয়। এটা পরিকল্পিত কিনা সেটা আমি জানি না। তবে এটা আমাদের ব্যর্থতা- সেটা স্বীকার করতে হবে।’

সিনিয়র এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শ্রেষ্ঠ সময়। স্বাধীনতার এই ৫০ বছর আমাদের জন্য গৌরবের। এই সময় অগৌরবের ঘটনাও ঘটেছে। এই ৫০ বছরে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করেছি। বুধবার জাতিসংঘ এটি অনুমোদন দিয়েছে।’

মেনন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলাদেশ একটি আদর্শিক রাষ্ট্র হবে। এর ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মের হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ। এ দেশের হিন্দু, মুসলমান ও কৃষক-শ্রমিক সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, সব ধর্মের সমান অধিকারের কথা। রাষ্ট্রে কোনো ধর্ম প্রাধান্য পাবে না। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসক এই ধর্ম নিরপেক্ষতাকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ফিরিয়ে এনেছিলেন ধর্ম নিয়ে রাজনীতির পাকিস্তানি ধারাকে। ফিরিয়ে এনেছিলেন যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে।’ তিনি বলেন, ‘এরশাদ-খালেদা ধর্মের ব্যবহার ও মৌলবাদের জন্ম দিয়েছে। জন্ম দিয়েছে জঙ্গিবাদের। সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটিয়েছে। বিস্তার ঘটিয়েছে সাম্প্রদায়িক মানসিকতার। জামায়াত ইসলামীর মওদুদিবাদ এ দেশের ইসলামের উদার নৈতিকতা ধ্বংস করেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ইসলাম আমাদের দেশের মানুষের তরে, রাজনৈতিক প্রয়োজনে সেই ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। তারা রাষ্ট্র, সংবিধানকে চ্যালেঞ্জ করছে। জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তাদের মতবাদের অনুপ্রেরণা এমনভাবে ঘটেছে যে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাবেক মেয়র ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলতে দ্বিধা করেন না। বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল নির্মাণে সরকারি দলের মেয়র অস্বীকার করেন। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাম্প্রায়িক দাঙায় আমরা তৃণমূলের কর্মীদের অংশগ্রহণকে অস্বীকার করতে পারব না। এটা স্বীকার না করলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে আরো উৎসাহিত করবে। ধর্মবাদী রাজনীতির সঙ্গে আপস বাংলাদেশে জামায়াতের পুনরুত্থান ঘটাবে কিনা বলা যাবে না।’

মেনন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সেই একদল নিয়ে আমাদের বিরোধিতা ছিল। সেই সময় বঙ্গবন্ধু আমাদের বলেছিলেন, তোরা আয় আমি সমাজতন্ত্র করব, কারণ সমাজতন্ত্রই পথ। সমাজতন্ত্র আজকে পর্যুদস্ত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা যে উদারনৈতিক, নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি অনুসরণ করছি, তাতে আমাদের উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে না। এজন্য আজকে জন্ম নিচ্ছে বৈষম্যের, তীব্র বৈষম্যের।’

বর্তমান সরকারের শাসনামলের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার এই তিন টার্মের দেশে অভূতপূর্ণ উন্নয়ন হচ্ছে। সব সূচকের ঘরে অগ্রগতি। সব সূচকে পাকিস্তানকে আমরা ছাড়িয়ে গেছি। জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে। কিন্তু দেশের সম্পদ মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর হাতে। কোভিডকালেও কোটিপতিদের সংখ্যা বেড়েছে। ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এ অঞ্চলে প্রথম। গড় জাতীয় আয় বাড়লেও জনগণের আয় কমেছে। কোটিপতিদের সংখ্যা বাড়লেও ৫ লাখ কৃষকদের ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী দেশের দারিদ্র্যসীমার হার ২০ শতাংশের কমিয়ে এনেছিলেন, কিন্তু করোনার দুই বছরে নতুন দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৬০ লাখের ওপরে। অর্থমন্ত্রী এই বেসরকারি হিসাব স্বীকার করেন না। কিন্তু সরকারি কোনো হিসাবও নেই।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close